খালাতো বা চাচাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে, কেন সতর্ক হবেন?

একই পরিবারে বড় হওয়া কিংবা রক্তের সম্পর্কের আপনজনের মধ্যে যদি বিয়ে হয়, তবে কেমন হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন? আমাদের সমাজে ‘কাজিন ম্যারেজ’ বা আপন খালাতো, মামাতো, চাচাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে খুবই সাধারণ একটি চিত্র। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা এখন এই বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। এমনকি কিছু দেশে তো আইন করে কাজিন ম্যারেজ নিষিদ্ধও করা হয়েছে। কিন্তু কেন? কাজিনদের মধ্যে বিয়ে কি সত্যিই বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

ইতিহাস কী বলে?

পৃথিবীতে এই কাজিন ম্যারেজের ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরোনো। বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইনও তার আপন চাচাতো বোন এমা ওয়েডউডকে বিয়ে করেছিলেন। এমনকি ব্রিটেনের বিখ্যাত রানি ভিক্টোরিয়াও বিয়ে করেছিলেন তার আপন চাচাতো ভাই প্রিন্স আলবার্টকে। উনিশ শতকের ব্রিটেনে উচ্চবিত্ত ও অভিজাত পরিবারগুলোর মধ্যে প্রতি ২০টি বিয়ের একটি হতো নিজেদের কাজিনদের মধ্যে। আর প্রাচীন মিশরে নিজ পরিবারের বিয়ের ইতিহাস তো সবারই জানা। সময়ের সাথে সাথে মানুষ যখন জেনেটিকস বা বংশগতিবিদ্যা বুঝতে শুরু করল, তখন এই হার অনেকটাই কমে আসে। তবে বিশ্বের কিছু কিছু অঞ্চলে বা নির্দিষ্ট কিছু জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে এই প্রথা এখনও বেশ শক্তভাবেই টিকে আছে। আমেরিকার ব্র্যাডফোর্ড শহরে চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূতদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকেরই সম্পর্কে চাচাতো, খালাতো বা মামাতো ভাইবোন।

জেনেটিকস যে ঝুঁকির কথা বলছে

প্রশ্ন হলো, প্রাচীন সময় ধরে চলে আসা এই বিয়েতে আপত্তি কোথায়? চিকিৎসকেরা কেন কঠোর সতর্কবার্তা দিচ্ছেন? এর পেছনে রয়েছে জেনেটিকস বা জিনতত্ত্বের এক অমোঘ নিয়ম। আমাদের শরীরের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী থাকে এক জোড়া জিন—যার একটি আসে বাবার কাছ থেকে, আরেকটি মায়ের কাছ থেকে। পরিবারে যদি থ্যালাসেমিয়ার মতো কোনো বংশগত রোগ থাকে, তবে বাবা বা মা সেই রোগের সুপ্ত বাহক হতে পারেন। যখন দুজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ বিয়ে করেন, তখন তাদের দুজনের শরীরেই একই রোগের সুপ্ত জিন থাকার সম্ভাবনা থাকে খুবই কম। কিন্তু যখন দুজন ফার্স্ট কাজিন বিয়ে করেন, তখন তাদের পূর্বপুরুষ একই হওয়ায়, দুজনের শরীরেই একই ত্রুটিপূর্ণ জিন থাকার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। সাধারণ দম্পতিদের ক্ষেত্রে সন্তানের বংশগত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি মাত্র ৩ শতাংশ। কিন্তু রক্তের সম্পর্কযুক্ত বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬ শতাংশে।

লুকিয়ে থাকা নতুন বিপদ

ঝুঁকিটা কি শুধু বড় কোনো বংশগত রোগেই সীমাবদ্ধ? যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত মেডিকেল গবেষণা ‘বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড’ প্রায় ১৮ বছর ধরে ১৩ হাজারেরও বেশি শিশুর ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালিয়েছে। সম্প্রতি তাদের প্রকাশিত তথ্য চিকিৎসকদের আরও বেশি চিন্তায় ফেলেছে। গবেষকেরা দেখেছেন, শুধু বড় রোগই নয়, ফার্স্ট কাজিনদের সন্তানদের মধ্যে কথা বলা এবং ভাষাগত সমস্যা বা স্পিচ ডিলে হওয়ার আশঙ্কা ১১ শতাংশ। সাধারণ শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মাত্র ৭ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, সাধারণ শিশুদের তুলনায় এই শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও হয় কম। ফলে অন্যান্য শারীরিক জটিলতার কারণে তাদের অন্তত ৩৩ শতাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ বেশিবার ডাক্তারের কাছে বা হাসপাতালে যেতে হয়। অনেক পরিবারে এমনও দেখা গেছে, জেনেটিক ত্রুটির কারণে একের পর এক সন্তান জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই মারা যাচ্ছে।

শুধু কাজিন ম্যারেজেই কি বিপদ?

এখানে অবশ্য একটি টুইস্টও আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেনেটিক ঝুঁকির একমাত্র কারণ শুধু আপন ভাইবোনের ছেলেমেয়ের মধ্যে বিয়ে নয়। এর চেয়েও বড় ভয় হলো এন্ডোগামি বা অন্তর্গোত্র বিবাহ। এর মানে হলো, যখন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা গোত্র বছরের পর বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শুধু নিজেদের মধ্যেই বিয়েশাদি সম্পন্ন করে। এতে করে তারা সরাসরি ফার্স্ট কাজিন না হলেও, তাদের সবার ডিএনএ এবং পূর্বপুরুষ একই হয়ে যায়। ফলে জিনের বৈচিত্র্য বা ডাইভার্সিটি নষ্ট হয়ে যায় এবং সুপ্ত রোগগুলো প্রকট হয়ে ওঠে। এই সমস্যা শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, অনেক ইহুদি সম্প্রদায় বা নির্দিষ্ট কিছু পশ্চিমা গোষ্ঠীর মধ্যেও এটি দেখা যায়।

নিষেধাজ্ঞা বনাম সচেতনতা

এই স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সামাজিক কিছু জটিলতার কারণে বিশ্বজুড়ে এখন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইউরোপের দেশ নরওয়ে গত বছরই কাজিনদের মধ্যে বিয়ে আইন করে নিষিদ্ধ করেছে। সুইডেনেও এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের কিছু আইনপ্রণেতাও এটি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলছেন। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জোর করে আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেয়ে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সচেতনতা। মানুষ যদি বিয়ের আগে জেনেটিক কাউন্সেলিং করায় এবং গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত পরীক্ষা করায়, তবে এই ঝুঁকি অনেক কমানো সম্ভব। আশার কথা হলো, নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই মানসিকতা দ্রুত বদলাচ্ছে। ব্র্যাডফোর্ডের গবেষণাতেই দেখা গেছে, গত ১০ বছরে কাজিনদের মধ্যে বিয়ের হার ৩৯ শতাংশ থেকে কমে ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে। শিক্ষার আলো এবং ইন্টারнеটের কল্যাণে তরুণ সমাজ এখন পারিবারিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে নিজেদের জীবনসঙ্গী বেছে নিচ্ছে।

সম্পর্ক বা ভালোবাসা সামাজিক নিয়মে গড়ে উঠলেও, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতা ও সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই। বিজ্ঞান ও সচেতনতাই পারে একটি সুস্থ ও সুন্দর আগামী নিশ্চিত করতে।