পেনি ডেটিং: আপনার পছন্দের মানুষটিও কি এই স্বভাবের?

রাফিয়া ও নাবিল (ছদ্মনাম)। তাঁদের মধ্যে এক ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। মূলত পেশাগত জায়গা থেকেই তাঁদের পরিচয়। সেটা একসময় বন্ধুত্বে রূপ নেয়। এর কিছুদিন পর তা ধীরে ধীরে প্রেমের আদল নিতে থাকে। 

আর সেই প্রেম শুরুর কিছুদিন পর থেকেই বাঁধল গণ্ডগোল। রাফিয়ার অভিযোগ, শুরুর দিনগুলোর মতো আর আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না নাবিলের মধ্যে। আবার নাবিলের আচরণও কেমন যেন! তাঁর মধ্যে রাফিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা দিনকে দিন বাড়তে থাকে। আর রাফিয়া লক্ষ্য করে দেখে, ঠিক যখনই সম্পর্ক জোরদারে নাবিলের কিছুটা প্রচেষ্টা দেখা যায়, তার পর পরই যেন সঙ্গীকে নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যায় তাঁর!

এই নিয়ে রাফিয়া–নাবিল জুটির মনোমালিন্যের শেষ নেই। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সম্পর্কটা আর টেকে কিনা—সে ব্যাপারেই প্রশ্নচিহ্ন উঠে যাচ্ছে।

সম্পর্কের এমনতর চিত্র কিন্তু একেবারে সৃষ্টিছাড়া নয়। বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম প্রান্তিকের প্রায় শেষে এসেই নাকি এ ঘরানার সম্পর্কের সৃষ্টি। অন্তত মানবসম্পর্ক নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা তাই বলছেন। পোশাকি ভাষায় এ ধরনের সম্পর্ক হচ্ছে ‘পেনি ডেটিং’। একে অত্যন্ত ক্ষতিকর আখ্যা দিয়ে বলা হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে প্রেমের শুরুর দিকে থাকা দুজন নর–নারীর মধ্যে একজন মারাত্মকভাবে মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। তবে তা বুঝতে দেরি হয়ে যায় ঢের। এবং যখন বোঝা যায় আদতেই, তখন আফসোস ও আক্ষেপই হয় একমাত্র অবলম্বন।

পেনি ডেটিং কি?

একটা মানুষ ক্রমশ সম্পর্কের দায়িত্ববোধ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, অথচ অপর প্রান্তের মানুষটি সেটি বুঝতেও পারছে না; বাড়তে থাকা অপ্রাপ্তির বদলে ন্যূনতম প্রাপ্তিটুকু নিয়ে খুশি থাকছে—এমন ধারণা থেকেই পেনি ডেটিং উদ্ভুত।

ভিডিও শেয়ারিংয়ের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম টিকটকে গত বছর পেনি ডেটিং টার্মটি ভাইরাল হয়। এমন সম্পর্কের আদ্যোপান্ত নিয়ে টিকটকার এরিকা থাম একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। তিনি নিজে অবশ্য তার এক পরিচিত ছেলে বন্ধুর মাধ্যমে এ ব্যাপারে জানতে পারেন।

পেনি ডেটিংয়ের ক্ষেত্রে পুরুষ তাঁর সঙ্গী নারীটিকে ‘পিগি ব্যাংক’ হিসেবে কল্পনা করে এবং সে অনুযায়ী সম্পর্কে বিনিয়োগ করে থাকে।

এরিকা বলেন, সম্পর্কের একেবারে শুরুতে নারী সঙ্গীর মন জয় করার উদ্দেশ্যে তাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে তোলা হয়। একে তিনি তুলনা করেছেন ১০০ ডলারের বিল দেওয়ার সাথে। একটা সময় সঙ্গীর আগ্রহ ধরে রাখা বা তার মধ্যে নিজের জন্য আকর্ষণ সৃষ্টির ইচ্ছাটা লোপ পেতে শুরু করে। একদিকে মেয়েটির আকর্ষণ বাড়তে থাকে, বিপরীতে ছেলেটি বুঝেশুনে ক্রমশ তার প্রচেষ্টা কমাতে থাকে। ধরে নেওয়া যাক, সে সম্পর্কে ১০ শতাংশ প্রচেষ্টা কমিয়ে দিলো বা ১০ ডলার বিল কমিয়ে ৯০ ডলারে পরিণত করলো।

‘এখান থেকেই সম্পর্কের অবনতির শুরু’, বলেন এরিকা। ছেলেটির যখন মেয়েটির প্রতি মনোযোগ কমতে থাকে, মেয়েটির নিজেরও আত্মবিশ্বাস গিয়ে ঠেকে তলানিতে। সহজ ভাষায়, সম্পর্কের শুরুতে শতভাগ বিনিয়োগ করে একটি মানুষের সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নেয়ার পর, অপর ব্যক্তিটি তার বিনিয়োগ কমিয়ে ৯০-এ নিয়ে আসে।

কিন্তু এরপর সে চালাকি করে আবার এটিকে ৯৫-এ নিয়ে যায়! দিনের পর দিন সম্পর্কে অবহেলিত হতে থাকা মেয়েটির চোখে তখন আর ১০ শতাংশ হারানোর বেদনা থাকে না, বরং নতুন করে সঙ্গীর কাছ থেকে পাওয়া ৫ শতাংশকে তার কাছে বিরাট অর্জন হিসেবে মনে হতে থাকে।

এরিকা বলেন, ‘এই চক্রটি এভাবেই চলতে থাকে। সম্পর্কে এফোর্ট বা প্রচেষ্টা না দিতে দিতে এমন সময় আসে যে, আপনি সঙ্গীকে হয়তো দিচ্ছেন পেনি (তামার কয়েন)। কিন্তু সে একেই নিকেল ধরে নিয়ে খুশি হয়ে উঠছে।’ মনে রাখতে হবে, নিকেল কিন্তু তামার চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি ব্যয়বহুল।

যেভাবে হয় পেনি ডেটিং

মোটাদাগে পাঁচটি ধাপে পেনি ডেটিং কার্যকর হয়ে থাকে। এগুলো হলো-
⦁        ব্যক্তি সঙ্গীর মনোযোগ আকর্ষণের জন্য অকাতরে সময়, অর্থ ব্যয় করবে; চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখবে না।
⦁        সঙ্গী পুরোপুরি আসক্ত হয়ে গেলে, ব্যক্তি তাঁর পেছনে বরাদ্দকৃত সময় বা অর্থের পরিমাণ কমিয়ে আনবে। এ সময় আত্মবিশ্বাস টলতে থাকে, অনেকে সঙ্গীর মনোযোগহীনতার জন্য নিজেকেই দোষারোপ করে।  
⦁        এ পর্যায়ে ব্যক্তি নিজে থেকে প্রচেষ্টার পরিমাণ সামান্য বাড়াবে, যেন অপর প্রান্তের মানুষটির কাছে একপ্রকার প্রাপ্তির অনুভূতি হয়।
⦁        এভাবে প্রতিনিয়ত একটি পক্ষের প্রচেষ্টা কমতে থাকবে। শুরুতে যিনি শতভাগ চেষ্টা বা নিবেদন করতেন, তিনি কখনো কখনো ৮০ শতাংশও দেবেন না।  
⦁        চক্রের ফাঁদে পড়ে একসময় নিজের অজান্তেই সঙ্গীটি অবহেলায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন।

কী করে বুঝবেন পেনি ডেটিং?

সম্পর্ক শুরুর আগেই অনেকের মধ্যে উপহার প্রদানের এক ধরনের প্রবণতা শুরু হয়ে যায়। এমন মানুষের পাল্লায় পড়লে সতর্ক হোন। সম্পর্কের শুরুটা হওয়া উচিত একে অপরকে চেনাজানার মাধ্যমে; উপহার দিয়ে মন জয় করে নয়!

ভালোবাসার মানুষটিকে আপনি যত চিনবেন, যত কাছে আসবেন, তাঁর জন্য ততোটাই নিজেকে উজাড় করে দিতে চাইবেন—একটা সুস্থ সম্পর্ক টিকে থাকার মূলমন্ত্র কিন্তু এটাই। যে মানুষটি আপনাকে ভালোবাসার দাবি করছে, সে ঠিক আপনার জন্য সময় বের করবে। কিন্তু হঠাৎ যদি এতদিনের চেনা মানুষটি বদলে যেতে থাকে, তাঁর অগ্রাধিকার তালিকায় আপনি যদি আর না থাকেন, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টার বদলে সে যদি আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তাহলে সময় হয়ে এসেছে নতুন করে ভাবার।

সব সময়ই যে ওই ব্যক্তি যে আপনাকে পেনি ডেট করছেন, তা নয়। তবুও এসব লক্ষণ সুস্থ সম্পর্কের নির্দেশক নয়, সেটি বুঝতে হবে।

প্রতিটি সম্পর্কেই স্পেস বা নিজস্ব পরিসর থাকা দরকার। সম্পর্কে রয়েছে বলে স্বাধীনভাবে নিজের মতো করে কেউ সময় কাটাতে পারবে না, এমন নিয়ম নেই। তবে সেটি যেন ভারসাম্য রক্ষা করে, সেদিকে সচেতন থাকতে হবে। নিজের জন্য সময়ের দোহাই দিয়ে দায়িত্ববোধ এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

সঙ্গীর জীবনে শতভাগ দখল যেমন নেওয়া যাবে না, তেমনি কোথায় সীমারেখা টানতে হবে সে জ্ঞান রাখাও আবশ্যক। দু’জনে মিলে খোলামেলা আলোচনা করে নিতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। মনের কোণে যত কথা আর আশঙ্কা জমে আছে, তা ভাগাভাগি করে নিলে অনেকটাই হালকা অনুভূত হবে। 

তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট, এনডিটিভি, নিউজএইটিন ডট কম ও সাইকোলজি টুডে