বিল গেটস–জাকারবার্গরা কেন সন্তানদের প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখতে চান

তাঁরা প্রযুক্তি জায়ান্ট। তাঁরা এমন সব প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন, যেগুলো আমাদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘স্ক্রিনে’ আটকে রাখে। বলা হয়ে থাকে, মার্ক জাকারবার্গদের আবিষ্কার আমাদের পুরো জীবনযাপনকেই আমূল বদলে দিয়েছে। অথচ তারাই তাদের সন্তানদের যতটা সম্ভব মোবাইল ফোন–টিভি–কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন!

বিস্ময়কর শোনালেও কথাটি সত্য। সম্প্রতি সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান দ্য ইনফরমেশন পরিচালিত এক জরিপ থেকে জানা গেছে, সিলিকন ভ্যালির বাসিন্দাদের সন্তানেরা আমেরিকার অন্যান্য শিশুদের চেয়ে গড় অনেক কম সময় স্ক্রিনে ব্যয় করে। মার্ক জাকারবার্গ, বিল গেটস, সুন্দর পিচাইয়ের মতো প্রযুক্তির বরপুত্রেরা কেন তাঁদের সন্তানদের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখেন, সেসব নিয়ে আছে নানা আলোচনা।

বিল গেটস। ছবি: এক্স থেকে নেওয়াবিল গেটস
মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের সন্তানেরা এখন প্রাপ্তবয়স্ক। কিন্তু তারা যখন ছোট ছিল, তখন বিল গেটস তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য মিররকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিল গেটস বলেছিলেন, ‘বন্ধু–বান্ধব ও প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল ফোন ব্যবহার করা উচিত নয়। আমি আমার সন্তানদের খাবারের সময় এবং ঘুমানোর আগে কখনোই মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দিতাম না। এমনকি ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত তাদের ফোন ধরার অনুমতিই দেইনি।’

অ্যালেক্সিস ওহানিয়ান। ছবি: এক্স থেকে নেওয়াঅ্যালেক্সিস ওহানিয়ান
সংবাদভিত্তিক সামাজিকমাধ্যম রেডিটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্সিস ওহানিয়ান তাঁর সন্তানদের হাতে এখনো মোবাইল দেননি। তিনি বলেন, ‘আমি আর আমার স্ত্রী সেরেনা উইলিয়ামস সেই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছি, যেদিন আমার মেয়ের বয়স ভিডিও গেম খেলার জন্য উপযোগী হবে। তার আগে আমরা তার হাতে মোবাইল ফোন দিতে নারাজ।’

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে অ্যালেক্সিস বলেন, ‘আমরা আমাদের সন্তানের প্রযুক্তি ব্যবহারকে বেশ কড়াভাবেই নিয়ন্ত্রণ করি। কারণ আমরা এর ক্ষতিকর বিষয়টি ভালোভাবেই জানি। আমরা চাই, আমাদের সন্তানের চিন্তাভাবনা সুস্থভাবে বিকশিত হোক। মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই, সাধারণ খেলনাগুলোর সাথেই তার সুন্দর শৈশব কাটুক।’

সুসান ওয়াজসিকি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়াসুসান ওয়াজসিকি
ইউটিউবের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুসান ওয়াজসিকি একজন খ্যাতিমান মার্কিন প্রযুক্তিবিদ। আজকের প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগলের যাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর গ্যারেজ থেকেই। তিনি বহু বছর ইউটিউব, টেক ক্রাঞ্চ ও ইনটেলে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করেছেন। প্রখ্যাত এই প্রযুক্তিবিদ বেলফাস্ট টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘আমার সন্তানদের ইউটিউব–ফেসবুক থেকে দূরে রাখতে নিরন্তন সংগ্রাম করতে হয়েছে। একটা সময় তাদের ‘‘ইউটিউব কিডস’’ ব্যবহারের অনুমতি দেই। তবে সেটাও ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য।’

স্ক্রিন থেকে সন্তানদের দূরে রাখার ব্যাপারে সুসান বলেন, ‘স্ক্রিনে আসক্তি খুবই ভয়ানক একটি ব্যাপার। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি বেশি ক্ষতিকর। আমি মনে করি অতিরিক্ত কোনও কিছুই ভালো নয়। তাই আমার সন্তানদের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখি।’

মার্ক জাকারবার্গ। ছবি: এক্স থেকে নেওয়ামার্ক জাকারবার্গ
ফেসবুকের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ এখন প্রযুক্তি–দুনিয়ার সবচেয়ে আলোচিত নাম। তিনি সারা দুনিয়ার মানুষকে ফেসবুকের ভেতর বুঁদ করে রাখলেও নিজের সন্তানদের ফেসবুকসহ যাবতীয় স্ক্রিন থেকে দূরে রাখেন। জাকারবার্গ বলেন, ‘আমি শুধু আমার আত্মীয়–স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের সময় সন্তানদের ভিডিও কলের অনুমতি দেই। আমি চাই না, আমার সন্তানেরা বেশি সময় কম্পিউটার, টেলিভিশন কিংবা মোবাইল ফোন নিয়ে পড়ে থাকুক।’

সুন্দর পিচাই। ছবি: এক্স থেকে নেওয়াসুন্দর পিচাই
গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাই বিবিসিকে বলেন, ‘প্রযুক্তির আসক্তি নিয়ে আমি গভীরভাবে চিন্তিত। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিকে তো অস্বীকারও করতে পারি না। তাই আমার সন্তানদের প্রযুক্তির গুরুত্ব বুঝাই। তারা যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় ডিজিটাইল ডিভাইসে ব্যবহার না করে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকি।’

তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টাইমস, মিরর, সিএনবিসি ও বিবিসি