সন্তানরা ঘর ছাড়লেই কেন ভাঙছে দীর্ঘদিনের দাম্পত্য?

নিজেদের গুছিয়ে সন্তানরা বেরিয়ে গেলে খালি হয়ে যায় তাদের ঘর। ডাইনিং টেবিলে আর আগের মতো তাড়াহুড়ো নেই, সন্ধ্যার গল্পও থমকে যায়। কারও কাছে এই নীরবতা শান্তির। আবার কারও কাছে তা অস্বস্তিকর। আর এই নীরবতার ভেতরেই অনেক দীর্ঘদিনের দাম্পত্যে সামনে আসে অস্বস্তিকর সত্য।

এমন পরিস্থিতি থেকেই উঠে এসেছে একটি নতুন পরিভাষা ‘এম্পটি নেস্ট ডিভোর্স’। অর্থাৎ সন্তানরা ঘর ছাড়ার পর যে বিচ্ছেদ ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে এটি চল্লিশের শেষ, পঞ্চাশ বা ষাটের শুরুর দিকে থাকা দম্পতিদের মধ্যে দেখা যায়। যারা কয়েক দশক ধরে একসঙ্গে ছিলেন। বাইরে থেকে এই সম্পর্কগুলো স্থিতিশীল, এমনকি সফল বলেই মনে হতো। কিন্তু সন্তান লালন-পালনের অধ্যায় শেষ হতেই সম্পর্কের ফাটল আর আড়ালে থাকে না।

‘এম্পটি নেস্ট ডিভোর্স’ কী?

‘এম্পটি নেস্ট ডিভোর্স’ বলতে বোঝায়, সন্তানরা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর দাম্পত্যের ভাঙন। আন্তর্জাতিক পরিসরে একে অনেক সময় ‘গ্রে ডিভোর্স’ও বলা হয়। তবে এখানে মূল আবেগঘটিত ট্রিগারটি নির্দিষ্ট, সক্রিয় পিতামাতার জীবন থেকে হঠাৎ ফাঁকা সংসারে প্রবেশ।

অনেক দম্পতির ক্ষেত্রে সন্তান লালন-পালনই হয়ে ওঠে সম্পর্কের মূল সেতুবন্ধন। সন্তানদের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ, স্বাস্থ্য এসব নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যেই কাটে দিন। ফলে স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বপ্ন বা মানসিক দূরত্ব নিয়ে আলাদা করে ভাবার সুযোগ হয় না।

কিন্তু সেই যৌথ প্রকল্প শেষ হলে একসময় তারা মুখোমুখি হন। নিজেদের তখন প্রায় অপরিচিত দুজন মানুষ মনে হয়।

কেন বাড়ছে এই প্রবণতা?

একটি নির্দিষ্ট কারণ নয়। বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মিলিত প্রভাবেই বাড়ছে এই প্রবণতা।

আজকের দিনে পঞ্চাশোর্ধ্ব একজন মানুষ সামনে আরও ২৫-৩০ বছর জীবন পেতে পারেন। অনেকের কাছেই প্রশ্নটা তখন এমন হয়, অসন্তোষের ভেতরেই কি বাকি সময়টা কাটানো হবে? এই ভাবনা থেকেই কেউ কেউ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে পৌঁছান।

আর্থিক স্বনির্ভরতা

বর্তমানে অনেক নারীই কর্মজীবী, আর্থিকভাবে সচেতন ও স্বনির্ভর। আগের প্রজন্মে অর্থনৈতিক নির্ভরতা অনেককে অসুখী দাম্পত্যে আটকে রাখত। এখন সেই বাস্তব বাধা তুলনামূলক কম।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

বিচ্ছেদ এখনো অনেক সমাজে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপটে, কিছুটা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। তবু আগের মতো কঠোর সামাজিক ট্যাবু আর নেই। নগরজীবন, বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাব এবং পরিবার কাঠামোর পরিবর্তন বিচ্ছেদকে একটি দৃশ্যমান ও গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে সামনে এনেছে।

এটি কি ব্যর্থতার চিহ্ন?

অবশ্যই নয়। কিছু দাম্পত্য সম্পর্ক মূলত সন্তানকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। সেই অধ্যায় শেষ হলে সম্পর্কের চরিত্রও বদলে যায়। সব পরিবর্তন মানেই ব্যর্থতা নয়। কখনও কখনও একটি সম্পর্ক তার সময় শেষ করে ফেলে।

আবার অনেকে এই সময়টাকে নতুন করে শুরু করার সুযোগ হিসেবে দেখেন। কাউন্সেলিং নেন, পুরোনো ক্ষোভ নিয়ে কথা বলেন, নতুন করে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। তবে এর জন্য প্রয়োজন সচেতন প্রচেষ্টা, দুজনেরই।

জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়

‘এম্পটি নেস্ট ডিভোর্স’ আসলে মধ্যজীবনের এক সাহসী সিদ্ধান্তের গল্পও বটে। এটি দেখিয়ে দেয়, দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে মানুষ এখন আর শুধু সহ্য করাকে গুণ বলে মানতে রাজি নয়।

কারও জন্য এটি বহু বছরের সহযাত্রার বেদনাদায়ক সমাপ্তি। আবার কারও কাছে এটি এমন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা, যার অপেক্ষায় হয়তো তারা দীর্ঘদিন নীরবে ছিলেন।

সন্তানরা ঘর ছাড়লে বাড়ি শুধু শব্দহীন হয় না, বিক্ষিপ্ততাও সরে যায়। তখন সামনে থাকে কেবল দাম্পত্য সম্পর্কটি, আড়ালহীন, অনাবৃত। আর সেই স্পষ্টতাই অনেক সময় সবকিছু বদলে দেয়।

তথ্যসূত্র: টাইমস নাও