পেটের ডান দিকে হঠাৎ তীব্র ব্যথা। ভাবছেন সাধারণ গ্যাস বা বদহজমের সমস্যা? গ্যাসের ওষুধ খেয়ে ভাবলেন কমে যাবে, কিন্তু ব্যথা কমছেই না। অবশেষে ডাক্তারের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করাতেই জানা গেল—পেটের ভেতরে নীরবে দানা বেঁধেছে পাথর। আমাদের মধ্যে অনেকেই কিন্তু এই ভুলটি করেন।
পিত্তথলিতে পাথর বা গ্যালেস্টোন বর্তমান সময়ের অত্যন্ত সাধারণ, কিন্তু মারাত্মক একটি স্বাস্থ্য সমস্যা। কেন হয় এই পাথর? কীভাবে বুঝবেন আপনার পেটে পাথর জমা হচ্ছে কি না? আর এর সমাধানই বা কী? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
পিত্তথলিতে পাথর কীভাবে তৈরি হয়?
শুরুতেই জানা যাক পিত্তথলি বা গলব্লাডার জিনিসটা আসলে কী? আমাদের লিভারের ঠিক নিচে ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা একটি ছোট থলির মতো অঙ্গ থাকে, যাকে বলা হয় পিত্তথলি। এর প্রধান কাজ হলো লিভারের তৈরি করা ‘পিত্তরস’ জমা রাখা। আমরা যখন চর্বিজাতীয় খাবার খাই, তখন এই রস তা হজমে সাহায্য করে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই থলিতে পাথর জমা হয় কীভাবে? পিত্তরসের মধ্যে মূলত তিনটি উপাদান থাকে—কোলেস্টেরল, পিত্ত লবণ এবং বিলিরুবিন। কোনো কারণে যদি এই উপাদানগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, বিশেষ করে কোলেস্টেরল বা বিলিরুবিনের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যায়, তখন ছোট ছোট স্ফটিক তৈরি হয়। সময়ের সাথে সাথে এই স্ফটিকগুলোই জমাট বেঁধে শক্ত পাথরে রূপ নেয়।
পিত্তথলিতে পাথর মূলত তিন ধরনের হয়। সবচেয়ে বেশি হয় কোলেস্টেরল পাথর। সাধারণত ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই পাথরই হতে দেখা যায়। এ ছাড়া হয় পিগমেন্ট পাথর। সাধারণত রক্ত বা লিভারের রোগের কারণে বিলিরুবিন বেড়ে গেলে এটি তৈরি হয়। এবং তৃতীয়ত হয় মিশ্র পাথর। এটি কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম ও বিলিরুবিনের মিশ্রণে তৈরি হয়।
কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?
মেডিকেল সায়েন্সে পিত্তথলির পাথরের ঝুঁকি বোঝাতে ডাক্তাররা চমৎকার একটি সূত্র ব্যবহার করেন, যাকে বলা হয় ‘ফাইভ এফ’। আপনার মধ্যে কি এই বিষয়গুলো আছে? মিলিয়ে নিন:
ফিমেল: পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই সমস্যা ২ থেকে ৩ গুণ বেশি দেখা যায়।
ফর্টি: ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে এই ঝুঁকি লাফিয়ে বাড়ে।
ফ্যাট: অতিরিক্ত শারীরিক ওজন বা স্থূলতা থাকলে পাথর হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।
ফার্টাইল: গর্ভবতী নারী বা সন্তানধারণক্ষম বয়সের নারীদের হরমোন পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি বাড়ে।
ফেয়ার: পশ্চিমা দেশগুলোর ফর্সা ত্বকের মানুষের মধ্যে এটি বেশি দেখা গেলেও বর্তমানে আমাদের উপমহাদেশেও এর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে।
এ ছাড়া ফাস্টফুড বা অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার খাওয়া, কায়িক পরিশ্রম না করা, ক্র্যাশ ডায়েট করে হঠাৎ দ্রুত ওজন কমানো, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা কিংবা ডায়াবেটিস থাকলেও পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
লক্ষণ ও বিপদচিহ্ন—বুঝবেন কীভাবে?
অবাক করার বিষয় হলো, বেশিরভাগ মানুষের শরীরে পাথর থাকলেও বছরের পর বছর কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না। হঠাৎ আল্ট্রাসাউন্ড করাতে গিয়ে এটি ধরা পড়ে। কিন্তু যখন পাথর পিত্তরসের নালীতে বাধা সৃষ্টি করে, তখন লক্ষণগুলো সামনে আসে।
সাধারণ লক্ষণগুলো হলো: পেটের ওপরের ডান পাশে তীব্র ব্যথা; ভারী বা চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর ব্যথা বেড়ে যাওয়া; ব্যথা পিঠে বা ডান কাঁধে ছড়িয়ে পড়া; পেট ফাঁপা, গ্যাস, বদহজম এবং বমি বমি ভাব।
এ ছাড়াও কিছু জরুরি বিপদচিহ্ন আছে, যা দেখলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। যদি পেটের ব্যথার সাথে আপনার তীব্র জ্বর ও কাঁপুনি আসে, চোখ ও চামড়া হলুদ হয়ে অর্থাৎ জন্ডিস দেখা দেয়, প্রস্রাবের রং গাঢ় এবং পায়খানার রং ফ্যাকাশে বা সাদাটে হয়ে যায়—তবে বুঝবেন পরিস্থিতি গুরুতর। দেরি না করে অবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
ভুল ধারণা বনাম সত্য
পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়লেই কি অপারেশন করতে হয়? আর অপারেশন ছাড়া কি ওষুধ বা ঘরোয়া উপায়ে পাথর গলানো সম্ভব? চলুন এ সংক্রান্ত কিছু ভুল ধারণা ভাঙা যাক।
১. পিত্তথলিতে পাথর আছে কিন্তু কোনো ব্যথা বা উপসর্গ নেই—এমন ক্ষেত্রে সাধারণত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। কেবল ডাক্তারের পর্যবেক্ষণে থাকলেই চলে।
২. ওষুধ দিয়ে পিত্তথলির পাথর সম্পূর্ণরূপে গলিয়ে ফেলা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছোট কোলেস্টেরল পাথর গলানোর ওষুধ দেওয়া হলেও তা সময়সাপেক্ষ এবং পরবর্তীতে আবার পাথর হওয়ার ঝুঁকি শতভাগ থেকে যায়।
তাই উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকরা পেট না কেটে ছোট ফুটো করে (ল্যাপারোস্কোপিক) পিত্তথলি অপসারণের পরামর্শ দেন। এটি একটি অত্যন্ত নিরাপদ ও আধুনিক পদ্ধতি, যেখানে রোগী এক-দুই দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন। অনেকে ভাবেন, পিত্তথলি কেটে ফেললে কি হজমে আজীবন সমস্যা হবে? উত্তর হলো—না! পিত্তথলি না থাকলেও আমাদের লিভার সরাসরি অন্ত্রে পিত্তরস পাঠাতে পারে, ফলে মানুষ একদম স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।
প্রতিরোধের সহজ উপায়
একটু সচেতন হলেই কিন্তু আমরা পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারি।
সুষম খাদ্যভ্যাস: খাবারে ফাইবারের পরিমাণ বাড়ান। ফলমূল, শাকসবজি ও দানাশস্য বেশি খান। অতিরিক্ত তেল-চর্বি, ভাজাপোড়া ও প্রসেসড ফুড এড়িয়ে চলুন।
সঠিক নিয়মে ওজন কমান: দ্রুত ওজন কমাতে গিয়ে ক্র্যাশ ডায়েট করবেন না। মাসে ২ থেকে ৪ কেজির বেশি ওজন কমানো লিভার ও পিত্তথলির জন্য ক্ষতিকর।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করুন।
পর্যাপ্ত পানি পান: শরীরকে সবসময় হাইড্রেটেড রাখুন এবং দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকা বা উপবাস এড়িয়ে চলুন।
পেটের ডান দিকের তীব্র ব্যথাকে কখনোই সাধারণ গ্যাস বা বদহজম ভেবে অবহেলা করবেন না। সঠিক সময়ে একটি সামান্য আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষাই আপনাকে বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা থেকে বাঁচাতে পারে।