সন্তান সারাদিন মোবাইলে ডুবে থাকে। এই দৃশ্য এখন প্রায় সব পরিবারের জন্যই চেনা। খেলা-পড়াশোনা, বন্ধু, বই, সব ভুলে যেন ছোট্ট স্ক্রিনটাই হয়ে উঠেছে তাদের পৃথিবী। মোবাইল হাতে পেলেই বাচ্চা চুপচাপ। কিন্তু এই নীরবতার আড়ালে বাড়ছে বড় উদ্বেগ। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ছোটদের এই অতিরিক্ত স্ক্রিন-নির্ভরতা তাদের মনোযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। শুধু তাই-ই না, নষ্ট করছে ধৈর্য, দুর্বল করছে সামাজিক দক্ষতা। বয়স ২ হোক বা ১২, সমস্যা একটাই, ফোন ছাড়া যেন আর কিছুই মন ভরে না।
অনেক বাবা-মা রাগ করে ফোন কেড়ে নেন, তবে এতেই কি সমাধান মিলবে। মোটেই না। গবেষণা বলছে, এতে সমস্যা আরও বাড়ে। শিশুরা আরও জেদি হয়ে ওঠে, আরও বেশি সময় চাইতে থাকে মোবাইলের সঙ্গে। বরং দরকার সচেতন ও পরিকল্পিত পদ্ধতি। যাতে সন্তান ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়। তবে নিয়ন্ত্রণ রেখে।
নিচে রইল এমন ৫টি কৌশল, যেগুলো অনুসরণ করলে শিশুকে মোবাইল আসক্তি থেকে বের করে আনা সহজ হবে।
সময়সীমা বেধে দিন
শিশুর বয়স অনুযায়ী মোবাইল ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করুন। যেমন, খাওয়ার পর ৩০ মিনিট বা পড়াশোনা শেষে কিছু সময়। সময় শেষ হলে ফোন সরিয়ে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে বাবা-মাকে। তার জন্য চাই ধৈর্য। সময়সীমা মানলে তাকে প্রশংসা করুন। এতে তার মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হবে। দেখবেন সে নিজেই নিজের নিয়ন্ত্রণে গর্ব অনুভব করবে। ধীরে ধীরে সে বুঝে যাবে, ফোন মানে সারাদিন নয়, নির্দিষ্ট সময়ের আনন্দ।
মাজার কাজে ব্যস্ত রাখুন
বাচ্চারা বেশিরভাগ সময় বিরক্তি বা একঘেয়েমি কাটাতে ফোনে ডুবে যায়। তাই তাদের দিনটাকে সাজিয়ে দিন নানা কাজে। পাজল সমাধান, বোর্ড গেম, লেগো, আঁকা, কাগজ কাটা-ছেঁড়া, গল্পের বই, বাইরে দৌড়ঝাঁপ বা খেলার মাঠ। এসব কাজে যুক্ত থাকলে তার মনোযোগ অন্য দিকে যাবে, ফোনের কথা ভুলেই যাবে। প্রতিটি শিশুর আগ্রহ আলাদা, তাই তার পছন্দ অনুযায়ী কার্যক্রম বেছে নিন। এতে মানসিক, শারীরিক এবং সৃজনশীল বিকাশ, সবই এগোবে।
নিজের ফোন ব্যবহার কমান
শিশুরা যা দেখে, তাই শেখে। বাবা-মা সারাক্ষণ ফোনে থাকলে সন্তানও ভাববে, এটাই স্বাভাবিক। তাই নির্দিষ্ট সময় তৈরি করুন ‘ফোন-ফ্রি টাইম’। যেমন খাবারের সময়, ঘুমানোর আগে ১ ঘণ্টা, পারিবারিক সময় বা গল্পের সময়। এই সময়গুলোতে সবাই মিলেই ফোন দূরে রাখুন। শিশুর কাছে এটা হবে নিয়মের অংশ।
মোবাইল হবে শেখার মাধ্যম
মোবাইল মানেই খারাপ নয়, ঠিক মতো ব্যবহার করলে এটি হতে পারে শেখার উপকরণ। শিক্ষামূলক অ্যাপ, কুইজ, পাজল, বিজ্ঞান বা ইতিহাসের ছোট ভিডিও, শব্দ শেখার গেম, এসব দেখালে ফোনের প্রতি আকর্ষণ ঠিকই থাকবে। কিন্তু তা হবে কাজে লাগার মতো। এতে বাচ্চার মনে প্রযুক্তি নিয়ে ভয় নয়, বরং সচেতন ব্যবহার তৈরির অভ্যাস হবে।
শাসন নয়, কথা বলুন
বকুনি বা ফোন কেড়ে নেওয়া শিশুকে আরও দূরে ঠেলে দেয়। বরং শান্তভাবে বসে বুঝিয়ে বলুন, কেন বেশি মোবাইল ব্যবহার ঠিক নয়। তাকে সময় দিন, দিন শেষে গল্প করুন, তার অনুভূতিগুলো শুনুন। অনেক শিশুই একাকিত্ব বা বাবা-মাকে না পাওয়ার কষ্টে ফোনে ডুবে যায়। তাই তার মনের দিকেও নজর দিন। তার আবেগকে গুরুত্ব দিলে সে নিজেও বদলাতে চাইবে।
মোবাইল আসক্তি এক দিনে তৈরি হয় না, তাই কমাতেও সময় লাগে। কিন্তু নিয়ম, ভালোবাসা ও সচেতনতার মিশেলে শিশুকে খুব সহজেই প্রযুক্তির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে শেখানো যায়। সন্তানের হাতে ফোন থাকতেই পারে, তবে নিয়ন্ত্রণ থাকবে আপনার নিজের হাতে।