ট্রাম্পের আগ্রহে আলোচনায় ইবোগেইন: ওষুধ নাকি মাদক?

একসময় যে সাইকেডেলিক বা মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলা ওষুধগুলোকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইরে রাখা হয়েছিল, সেগুলোই এখন আবার আলোচনায়। নতুন করে সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ‘ইবোগেইন’। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সাম্প্রতিক উদ্যোগ এই ওষুধকে ঘিরে আগ্রহ যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি তৈরি করেছে নানা প্রশ্নও।

হঠাৎ কেন এত আলোচনা?

সম্প্রতি ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন, যার লক্ষ্য সাইকেডেলিক ওষুধ নিয়ে গবেষণা দ্রুত এগিয়ে নেওয়া। বিষণ্নতা, ট্রমা বা মাদকাসক্তির মতো সমস্যা যেগুলো এখন বিশ্বজুড়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি্ সেগুলোর নতুন চিকিৎসা খুঁজতেই এই উদ্যোগ।

এই আদেশে আলাদা করে ‘ইবোগেইন’-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অনেকেই ভাবছেন, এই ওষুধ কি সত্যিই এতটাই সম্ভাবনাময়?

ইবোগেইন আসলে কী?

ইবোগেইন একটি প্রাকৃতিক উপাদান, যা আফ্রিকার একটি গাছের শিকড় থেকে পাওয়া যায়। বহু বছর ধরে মধ্য আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে এটি আধ্যাত্মিক আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহার হয়ে আসছে।

তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইবোগেইন নিয়ে আগ্রহের কারণ ভিন্ন। গবেষকেরা বলছেন, এটি মাদকাসক্তি, বিষণ্নতা বা মানসিক ট্রমার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

কীভাবে কাজ করে?

আমাদের মস্তিষ্কে নানা ধরনের স্নায়ুপথ বা ‘নিউরাল পাথওয়ে’ থাকে। দীর্ঘদিনের আসক্তি বা মানসিক চাপ এসব পথকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

গবেষকদের ধারণা, ইবোগেইন সেই ক্ষতিগ্রস্ত পথগুলোকে একধরনের ‘রিসেট’ করতে পারে। অর্থাৎ মস্তিষ্ককে নতুনভাবে কাজ করতে সাহায্য করতে পারে।

এ কারণেই অনেকেই এটিকে ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে দেখছেন। তবে এই ধারণা এখনও পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি।

দ্রুত অনুমোদনের সম্ভাবনা

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) এখন ইবোগেইনকে দ্রুত মূল্যায়নের চাপের মধ্যে রয়েছে। যদি সবকিছু ঠিক থাকে, তাহলে কয়েক বছরের বদলে কয়েক মাসের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

এছাড়া ইবোগেইন নিয়ে মানুষের ওপর গবেষণার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। আগে কঠোর নিয়মের কারণে এই ধরনের গবেষণা খুব সীমিত ছিল।

আইন কী বলছে?

এখনও পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ইবোগেইনকে ‘শিডিউল-১’ তালিকায় রাখা হয়েছে। এর মানে, সরকারিভাবে এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা হয় এবং এর কোনো স্বীকৃত চিকিৎসা ব্যবহার নেই।

তবে ভবিষ্যতে অনুমোদন পেলে এটি সাধারণ প্রেসক্রিপশনের মতো পাওয়া যাবে না। বরং হাসপাতাল বা বিশেষ ক্লিনিকে কঠোর তত্ত্বাবধানে ব্যবহার করা হতে পারে।

সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকিও

ইবোগেইন নিয়ে যতটা আশা তৈরি হয়েছে, ততটাই উদ্বেগও আছে।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি মাদক ছাড়ার সময়ের কষ্ট কমাতে পারে, আসক্তির প্রবণতা কমাতে পারে এবং মানসিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে সাহায্য করতে পারে।

অনেক রোগী আবার চিকিৎসার সময় এমন অভিজ্ঞতার কথা বলেন, যা তাদের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়।

কিন্তু এর বিপদও কম নয়। ইবোগেইন হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা তৈরি করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরও বড় পরিসরে এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ছাড়া এই ওষুধকে নিরাপদ বলা যাবে না।

মানুষ কেন বিদেশে যাচ্ছে?

আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ইবোগেইন সহজলভ্য নয়। তাই অনেক রোগী ‘বিশেষ করে যুদ্ধফেরত সেনাসদস্যরা’ মেক্সিকোর মতো দেশে গিয়ে এই চিকিৎসা নিচ্ছেন।

তাদের অনেকেরই দাবি, প্রচলিত চিকিৎসায় কাজ না পাওয়ায় শেষ ভরসা হিসেবে তারা এই পথ বেছে নিচ্ছেন।

এতে একদিকে যেমন এই চিকিৎসার চাহিদা বোঝা যায়, অন্যদিকে বর্তমান মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়।

সামনে কী হতে পারে?

ইবোগেইন নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। কেউ এটিকে ভবিষ্যতের চিকিৎসা হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ বলছেন, এখনই এতটা এগোনো ঠিক নয়।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, ইবোগেইন এখন আর অচেনা কোনো নাম নয়। এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে।

আগামী দিনে গবেষণা কী বলে? আর নীতিনির্ধারকেরা কী সিদ্ধান্ত নেন? সেটিই ঠিক করবে। এই বিতর্কিত ওষুধ সত্যিই মানসিক চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলতে পারবে কি না।