বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে প্রচলিত স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম। এটি সাধারণ সমস্যা হলেও এর প্রভাব অনেক বিস্তৃত ও পরিস্থিতিভেদে মারাত্মক।
সাধারণত ডায়াবেটিস আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গেই কোনো না কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে। তবে পায়ের উপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কারণ এমনিতেই পা আমাদের শরীরের সবচেয়ে অবহেলিত অঙ্গ। আমাদের মধ্যে খুব কম মানুষই আছেন যারা আলাদাভাবে পায়ের যত্ন নেন। তাই পায়ে ডায়াবেটিসের প্রভাব প্রাথমিক অবস্থায় অনেকেই ধরতে পারেন না। ফলে সামান্য আঘাত বা ক্ষত থেকে পা কাঁটা পড়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ডায়াবেটিসের কারণে পায়ে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে, যেমন: পায়ের স্নায়ুতন্ত্রের অকার্যকারিতা এবং এর ফলে পায়ের বোধশক্তি কমে যায়।
দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত থাকার কারণে ডায়াবেটিস রোগীদের পায়ের রক্তনালী শুকিয়ে যায় এবং বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি হয়। এজন্য পায়ে ব্যথার অনুভূতি কমে যায়। ফলে রোগীরা আঘাত পেলেও বুঝতে পারেন না এবং আঘাতের জায়গায় চাপ ফেলতে থাকেন। ফলে সামান্য আঘাত ইনফেকশনে রূপ নেয়। এবং তৎক্ষণাৎ চিকিৎসা শুরু না করলে তা থেকে গ্যাংগ্রিনের সৃষ্টি হয় এবং পা কাটার মতো পরিস্থিতি চলে আসে।
অনেক ডায়াবেটিস রোগী আছেন, যাদের রাতে পায়ে জ্বালা ও ব্যথা বেড়ে যায়। পায়ের জ্বালাপোড়া সাধারণত ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সে এবং ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে যে কারো হতে পারে। এ ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি আক্রান্ত হন। যদিও সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ডায়াবেটিস রোগীর এ ধরনের উপসর্গ থাকে না, ফলে ব্যাপারটা নিয়ে অনেকেই মাথা ঘামাতে চান না এবং পরবর্তীতে চিকিৎসা অনেক জটিল হয়ে পরে। এমনকি পা রক্ষা করাও দুঃসাধ্য হয়ে উঠে।
পায়ের রক্ত সঞ্চালনের স্বল্পতা অর্থাৎ পায়ে সঠিকভাবে রক্তপ্রবাহ না থাকার কারণে, পায়ের তলা ছাড়াও গোড়ালি, পায়ের উপরিভাগে জ্বালাপোড়া ও ব্যথা হতে পারে। এর কারণে অনেক সময় পায়ের রং পরিবর্তন হয়, অতিরিক্ত ঘাম হয় এবং পা ফুলে যায়।
রোগীর পায়ে ও পায়ের আঙ্গুলের মধ্যে কর্ন, ক্যালাস ও ফোসকা হলে তা বুঝতে পারে না, যা পরবর্তীতে ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে। এক্ষেত্রে নিয়মিত পায়ের পরীক্ষা খুবই জরুরি।
বেশির ভাগ সময়ই রোগীরা অসাবধানতা এবং সচেতনতার অভাবের কারণে দেরিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। তাই অনেক সময় দেখা যায় সামান্য দেরিতে চিকিৎসা গ্রহণের কারণে রোগীর জীবন বাঁচাতে পায়ের অংশবিশেষ কেটে ফেলে দিতে হয়।
তবে এমন না যে ডায়াবেটিস আক্রান্ত সব রোগীর পা কাটা পড়ে। রোগী যদি সামান্য সচেতন হন এবং সঠিক সময় সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন, তাহলে গ্যাংগ্রিনসহ পা কেটে ফেলার মতো মারাত্মক পরিস্থিতির হাত থেকে বাঁচতে পারেন।
তাছাড়া কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললে পা নিয়ে জটিলতা হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে আসে। যেমন–
১. কখনোই খালি পায়ে হাঁটা যাবে না।
২. নরম ও আরামদায়ক জুতা পড়তে হবে।
৩. সঠিক মাপের জুতা পড়তে হবে।
৪. নিয়মিত সঠিক নিয়মে নখ কাটতে হবে।
৫. পায়ে অত্যধিক গরম পানি ঢালা যাবে না।
৬. পায়ের কড়া নিজে কাটা যাবে না।
৭. মোজা না পড়ে কখনোই খালি পায়ে জুতা পরা যাবে না।
৮. ময়লা বা ভেজা মোজা পড়া যাবে না।
৯. আঙুলে যাতে আঘাত না লাগে সেভাবে চলতে হবে।
১০. পায়ের দুই আঙ্গুলের মাঝে জায়গা যেন ভেজা না থাকে।
১১. ধূমপান বর্জন করতে হবে।
সঠিকভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত পায়ের পরীক্ষা এবং যেকোনো সমস্যায় বিশেষজ্ঞের পরামর্শমতো চললে পা কাটা পড়ার ঝুঁকি শতকরা ৯০ ভাগই কমে যায়। তাই সচেতন হোন এবং পায়ের যত্ন নিন।
লেখক: নিউট্রিশন অফিসার, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি


খাদ্যাভ্যাসের যেসব পরিবর্তনে ঘুমের সমস্যা কাটে
ইউরিন ইনফেকশন প্রতিরোধে কী করবেন?
সুস্থ থাকতে চান? জেনে নিন স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কিছু নিয়ম
