ঢামেকে দালাল চক্রের খপ্পরে হয়রানির শিকার হাজারো রোগী

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সরলতাকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে দালাল চক্র। সহায়তাকারী সেজে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে দেয় বেসরকারি ডায়াগনস্টিকে। আর এই ঘটনাকে হাসপাতালের নিয়ম মনে করেন প্রতারণার শিকার অনেকে। এভাবেই কয়েক গুণ বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে রোগীদের কাছ থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপজেলা পর্যায়ে ভালো চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে, সমস্যার সমাধান হবে না।

গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা করাতে আসা বাবু মিয়া জানতেনও না, দালালের খপ্পরে পড়েছেন তিনি। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার যে পরীক্ষার কথা বলেছেন, তা করাতে তাই সড়কের উল্টো পাশের ডায়াগনস্টিকে যান তিনি। পরিবারটির ধারণা, দেশের সবচেয়ে বড় হাসপাতালের চিকিৎসা প্রক্রিয়াই বুঝি এমনই। তাই সহজেই বিশ্বাস করেছেন দালালদের। ফলে কয়েকগুণ বেশি অর্থ খরচ করে তাদের হাত প্রায় শূন্য।

ভুক্তভোগী জানান, এখন আমরা কি জানি নাকি যে, কোথায় পরীক্ষা করালে কম খরচে হবে, কোথায় বেশি খরচ হবে। আমাদেরকে বাইরে থেকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই জায়গায় যাও। আমরা সেই জায়গায় গিয়েছি, আমাদের ২৯শ টাকা বিল করেছে। 

আরেক ভুক্তভোগী নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে বলেন, 'আমরা কি বুঝি! হুজুরে বলেছে যে, ঐ জায়গা থেকে (পরীক্ষা) করে নিয়ে আস। আমাদেরকে নিয়ে গেছে সাথে করে, আমরা করে এনেছি।'  

এমন ঘটনা অহরহ হচ্ছে। প্রতারণার শিকার হচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানীতে চিকিৎসা করাতে আসা প্রান্তিক মানুষ।

তাদেরই একজন জানান, আমরাতো বুঝি না। আমরা এসেছি নতুন এখানে। ওরা নিয়ে আসছে, ওরা ভালো জায়গায় নিয়ে রক্ত পরীক্ষা করিয়েছে। টাকা নিয়েছে ১৬শ। 

এমনই আরেক জন বলেন, এক সার্জারি ডাক্তারের কাছে পাঠিয়েছে। আমার হাত থেকে রক্ত নিতে গিয়ে উনি আমাকে বলেছে যে, এক লাখ টাকা লাগবে।   

সরকারি হাসপাতালে টিকেট কাটা, ডাক্তার দেখানো, পরীক্ষা করাতে দীর্ঘ সময় লাগে। কখনো কখনো চিকিৎসা শুরু করতেই মাস পেরিয়ে যায়। এরই সুযোগ নেয় দালালরা।

দালালদের কাছে যাওয়া প্রসঙ্গে এক রোগী বলেন, ...ডাক্তাররা বলেন, তাড়াতাড়ি করে নিয়ে আস। এভাবে আমাদেরকে দালালের মাধ্যমে চলে যেতে হয়। 

আমার কোন রোগ হয়েছে সেটা এখনও জানায়নি। শুধু টেস্টই দিয়ে যাচ্ছে। তো আমরা আর কত টেস্ট করব, প্রশ্ন চিকিৎসা করা আসা এক নারীর। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সক্ষমতার কয়েকগুণ রোগীর চাপ থাকায় সরকারি হাসপাতালে কাঙ্খিত সেবা মেলে না। সুফল পেতে হলে উপজেলা পর্যায়েও ভালো চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা.মির্জা জিয়াউল ইসলাম বলেন, 'দালাল রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার চরম শাস্তি হওয়া উচিৎ। পৃথিবীতে যত ধরণের আইন তার সবই আছে বাংলাদেশে। আইনের প্রয়োগ করার জন্য যাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারা যদি দায়িত্ব (পালন) না করে, তো আপনি কি করবেন।' 

চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা.লিয়াকত আলী বলেন, 'জনগণকে যদি বিকল্প ব্যবস্থা আপনি না দেন, মানসম্পন্ন পাবলিক সেক্টর যদি না থাকে, তাহলে আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন, এভাবেই হতে থাকবে। কারণ তাকে বিভ্রান্ত করবে দালালরা। আপনি যতই চেষ্টা করবেন, আবার ফিরে ফিরে হবে, একেবারে বন্ধ হবে না।' 

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, চিকিৎসা সেবার কাঠামোগত উন্নয়নেই দালাল সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে।

দেশের সবচেয়ে বড় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। গেট পেরোলেই একের পর এক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। গ্রামের হাজারো রোগী প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে এসে হচ্ছেন হয়রানির শিকার। দালালদের খপ্পরে পড়ে গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। অথচ দেখার যেন কেউ নেই।