পান্তা-ইলিশ নয়, বৈশাখে নতুন স্বাদের খোঁজ

বৈশাখ মানেই একসময় ছিল পান্তা-ইলিশ। সাথে কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাপন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা আর খাদ্যরুচিও।

এখন পহেলা বৈশাখের টেবিলে শুধু পান্তা-ইলিশ নয়, যোগ হয়েছে নানা স্বাদের, নানা বৈচিত্র্যের খাবার। ঐতিহ্যকে পাশে রেখেই নতুন স্বাদের খোঁজে বেরিয়েছেন নগরজীবনের মানুষ।

ঢাকার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সকালটা শুরু হয় ভিন্নভাবে। পান্তা নেই, ইলিশও নেই। তবে টেবিলে সাজানো আলু ভর্তা, টমেটো ভর্তা, ডাল, বেগুন ভাজা, পিয়াজু আর গরম ভাত। পাশে দেশি মুরগির ঝোল।

অনেকে মনে করছেন, ইলিশ এখন অনেক দামী। তাই যেটা সহজলভ্য, সেটাই দিয়ে উদযাপন করি। তাতে কমতি হবে না, আনন্দেরও।

এমন চিত্র এখন শুধু একটি পরিবারের নয়, শহরের অনেক ঘরেই দেখা যাচ্ছে। বৈশাখের আনন্দ এখন আর একটি নির্দিষ্ট মেন্যুতে আটকে নেই। যোগ হচ্ছে নানা স্বাদ।

বাজারে ইলিশের দাম গত কয়েক বছরে ক্রমেই বেড়েছে। সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় অনেকেই বিকল্প খুঁজছেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। অতিরিক্ত তেল-ঝাল এড়িয়ে তুলনামূলক হালকা খাবারের দিকে ঝুঁকছেন অনেকে।

বৈশাখের টেবিলে এখন নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে ভর্তা-ভাজি। আলু, বেগুন, টমেটো, শুটকিসহ নানা ভর্তা। এই পরিচিত স্বাদগুলো যেন আবার ফিরে আসছে বাঙালির মূল শিকড়ে।

খাদ্যসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা এক গবেষক বলছিলেন, ‘পান্তা-ইলিশ মূলত একটি প্রতীকী খাবার। কিন্তু বাঙালির প্রকৃত ঐতিহ্য আরও বিস্তৃত। ভর্তা, ডাল, শাক-সবজি—এসবই আমাদের দৈনন্দিন সংস্কৃতির অংশ। এখন মানুষ আবার সেই জায়গায় ফিরছে।’

শহরের বিভিন্ন বাসায় এখন দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট আয়োজন। গরম ভাত, ডাল, একাধিক ভর্তা, ভাজি আর কোনো একটি দেশি মাছের ঝোল। সহজ, কিন্তু তৃপ্তিদায়ক।

শুধু ঘরেই নয়, রেস্তোরাঁগুলোতেও এসেছে পরিবর্তন। আগে যেখানে পান্তা-ইলিশ ছিল প্রধান আকর্ষণ। এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে বৈচিত্র্যময় মেন্যু।

ঢাকার স্বদেশী রেস্টুরেন্টে বৈশাখ উপলক্ষে ভর্তা, ইলিশ ভাজা, আচারি মুরগি, ভুনা খিচুড়ি, গরুর মাংস ছাড়াও মজার কিছু ভর্তা-ভাজি দিয়ে সাজিয়েছে প্যাকেজ।

চিলক্সের মতো বার্গারের শপও বৈশাখে নিয়ে এসেছে পান্তা প্যাকেজ। তারা বলছে, ‘এই বৈশাখে ইলিশ না পেলেও টেনশন নাই। ফিশ টটস দিয়ে পান্তা ভাত কিন্তু ভালোই জমবে।’

ঢাকার বাফেট লাউঞ্জও বৈশাখ উপলক্ষে রেখেছে ১০১ আইটেমে বুফে খাবার। দুপুরের খাবার উপভোগ করা যাবে ৮০০ টাকায় আর রাতে খরচ করতে হবে ৮৫০ টাকা।

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ফিউশন খাবারের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তারা ঐতিহ্যকে একেবারে বাদ না দিয়ে, তাতে নতুন স্বাদ যোগ করতে চায়। এই প্রবণতা শহরের ক্যাফে ও ফুডকোর্টগুলোতেও স্পষ্ট। বাংলা খাবারের সঙ্গে পশ্চিমা রান্নার মিশ্রণ এখন অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে।

তবে গ্রামবাংলার চিত্র কিছুটা আলাদা। সেখানে এখনো পান্তা-ইলিশের ঐতিহ্য অনেকটাই অটুট। তবে সেখানেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগছে। বৈশাখে পান্তা মাষ্ট।

তবে ইলিশ না পেলে অন্য মাছ থাকে। সঙ্গে থাকে নানা স্বাদের পিঠাও। গ্রামের বৈশাখে পিঠা, শাক-সবজি, দেশি মাছ বেশি দেখা যায়।

বর্তমানে অনেকেই স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে উঠেছেন। ফলে বৈশাখের খাবারেও এসেছে পরিবর্তন। তেল-ঝাল কম, ভাজাপোড়া কম, এমন খাবারের দিকে ঝুঁকছেন অনেকে।

পান্তা-ইলিশ বাঙালির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তবে সেটিই বৈশাখের একমাত্র পরিচয় নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নতুন স্বাদ, নতুন অভিজ্ঞতা খুঁজে নিচ্ছে।

বৈশাখের টেবিলে তাই এখন জায়গা করে নিচ্ছে ভর্তা, ভাজি, পিঠা, এমনকি ফিউশন খাবারও। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এই মেলবন্ধনই হয়তো আগামী দিনের বৈশাখকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলবে।