একটি শাড়ি। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, রাজকীয়তা আর হারিয়ে যাওয়া এক শিল্পের গল্প। এই শাড়ির নাম কোডালি করুপ্পুর। প্রায় ৮০০ বছরের পুরোনো এই শাড়ি একসময় পরতেন শুধু তাঞ্জাভুরের রাণীরা। আজ সেই শাড়ি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে নতুন করে আবার আলোচনায় এসেছে এই বিশেষ বস্ত্রশিল্প।
সম্প্রতি বলিউড অভিনেত্রী ও সাংসদ কঙ্গনা রনৌত এই শাড়ি পরায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় হ্যান্ডলুম নিয়ে কাজ করা কনটেন্ট নির্মাতা দিয়া রায়চৌধুরী এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান। তার একটি ভিডিও থেকেই অনেকেই প্রথমবার এই শাড়ির নাম শুনেছেন।
কোথা থেকে এলো?
কোডালি করুপ্পুর শাড়ির জন্ম তামিলনাড়ুর একটি ছোট গ্রামে, কোডালি করুপ্পুর। এই গ্রামটি কুম্বকোনম শহরের কাছে, যা আবার তাঞ্জাভুর জেলার অংশ।
টেক্সটাইল গবেষক সবিতা রাধাকৃষ্ণ জানিয়েছেন, এই শাড়ির বিকাশ হয়েছিল মারাঠা শাসক সারফোজি রাজা ভোঁসলে ছত্রপতি দ্বিতীয়ের সময়। তিনি ১৭৮৭ থেকে ১৮৩২ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় এই শাড়ি তৈরি হতো এবং তা কেবল রাজপরিবারের নারীদের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল।
তখনকার দিনে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ পরিবার এই শাড়ি তৈরির কাজে যুক্ত ছিল। তাদের পূর্বপুরুষরা সৌরাষ্ট্র অঞ্চল থেকে এসে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বসতি গড়েছিলেন। তারা ছিলেন দক্ষ তাঁতি, যাঁদের হাতে তৈরি হতো এই বিশেষ শাড়ি।
কীভাবে তৈরি হতো এই শাড়ি?
কোডালি করুপ্পুর শাড়ির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি তৈরি করতে একসঙ্গে কয়েকটি আলাদা কৌশল ব্যবহার করা হতো। সাধারণ শাড়ির মতো শুধু সুতো দিয়ে বুনন করলেই কাজ শেষ হতো না।
প্রথমে জামদানি ধাঁচে শাড়ির বুনন করা হতো। এতে সোনালি বা রুপালি জরির সুতো ব্যবহার করা হতো। তবে এই বুননই ছিল মূল নকশা নয়, বরং এটি ছিল পটভূমি।
এরপর শুরু হতো আসল কাজ। মোম ব্যবহার করে কাপড়ের কিছু অংশ ঢেকে দেওয়া হতো, যাতে সেখানে রং না লাগে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘রেজিস্ট ডাইং’। পরে বাকি অংশে রং করা হতো।
এর পাশাপাশি হাতে আঁকা হতো নকশা। এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা কালামকারি শিল্পের মতো। অর্থাৎ একটি শাড়িতে একসঙ্গে বুনন, রং করা এবং আঁকা, এই তিনটি ধাপ থাকত।
এই কারণেই কোডালি করুপ্পুর শাড়িকে অন্য শাড়ি থেকে আলাদা করে চেনা যায়। যেমন কাঞ্চিপুরমের সিল্ক শাড়ি মূলত বুননের জন্য বিখ্যাত, কিন্তু কোডালি করুপ্পুর শাড়িতে একসঙ্গে তিনটি শিল্পের মেলবন্ধন দেখা যায়।
শাড়ির নকশা ও বৈশিষ্ট্য
এই শাড়িগুলো সাধারণত আট গজ লম্বা হতো। আজকাল আমরা যে ছয় গজ শাড়ি দেখি, তার চেয়ে এটি বড়।
শাড়ির নকশা ছিল বেশ আকর্ষণীয়। এতে থাকত জ্যামিতিক ডিজাইন, তারকার মতো আকৃতি, লতাপাতার নকশা এবং ‘থাঝাম্পু’ ফুলের নকশা। এসব ডিজাইন খুব সূক্ষ্মভাবে করা হতো।
আরও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল ‘দোরুখা’ কাজ। এর মানে হলো, শাড়ির দুই পাশেই সমানভাবে নকশা করা থাকত। ফলে উল্টে দিলেও শাড়িটি একই রকম দেখাত।
কেন হারিয়ে গেল এই শাড়ি
একসময় খুব জনপ্রিয় হলেও ধীরে ধীরে এই শাড়ি হারিয়ে যেতে শুরু করে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে।
প্রথমত, ব্রিটিশরা তাঞ্জাভুর দখল করার পর রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা কমে যায়। ফলে এই শাড়ির চাহিদাও কমে যায়।
দ্বিতীয়ত, এই শাড়ি তৈরির প্রক্রিয়া ছিল অনেক সময়সাপেক্ষ এবং জটিল। একটি শাড়ি বানাতে দীর্ঘ সময় লাগত। আধুনিক যুগে যেখানে দ্রুত উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই ধীর প্রক্রিয়া টিকে থাকতে পারেনি।
তৃতীয়ত, পুরোনো কারিগররা একে একে হারিয়ে যেতে থাকেন। তাঁদের কাছ থেকে এই কাজ শেখার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই দক্ষতা ছড়িয়ে পড়েনি।
এ ছাড়া বাজারে সস্তা মেশিনে তৈরি শাড়ির প্রসারও এই শিল্পের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়।
লেখক কার্তিকা গোপালকৃষ্ণন জানিয়েছেন, ‘পর্যাপ্ত নথি বা ডকুমেন্টেশন না থাকাও একটি বড় সমস্যা ছিল। ফলে এই শাড়ির কৌশলগুলো ঠিকভাবে সংরক্ষিত হয়নি।’
এখন কি পাওয়া যায়?
বর্তমানে আসল কোডালি করুপ্পুর শাড়ি প্রায় নেই বললেই চলে। কিছু শাড়ি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। সেগুলোই এখন এই শিল্পের নিদর্শন।
বাজারে কিছু পুনর্নির্মিত শাড়ি পাওয়া যায়। তবে সেগুলো আগের মতো নয়। কারণ, সেই পুরোনো কৌশল ও নিখুঁত কাজ এখন আর পুরোপুরি করা সম্ভব হয় না।
কালাক্ষেত্র ফাউন্ডেশন এই শাড়িকে আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। তাদের ক্রাফট এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবনের কাজ করছে।
এ ছাড়া অক্ষ উইভস অ্যান্ড ক্র্যাফটস নামের একটি প্রতিষ্ঠানও এই শাড়ির পুনর্নির্মাণে কাজ করছে। এখান থেকেই একটি শাড়ি সংগ্রহ করেছিলেন কঙ্গনা রনৌত।
কোডালি করুপ্পুর শাড়ি শুধু একটি পোশাক নয়। এটি একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি এবং একটি শিল্পের প্রতীক। এই শাড়ির মধ্যে রয়েছে বহু মানুষের পরিশ্রম, দক্ষতা এবং সৃজনশীলতার ছাপ। আজ যখন আমরা আধুনিক পোশাকের দিকে ঝুঁকছি। তখন এই ধরনের ঐতিহ্যবাহী শিল্প আমাদের শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
সময় বদলেছে, মানুষের রুচি বদলেছে। কিন্তু কিছু জিনিস কখনো পুরোনো হয় না। কোডালি করুপ্পুর শাড়ি তেমনই একটি উদাহরণ। হয়তো এটি আজ আর আগের মতো সহজে পাওয়া যায় না। তবু এর গল্প, এর ঐতিহ্য এখনও বেঁচে আছে। নতুন প্রজন্মের আগ্রহ আর উদ্যোগ থাকলে একদিন হয়তো আবার ফিরে আসবে এই হারিয়ে যাওয়া রাজকীয় শাড়ি।