দ্রুত জীবনযাপনের এই সময়ে খাবারের ধরনও বদলে গেছে। রান্নাঘরে সময় না দিয়ে অনেকেই এখন প্যাকেটজাত খাবার, কোমল পানীয়, বিস্কুট, চিপস বা প্রস্তুত খাবারের ওপর নির্ভর করছেন। এগুলোকে বলা হয় অতিপ্রসেসড খাবার।
দেখতে সাধারণ মনে হলেও নতুন এক গবেষণা বলছে, এই খাবার শুধু ওজন বাড়ায় না। বরং শরীরের ভেতরের মাংসপেশির গঠনেও পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে পায়ের মাংসপেশিতে চর্বি জমে যেতে পারে। যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
অতিপ্রসেসড খাবার আসলে কী?
অতিপ্রসেসড খাবার হলো শিল্প কারখানায় নানা ধরনের কৃত্রিম উপাদান মিশিয়ে তৈরি করা হয়। এগুলোর মধ্যে থাকতে পারে অতিরিক্ত চিনি, কৃত্রিম রং ও স্বাদ, প্রিজারভেটিভ, অতিরিক্ত লবণ ও ফ্যাট।
যেমন সফট ড্রিংক, প্যাকেট চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, ক্যান্ডি ও চকলেট বার। খেতে মজার হলেও এসব খাবার শরীরের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ভালো নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষণায় কী দেখা গেল?
যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক এমআরআই স্ক্যানের মাধ্যমে ৬১৫ জন মানুষের শরীর পরীক্ষা করেন। এই মানুষদের কেউই শুরুতে হাঁটুর বড় কোনো সমস্যায় ভুগছিলেন না।
গবেষণায় দেখা যায়, যারা বেশি অতিপ্রসেসড খাবার খেয়েছেন, তাদের পায়ের উরুর মাংসপেশিতে বেশি চর্বি জমেছে।
বিশেষ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ৬২ বছর বয়সী এক নারীর দৈনন্দিন ক্যালরির প্রায় ৮৭ শতাংশই আসত অতিপ্রসেসড খাবার থেকে। তার উরুর মাংসপেশির ছবি এমআরআই স্ক্যানে অনেকটা মার্বেল স্টেকের মতো দেখা যায়। মাংসের ভেতরে ভেতরে চর্বির দাগ ছড়িয়ে আছে।
গবেষকরা বলছেন, এটি শরীরের জন্য একটি সতর্ক সংকেত।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
মাংসপেশি শুধু শরীরের আকৃতি দেয় না। এটি আমাদের চলাফেরা, দাঁড়ানো, ভারসাম্য রাখা সবকিছুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যখন মাংসপেশির ভেতরে চর্বি জমে যায়, তখন পেশি আগের মতো শক্তিশালী থাকে না।
এর ফলে হাঁটাচলায় সমস্যা হতে পারে, শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা দেখা দিতে পারে। সেই সাথে হাঁটুর ওপর চাপ বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উরুর মাংসপেশি হাঁটুর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই পেশি দুর্বল হয়ে গেলে হাঁটুর ক্ষয় বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
হাঁটুর সমস্যার সঙ্গে সম্পর্ক
বিশ্বে প্রায় ৩৭৫ মিলিয়ন মানুষ হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসে ভুগছেন। আগে এটি বয়স্কদের রোগ হিসেবে ধরা হলেও এখন কম বয়সীদের মধ্যেও এর হার বাড়ছে।
গবেষকরা বলছেন, এর একটি বড় কারণ হতে পারে স্থূলতা এবং জীবনযাপনের পরিবর্তন।
যখন শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমে এবং মাংসপেশি দুর্বল হয়ে যায়, তখন হাঁটুর ওপর চাপ অনেক বেড়ে যায়। এই চাপই ধীরে ধীরে ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়।
সমস্যা কি শুধু পায়ে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু উরু বা পায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি পুরো শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে। কারণ শরীরের সব মাংসপেশি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
যদি একটি অংশে চর্বি জমে যায়, তাহলে পেটের, কাঁধের ও পায়ের অন্যান্য পেশির সব জায়গাতেই একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
শুধু ক্যালরি নয়, খাবারের ধরন গুরুত্বপূর্ণ
গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। সেটি হলো শুধু কত ক্যালরি খাওয়া হচ্ছে তা নয়। সেই ক্যালরি কোথা থেকে আসছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
একই পরিমাণ ক্যালরি কেউ যদি ঘরে রান্না করা খাবার থেকে পান, আর কেউ যদি অতিপ্রসেসড খাবার থেকে পান। তাদের শরীরের ওপর প্রভাব এক রকম হয় না।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে যারা কম অতিপ্রসেসড খাবার খেয়েছেন, তাদের মাংসপেশি তুলনামূলক ভালো অবস্থায় ছিল।
জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্ক
আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেকেই সময় বাঁচাতে প্রস্তুত খাবারের দিকে ঝুঁকছেন। অফিস, পড়াশোনা বা ব্যস্ততার কারণে রান্না করার সময় কমে যাচ্ছে। এই অভ্যাসই ধীরে ধীরে শরীরের ওপর প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একজন গবেষক বলেন, ‘আমরা এখন এমন এক সময়ের মধ্যে আছি, যেখানে খাবারের সহজলভ্যতা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।’
ভালো খবর হলো, এই পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রেই উল্টানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা যায়, তাহলে মাংসপেশির অবস্থাও উন্নত হতে পারে।
তারা যা পরামর্শ দিচ্ছেন তার মধ্যে রয়েছে ব্যায়াম, প্রতিদিন হাঁটা, হালকা দৌড়, সাইক্লিং এবং লেগ স্ট্রেংথ বাড়ানোর ব্যায়াম। বিশেষ করে উরু, পা ও কোমরের পেশি শক্ত করার ব্যায়াম খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কী ধরনের খাবার ভালো?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক ও ঘরে তৈরি খাবার খাওয়া উচিত। ভালো খাবারের মধ্যে আছে সবজি, ফল, ডাল, মাছ ও ডিম এবং শস্য (ভাত, আটা, ওটস)। এগুলো শরীরকে শক্তি দেয় এবং মাংসপেশিকে ভালো রাখতে সাহায্য করে।
অনেকে মনে করেন প্রোটিন বার বা সাপ্লিমেন্ট খেলেই স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। অনেক প্রোটিন বারেই অতিরিক্ত চিনি ও কৃত্রিম উপাদান থাকে। যা আসলে অতিপ্রসেসড খাবারের মধ্যেই পড়ে। তাই এগুলো নিয়মিত খাওয়ার পরিবর্তে প্রাকৃতিক খাবারের ওপর ভরসা করা ভালো।
শুধু খাবার নয়, পানীয়ও গুরুত্বপূর্ণ। সফট ড্রিংক বা মিষ্টি পানীয়তে কোনো পুষ্টিগুণ থাকে না। এগুলো শরীরে অতিরিক্ত চিনি যোগ করে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, যতটা সম্ভব পানি পান করা। মিষ্টি পানীয় কমানো। প্রাকৃতিক জুস বেছে নেওয়া।
স্বাস্থ্য ভালো রাখতে বড় পরিবর্তনের দরকার নেই। ছোট ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। যেমন- প্যাকেটজাত খাবারের বদলে ঘরের খাবার খাওয়া। প্রতিদিন কিছুটা হাঁটা। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার। বাইরে খাওয়ার অভ্যাস কমানো।
অতিপ্রসেসড খাবার আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। নতুন এই গবেষণা সরাসরি প্রমাণ না দিলেও একটি ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমরা যা খাই, তা শুধু শরীরের ওজন নয়, মাংসপেশির ভেতরের গঠনকেও বদলে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারসাম্যপূর্ণ খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং সচেতন জীবনযাপনই পারে শরীরকে সুস্থ ও শক্তিশালী রাখতে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন