যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষ এখন কানাডার নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা করছেন। নতুন আইনের কারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ এই সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষ করে যাদের পূর্বপুরুষ কানাডায় জন্মেছিলেন, তাদের জন্য পথটা সহজ হয়েছে। কেউ কেউ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আবার অনেকে শুধু ভবিষ্যতের জন্য একটি বিকল্প রাখতে চান। এখনই কানাডায় চলে যাওয়ার পরিকল্পনা না থাকলেও ‘যদি দরকার হয়’ সেই ভাবনা থেকেই তারা আবেদন করছেন। তাই বলা যায়, কানাডার নাগরিকত্ব এখন অনেক আমেরিকানের কাছে এক ধরনের নিরাপদ ব্যাকআপ হয়ে উঠেছে।
আইনের পরিবর্তনে নতুন সুযোগ
২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পর নিউইয়র্কের বাসিন্দা এলেন রবিলার্ড কানাডার নাগরিকত্ব নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। তার মা কানাডার নোভা স্কোশিয়ায় জন্মেছিলেন। কিন্তু সে সময়কার আইনে বিদেশে জন্ম নেওয়া কানাডীয়রা তাদের সন্তানের কাছে নাগরিকত্ব দিতে পারতেন না। ফলে তিনি পরিকল্পনা বাদ দেন।
পরিস্থিতি বদলায় ২০২৩ সালে। কানাডার আদালত সেই আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। এরপর ডিসেম্বর থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর হয়। ফলে ‘প্রথম প্রজন্ম’ সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হয়। আর নতুন করে অনেকের জন্য নাগরিকত্বের সুযোগ তৈরি হয়।
এখন ৫২ বছর বয়সী রবিলার্ড তার ১৯ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে নাগরিকত্বের আবেদন করছেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, তিনি এখন তার সন্তানের কাছেও নাগরিকত্ব হস্তান্তর করতে পারবেন।
ভয়, হতাশা আর বিকল্প পরিকল্পনা
রবিলার্ড স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি পেয়েছেন। এমনকি একবার প্রতিবাদের পর কেউ তাকে অনুসরণও করেছিল। এসব কারণে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
তার ভাষায়, ‘এখনকার পৃথিবীটা আমার কাছে আর চেনা মনে হয় না।’ গত বছর মায়ের জন্মস্থান নোভা স্কোশিয়ায় গিয়ে তিনি ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা পান। ‘ওখানে মানুষ অনেক বেশি শান্ত, আন্তরিক। পরিবেশটা অনেক কম চাপের,’ বলছেন তিনি।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে অন্তত তার কাছে একটি বিকল্প থাকবে। গাড়ি চালিয়ে কানাডায় চলে যাওয়ার সুযোগ।
হঠাৎ কেন বেড়েছে আগ্রহ?
নতুন আইন চালুর পর নাগরিকত্ব আবেদন বেড়ে গেছে অনেকগুণ। অটোয়ার অভিবাসন পরামর্শক ক্যাসান্দ্রা ফুল্টজ জানান, আগে যেখানে মাসে ১০টি আবেদন আসত। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০-তে।
তিনি বলেন, ‘প্রতি নির্বাচনের পর কিছুদিনের জন্য আগ্রহ বাড়ে। কিন্তু এবারটা আলাদা। ২০২৪ সালের পর থেকে আগ্রহ একটানা বাড়ছেই।’
কানাডার কুইবেক আর্কাইভেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১০০টি নথির আবেদন আসে। আর ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫০০-তে।
বর্তমানে নাগরিকত্ব সনদ পেতে প্রায় ১০ মাস সময় লাগছে, এবং প্রায় ৫০ হাজার আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
৩৪ বছর বয়সী র্যাচেল র্যাব ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে লাতিন আমেরিকায় চলে যান। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার নির্বাচিত হওয়ার পর তার ভয় আবার ফিরে আসে।
তিনি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়া নিরাপদ নয়। ‘এখনকার সময়ে যেকোনো মানুষ টার্গেট হতে পারে,’ এমনটাই মনে করেন তিনি।
সম্প্রতি তিনি জানতে পারেন, তার পূর্বপুরুষ কানাডার অন্টারিওতে জন্মেছিলেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে তিনিও এখন কানাডার নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করছেন।
শুধু রাজনীতি নয়, আছে আবেগও
তবে সবাই যে শুধু রাজনৈতিক কারণে নাগরিকত্ব চাইছেন, তা নয়। অনেকেই পারিবারিক শিকড় খুঁজে পেতে, পড়াশোনা বা কাজের সুযোগের জন্য আবেদন করছেন।
নিউ হ্যাম্পশায়ারের টিমোথি বোলো বলেন, তিনি নিজের ফরাসি-কানাডীয় শিকড় জানার পর থেকেই কানাডার সঙ্গে সংযোগ অনুভব করেন। তিনি নিয়মিত কানাডায় ভ্রমণ করেন এবং সেখানে সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন।
আছে সমালোচনাও
এই সহজীকৃত নিয়ম নিয়ে কিছু কানাডীয়র আপত্তিও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এতে এমন মানুষ সুবিধা পাচ্ছেন, যাদের সঙ্গে কানাডার বাস্তব কোনো সম্পর্ক নেই। আবার কেউ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা কানাডাকে ‘প্ল্যান বি’ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের আইন বৈষম্যমূলক ছিল বলেই এটি পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন নিয়মের লক্ষ্য হলো সমতা নিশ্চিত করা। ফুল্টজের ভাষায়, ‘কানাডীয় মানে কানাডীয়, এখানে কোনো স্তরভেদ নেই।’
তবে কি ‘প্ল্যান বি’ হিসেবে কানাডা?
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, অনেক আমেরিকান এখনই দেশ ছাড়তে চান না। কিন্তু ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মাথায় রেখে তারা একটি বিকল্প পথ তৈরি করছেন। কেউ কেউ বলছেন, প্রয়োজন হলে যেন যাওয়ার সুযোগ থাকে। আর এটাই তাদের মূল ভাবনা।