একটা দৃশ্য কল্পনা করুন।
ধরে নিন, আপনি একটি অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আপনার অধীনে বেশ কয়েকজন কর্মী আছেন। আপনি তাদের কাছে একটি নতুন প্রকল্প তুলে ধরলেন এবং সেটির কাজ বুঝিয়ে দিলেন। এর প্রত্যুত্তরে দেখলেন, একজন কর্মী খুবই সোৎসাহে এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করে দিলেন। তিনি হয়তো দুপুরে খেতে গিয়েও সহকর্মীর সঙ্গে নতুন প্রকল্প নিয়েই আলাপ করছেন। আর আরেকজন কর্মী তুলনামূলক অনেক শান্ত, নতুন প্রকল্প নিয়ে বাহ্যিক আলোচনা কমই করছেন। অর্থাৎ, দ্বিতীয়জনের উৎসাহের বিষয়টি অন্তত দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়।
এখন বলুন তো, আপনি কোন কর্মীকে স্বাভাবিকভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিতে বিচার করবেন?
যদি আপনার পছন্দ হয় প্রথম ব্যক্তিটি, তবে মনে রাখবেন – এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনি একা নন। অর্থাৎ, আরও অনেকেই আপনার অবস্থানে থাকলে হয়তো একই সিদ্ধান্ত নিতেন। সেটাই স্বাভাবিক। বহির্মুখী চরিত্রের ব্যক্তিদের মধ্যে খোলামেলা আচরণের একটি ধরন থাকে। এর উল্টোদিকে অন্তর্মুখী চরিত্রের মানুষেরা একটু চাপা স্বভাবেরই হন। ফলে অফিসের বড় কর্তা হয়তো তাকেই পছন্দ করেন, যিনি খোলামেলাভাবে মনের ভাব প্রকাশ করে থাকেন। কারণ এ ধরনের ব্যক্তির অনুভূতি ও অভিব্যক্তি বোঝা সহজ। অন্যদিকে অন্তর্মুখী স্বভাবের ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো বাহ্যিকভাবে বোঝা কঠিন। ফলে আচরণের ভিত্তিতে কোনো ধারণা করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর এসব কারণেই বেশির ভাগ সময় বসদের কাছে সাধারণত একজন বহির্মুখী কর্মী প্রিয় হয়ে ওঠেন। এবং তুলনামূলকভাবে চুপচাপ থাকা কর্মীটির ব্যাপারে তাদের মন্তব্য, ‘ও তো কথা বলে না!’ এই মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে বসদের এও মনে হয় যে, শান্ত কর্মীটি হয়তো কাজও কম করে। কারণ, বাংলা প্রবাদেই তো আছে—‘আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী’। অর্থাৎ একজন ব্যক্তিকে বিচার করার সময় আমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উনি কি ধরনের আচরণ প্রদর্শন করেন, সেটিকেই বিবেচনায় নিয়ে থাকি। কিন্তু কথা কম বলা মানেই কি কাজও কম করা? বা উল্টো করে বললে, কথা বেশি বলা কর্মী কি সব সময় কাজও বেশি করে থাকে?
এই দুটি প্রশ্নের উত্তরই হলো, ‘না’। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপেই এমন তথ্য জানা গেছে। অর্থাৎ, কথা কম বলা ব্যক্তি ফাঁকি দিয়ে কাজ কম করেন, বিষয়টি তেমন নয় কোনোভাবেই। আবার বহির্মুখী ব্যক্তি নিজের কাজের প্যাশন সবার সামনে প্রকাশ করে ফেলেন বলেই তিনি যে কাজও বেশি বেশি করেন, ব্যাপারটি ওমনও নয়।
বহির্মুখী নাকি অন্তর্মুখী—কাজের প্রতি প্রেম কার বেশি?
চলতি বছরের নভেম্বরে পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি বুলেটিন নামক আন্তর্জাতিক জার্নালে বেশ কয়েকটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে ‘এক্সট্রোভার্টস রিপ গ্রেটার সোশ্যাল রিওয়ার্ডস ফ্রম প্যাশন বিকজ দে এক্সপ্রেস প্যাশন মোর ফ্রিকোয়েন্টলি অ্যান্ড ডাইভার্সলি’ শীর্ষক এক গবেষণায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ মার্কিন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। তাতে জানা গিয়েছিল, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাধারণত বহির্মুখী চরিত্রের সহকর্মীদেরই বেশি পছন্দ করেন এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নে তাদের প্রতিই প্রসন্ন থাকতেন। অর্থাৎ, কর্মক্ষেত্রে তাদের উন্নতিও বেশি হতো। সেই সঙ্গে গবেষণায় অংশ নেওয়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এও জানান যে, অন্তর্মুখী স্বভাবের কর্মীদের কাজের প্রতি প্যাশন কম থাকে বলেই তাদের ধারণা।
সুতরাং, এটি স্পষ্ট যে, অন্তর্মুখী স্বভাবের ব্যক্তিদের বিষয়ে কর্মক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কিছুটা নেতিবাচক ধারণাই পোষণ করে থাকেন। এক্ষেত্রে মূলত বর্হিমুখী কর্মীদের খোলামেলা আচরণেই তাঁরা আকৃষ্ট হয়ে থাকেন।
গবেষকেরা বলছেন, এসব কারণে বহির্মুখী চরিত্রের কর্মীদের প্রতি বসদের সুনজর থাকে বেশি। এবং এর প্রভাব পড়ে প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নে। ধরে নেওয়া হয় যে, এই চরিত্রের কর্মীরা হয়তো কাজও বেশি করেন, কাজের প্রতি তাঁদের আগ্রহও বেশি। তবে এই প্রক্রিয়ায় যেভাবে অন্তর্মুখী চরিত্রের কর্মীদের কোণঠাসা করে ফেলা হয়, সেটির বিরোধিতা করছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, কর্মক্ষেত্রের কাজের প্রতি অন্তর্মুখী ব্যক্তিদেরও অন্যদের মতো বা তার চেয়েও বেশি প্যাশন কাজ করে। কিন্তু তার স্বীকৃতি পাওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্মুখী স্বভাবের ব্যক্তিরা বহির্মুখী চরিত্রের চেয়ে ভিন্নভাবে অনুভূতি ব্যক্ত করে থাকে। ভিন্ন এক গবেষণায় পূর্ণকালীন চাকরি করা প্রায় ১ হাজার ৩০০ পেশাজীবীর কাছে এ সংক্রান্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হয়। মূলত তাঁরা প্যাশন বিষয়ে কীভাবে অনুভূতি ব্যক্ত করে, সে বিষয়েই জানতে চাওয়া হয়েছিল। সেই গবেষণায় দেখা গেছে, কম সংখ্যক ব্যক্তিই নিজেদের কাজের প্যাশন সম্পর্কে জানাতে বা প্রকাশ করতে উচ্চকিত থাকেন। এরাই মূলত চরিত্রের। এরা কথা বেশি বলেন, নিজের অনুভূতি সবার সামনে প্রকাশ করতে এবং তার মাধ্যমে কাউকে আকৃষ্ট করতে উদ্গ্রীব থাকেন। এর বাইরে একটি বিশাল অংশের পেশাজীবীই কাজের ব্যাপারে নিজেদের প্যাশন অন্যের সামনে সোচ্চারে প্রকাশ করেন না খুব একটা। বরং সেই খাতে বরাদ্দ শক্তিটুকু তারা ব্যয় করেন সত্যিকারের কাজে এবং তার ফল যাতে ভালো হয়, ওই চেষ্টায় থাকেন। এক কথায়, দেখনদারির বদলে তারা গুণ ও মানে মনযোগী হন বেশি।
অন্তর্মুখীরা কি অসফল?
মজার বিষয় হলো, অন্তর্মুখী চরিত্রের ব্যক্তিরা কম কাজ করেন বলে যে প্রচলিত বিশ্বাস কর্মক্ষেত্রের ঊর্ধ্বতনদের মধ্যে আছে, সফলতার হিসাবে তা একেবারেই উল্টো। প্রচলিত বিশ্বাস মানলে ভেবে নিতেই হয় যে, চাকরি কিছুটা করতে পারলেও অন্তর্মুখী স্বভাবের ব্যক্তিদের পক্ষে ব্যবসা করা বা কোনো উদ্যোগ নিয়ে সেটিকে এগিয়ে নেওয়া আরও কঠিন হওয়ার কথা। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হলো, অন্তর্মুখী চরিত্রের ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হওয়ার হার বেশি। এক্ষেত্রে অন্তর্মুখী চরিত্রের মানুষদের কিছু শক্তিশালী বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো:
১. অন্তর্মুখী চরিত্রের ব্যক্তিরা সৃজনশীল ভাবনায় এগিয়ে থাকেন।
২. নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা তৈরিতে এসব ব্যক্তিরা অত্যন্ত আগ্রহী থাকেন।
৩. এরা কথা কম বলে, শোনে বেশি। এবং মনযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনাটা ভালো নেতা হওয়ার পূর্বশর্ত।
৪. অতি উৎসাহে ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই কোনো কাজ অন্তর্মুখী চরিত্রের ব্যক্তিরা করেন না। বরং ভেবে-চিন্তে ঠান্ডা মাথায় কাজ করাটাই তাদের স্বভাব। ফলে কাজের ফলাফলও ভালো হয়।
৫. পরিস্থিতি সামলানো এবং সমস্যা সমাধানে অন্তর্মুখী চরিত্রের ব্যক্তিদের জুড়ি মেলা ভার। কারণ তারা তুলনামূলকভাবে বেশি শান্ত প্রকৃতির হন এবং সুচিন্তিত সমাধানে আগ্রহী থাকেন।
ব্যবস্থাপকদের যা যা বোঝা উচিত
ওপরের এত আলোচনার পরও এটিই সত্যি যে, শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রের তাবৎ ব্যবস্থাপকদের বেশির ভাগ এখনও এই বিশ্বাসেই চলেন যে, বর্হিমুখী চরিত্রের কর্মীরা কাজে পটু এবং অন্তর্মুখীরা তুলনামূলকভাবে অপটু। অর্থাৎ, তাদের পছন্দের তালিকায় ওপরের দিকেই থাকেন বর্হিমুখীরা। অবশ্য এতক্ষণের আলোচনায় নিশ্চয়ই বোঝা গেছে যে, ব্যাপারটি অমূলক। তাই ব্যবস্থাপকদের অবশ্যই নিজেদের বিচার ও বিবেচনার প্রক্রিয়ায় কিছুটা পরিবর্তন আনা আবশ্যক।
প্রথমত, ব্যবস্থাপক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উচিত অধীনস্ত কর্মীদের চারিত্রিক প্রকৃতি সম্পর্কে বোঝার চেষ্টা করা। এক্ষেত্রে গভীর পর্যবেক্ষণ চালাতে হবে। মনে রাখতে হবে, মিটিংয়ে একটি নতুন প্রকল্পের বিষয়ে ঘোষণা দিলেই সবার ‘হুররে’ বলে চেঁচিয়ে ওঠাটি স্বাভাবিক নয়। তাই বলে শান্তশিষ্ট কর্মীটির যে কোনো তাড়না নেই, তা কিন্তু নয়। শুধু তার প্রকাশভঙ্গিটি ভিন্ন। এবং এটিই বোঝার চেষ্টা করতে হবে ব্যবস্থাপকদের।
দ্বিতীয়ত, কোন কর্মী কীভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করছেন, সেটি চিহ্নিত করতে হবে। একজনের ক্ষেত্রে যেটি সর্বনিম্ন সীমা, আরেকজনের ক্ষেত্রেই সেটি হয়তো সর্বোচ্চ সীমা! তাই সেটি অনুধাবন করতে হবে।
তৃতীয়ত, কাজের প্রতি প্যাশনের বহিঃপ্রকাশকে পুরষ্কৃত না করে, কর্মনৈপুণ্যকে পুরষ্কৃত করার অভ্যাস গড়তে হবে। সাধারণত অনেক ব্যবস্থাপকই দেখনদারি দেখেই পুরষ্কৃত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। কাজের বেলায় ঘণ্টা কিনা, সেটি আর বিচার করতে যান না। এই বিষয়টিতেই পরিবর্তন আনা তাই সবচেয়ে জরুরি।
অন্তর্মুখী মানুষেরা কি করবেন?
কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য থেকে রক্ষা পেতে অন্তর্মুখী চরিত্রের ব্যক্তিদেরও কিছু কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, এক হাতে তো তালি বাজে না। তাই ব্যবস্থাপকদের পরিবর্তনকে আরেকটু সহজ করে দিতে পারে অন্তর্মুখী চরিত্রের মানুষদের নেওয়া কিছু পদক্ষেপ।
এক্ষেত্রে স্বভাবের বাইরে গিয়ে একটু পা ফেলতে হতে পারে। যেমন: কৌশলী প্রক্রিয়ায় অফিস মিটিংয়ে কথা বলার পরিমাণ কিছুটা হলেও বাড়ানো যায়। এর মানে এই নয় যে একেবারে বাচাল হয়ে যেতে হবে! তবে হার তো কিছুটা বাড়ানোই যায়। এতে করে কাজের প্রতি নিজের আগ্রহ ও মনযোগের বিষয়টি আরও ভালোভাবে দৃশ্যমান করা সম্ভব।
তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে, নিজস্ব স্বভাবের বেশি বাইরে চলে গেলে তা ব্যক্তিস্বত্ত্বার জন্য উপকারী থাকে না। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এতে ব্যক্তির দীর্ঘমেয়াদি কর্মনৈপুণ্য ও মানসিকভাবে ভালো থাকাটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই অন্তর্মুখী চরিত্রের ব্যক্তিরা যদি নিজের স্বভাবে পরিবর্তন আনতেও চান, তবে তাতে অবশ্যই ভারসাম্য রাখতে হবে। সেটি না থাকলেই কিন্তু নিজেকে হারিয়ে খুঁজতে হবে!
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ভোগ ম্যাগাজিন, সায়েন্স ডাইরেক্ট ডট কম, হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ, সেজপাব জার্নালস, স্প্রিংগার ডট কম, সাইকনেট ডট এপিএ ডট ওআরজি ও ফোর্বস