পরীক্ষা এলেই ঘরে যেন চাপা টানটান অবস্থা। বাবা-মা কখনও হয়ে ওঠেন কঠোর শাসক, আবার কখনও বাড়তি সান্ত্বনা দেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পরীক্ষার সময় কি সত্যিই অভিভাবকত্বের ধরন বদলানো উচিত? আসলে এই সময় বাচ্চাদের দরকার থাকে স্থিরতা, ভারসাম্য আর নির্ভরতার।
ঘরে ‘পরীক্ষা মোড’
স্কুলে পরীক্ষা মানেই শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, অভিভাবকদের জন্যও পরীক্ষা। হঠাৎ ঘরে বদলে যায় সময়সূচি, মেজাজ ওঠানামা করে, ধৈর্য্য কমে যায়। চারপাশে তৈরি হয় এক অদ্ভুত চাপের পরিবেশ।
আমার নিজের ঘরেই এর ভিন্ন দুই ছবি দেখি। ১৪ বছরের মেয়ে পরীক্ষা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তায় ডুবে যায়। অতিরিক্ত পড়া, রিভিশন আর ‘প্রশ্ন অন্যভাবে এলে উত্তর দিতে পারব তো?’ এই উদ্বেগ। অন্যদিকে ৭ বছরের ছোট মেয়ে পরীক্ষাকে নেয় প্রায় খেলার মতো হালকাভাবে। তার আত্মবিশ্বাস এতটাই বেশি যে বলে ফেলে, ‘মা, দুশ্চিন্তা কোরো না। আমি সব ঠিক পারবো।’
দুই ধরণের মানসিক অবস্থার মাঝামাঝি জায়গাটাই আসলে আদর্শ। কিন্তু অনেকেই বারবার দোলাচলে পড়ের, কখনও শাসন কড়াকড়ি, কখনও আবার নরম হয়ে যান।
অতিরিক্ত শাসনের ফাঁদ
দীর্ঘদিন ধরে পরিবারে পরীক্ষা মানেই ছিল ‘লকডাউন’। টেলিভিশন বন্ধ, ঘোরাঘুরি বন্ধ, খেলার সময় শেষ। বার্তা ছিল একটাই, শুধু পড়াশোনাই সব। বিরতি মানেই সময় নষ্ট। এর ফলে হয়তো ভালো নম্বর আসত। কিন্তু শিশুদের মনে গড়ে উঠত ভয় আর ক্ষোভ।
এখনকার বাবা-মায়েরা মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব বোঝেন। জানেন, অতিরিক্ত চাপ উল্টো ক্ষতি করতে পারে। স্ট্রেস, উদ্বেগ, এমনকি বার্নআউট ডেকে আনে। তাই আজকের অভিভাবকরা চেষ্টা করছেন ভারসাম্য আনার। প্রয়োজনে চাপ দিচ্ছেন, আবার দেখছেন কোথাও বেশি হয়ে যাচ্ছে কিনা।
তবুও পরীক্ষার সময় ঘরে একধরনের অদ্ভুত টানটান ভাব ছড়িয়ে পড়ে। বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ ভাবনা, তুলনা আর উদ্বেগ কথোপকথনের ভেতর দিয়ে অনিচ্ছায়ই ছড়িয়ে পড়ে।
স্থিরতার প্রয়োজন
পরীক্ষার সময় অভিভাবকত্বের ধরন হঠাৎ বদলে ফেলা উচিত নয়। শিশুদের কাছে সবচেয়ে জরুরি হলো ধারাবাহিকতা। তারা জানতে চায়, কোন সীমা অপরিবর্তনীয়, আর কোথায় তাদের একটু খোলা জায়গা আছে।
পরীক্ষা এলেই যদি সব খেলা বন্ধ, সব আনন্দ বাদ, প্রতিটি মিনিট নজরে রাখা শুরু হয়। তবে শিশুরা বুঝতে শেখে, পরীক্ষাই জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যাপার। এর ফলে তাদের আত্মমূল্যায়ন জড়িয়ে যায় কেবল নম্বরের সঙ্গে, শেখার আনন্দ নয়।
বরং পরীক্ষাকে স্বাভাবিক জীবনের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করাই দরকার। নিয়মিত রুটিন বজায় রাখা, খেলার বা শখের একটু সময় রাখা। পরিবারে একসঙ্গে খাওয়া আর কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া। এসব শিশুদের মানসিক স্থিরতা দেয়।
সমর্থন, তুলনা নয়
শুধু ‘কতটা সিলেবাস বাকি?’ বা ‘কতবার রিভিশন করেছ?’ না বলে, অভিভাবকরা যদি প্রশ্ন করেন, ‘আগামীকালের পরীক্ষাটা নিয়ে কেমন লাগছে?’ কিংবা ‘একটু হাঁটতে যাবে পড়ার আগে?’ তাহলেই শিশুরা বোঝে তারা পর্যবেক্ষণের নয়, বরং সমর্থনের জায়গায় আছে।
প্রত্যেক শিশুর স্বভাব আলাদা। কেউ চায় আশ্বাস, কেউ চায় হালকা ধাক্কা। তাই তুলনা নয়, বরং প্রয়োজন ব্যক্তিগত বোঝাপড়া।
হ্যাঁ, বাবা-মায়েরা ভুল করবেন। অতিরিক্ত শাসন করবেন। আবার নরম হয়ে ফিরবেন। এটাই স্বাভাবিক। তবে আগের প্রজন্মের মতো একটানা কড়া চাপ আর ভয়ের পরিবেশ আর নেই। আজকের অভিভাবকেরা চেষ্টা করছেন ভারসাম্য রাখতে, শিক্ষার সঙ্গে সহানুভূতিও।
পরীক্ষা নিঃসন্দেহে চাপের সময়। কিন্তু ঘরকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার প্রয়োজন নেই। বাচ্চাদের দরকার স্থির দিকনির্দেশনা। ধারাবাহিক নিয়ম আর মানসিক সমর্থন। কেবল পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকা কোনো ভিন্নধর্মী অভিভাবকত্ব নয়।


এবার যে ট্রেন্ডে ঝুঁকছেন অভিভাবকেরা
যে কারণে সন্তানের সঙ্গে অন্যদের তুলনা বন্ধ করা প্রয়োজন
