বেনজীরের স্ত্রীর নামে কেনা জমি ফেরত চান মালিকেরা 

মাদারীপুরে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের স্ত্রীর নামে কেনা ৯০ একর জমি ফেরত চান জমির মালিকেরা। এসব জমির বেশিরভাগই হিন্দুদের। তাদের অভিযোগ, ভয়-ভীতি দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে কেনা হয়েছে তাদের জমি। এদিকে, গোপালগঞ্জে বেনজীর আহমেদের ছত্রছায়ায় অনেকে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

মাদারীপুরের রাজৈরে স্ত্রী জিসান মীর্জার নামে দুই বছরে প্রায় ৯০ একর জমি কিনেছেন সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর। আদালতের নির্দেশে তার সম্পত্তি ক্রোকের খবরে মুখ খুলতে শুরু করেছেন এসব জমির মালিকেরা। 

কদমবাড়ী ইউনিয়নের বড়খোলা গ্রামের স্বরসতী রায়ের অভিযোগ, ভয়-ভীতি দেখিয়ে তার ৩০ শতাংশ ফসলি জমি নামমাত্র মূল্যে কিনে নেয়া হয়েছে। আর দুলাল বালার তিন বিঘা জমি কিনে নেয়া হয়েছে মাত্র ৩ লাখ টাকায়।

ভুক্তভোগী স্বরসতী রায় বলেন, ‘ভিক্ষা করে খাইলেও এই জমি আমি কোনোদিন বিক্রি করতাম না। আমি বেঁচে থাকা অবস্থায় সন্তানদেরও বেঁচতে দিতাম না। এখন তো বিক্রি করতেই হলো।’ 

আরেক ভুক্তভোগী দুলাল বালা বলেন, ‘আমাকে বলা হয়েছিল, আপনি যদি এই জমি না দেন তাহলে এখানে চাষ করবেন কিভাবে? এখানে চাষবাদ করার মতো তো কোনো কায়দা নেই। কারণ আমি তো এখানে বাউন্ডারি দিয়ে দেব।’  

এ বিষয়ে কেউ আদালতে অভিযোগ করলে সহযোগিতা করার কথা জানিয়েছেন মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মো. মারুফুর রশিদ খান। তিনি বলেন, ‘অভিযোগ আনলে তখন আদালত যে সিদ্ধান্ত দেয়, সে অনুযায়ী প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্তক সহযোগীতা আমাদের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে।’ 

সম্প্রতি দৈনিক কালের কণ্ঠের এক প্রতিবেদনে সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের বিপুল সম্পদের কথা তুলে ধরা হয়। এতে দাবি করা হয়, বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, পাঁচ তারকা হোটেলের শেয়ার, গাজীপুর, কক্সবাজার, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে শত শত বিঘা জমির মালিকানা রয়েছে। 

এ খবর প্রকাশ হওয়ার পর সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীরের বিপুল অবৈধ সম্পদের অভিযোগ অনুসন্ধান করতে দুদকের কাছে আবেদন করেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। এর পরপরই বেনজীর আহমেদের বিপুল অবৈধ সম্পত্তির অভিযোগের অনুসন্ধান চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী সালা উদ্দিন রিগ্যান। 

এই দুই ঘটনার পর গত ১৮ এপ্রিল দুদকের সভায় সাবেক এই পুলিশ প্রধানের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর এর জন্য একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করে দুদক। কমিটির সদস্যরা হলেন, দুদক উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক নিয়ামুল হাসান গাজী ও জয়নাল আবেদীন। এরই মধ্যে বেনজীর ও তাঁর পরিবারের জাতীয় পরিচয়পত্র, আয়কর নথি ও কোম্পানির কাগজপত্র সংগ্রহ করেছে দুদক। বেনজীর ও তাঁর স্ত্রী সন্তানদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলবও করা হয়েছে। 

এরমধ্যে গত ২৩ মে দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে বেনজীর আহমেদের সব ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) এবং গোপালগঞ্জ ও কক্সবাজারের তাঁর ৮৩টি দলিলের সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেয় আদালত। আর ২৬ মে বেনজীরের স্ত্রী জিশান মির্জা, বড় মেয়ে ফারহিন রিস্তা বিনতে বেনজীর এবং ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের নামে থাকা বিভিন্ন সম্পত্তির দলিল, ঢাকায় ফ্ল্যাট ও কোম্পানির আংশিক শেয়ার ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়। 

দুদক বলছে, গণমাধ্যমে অবৈধ সম্পদের খবর প্রকাশের পর থেকেই সম্পদ রক্ষায় তৎপর হয়ে উঠে বেনজীর। এ সময় নিজেদের শতাধিক ব্যাংক হিসাবও বন্ধ করে দেন তিনি। একে একে ৫০টি এফডিআর ভেঙে নগদ প্রায় ১০০ কোটি টাকা তুলে নেন বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। এছাড়া ব্যাংকের হিসাবে থাকা আরও কয়েক কোটি টাকা এ সময় তুলে নেওয়া হয়।

ভিডিও দেখুন:এর রেশ কাটতে না কাটতেই জানা যায়, বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যরা দেশ ছেড়েছেন। গত বুধবার এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘বেনজীর আহমেদের দেশত‌্যা‌গে আদাল‌তের কোনো নি‌ষেধাজ্ঞা ছি‌ল না। তাই সে কোন দে‌শে গি‌য়ে‌ছে সেই বিষ‌য়ে সরকারের কাছে কো‌নো তথ‌্য নেই। তবে শোনা যাচ্ছে, তিনি সিঙ্গাপুরে আছেন।’

গত ৬ মে বেনজীর আহমেদকে দুদকে তলব করেছিল দুদক। এর একদিন আগে দেওয়া এক আবেদনে হাজির হতে সময় চান সাবেক পুলিশ প্রধান। পরে তাকে ২৩ জুন হাজির হতে নতুন সময় নির্ধারণ করে দুদক।

গোপালগঞ্জের কৈরাগীটোল গ্রামে বেনজীর আহমেদের সাভানা পার্কের জন্য জমি দখলের বিষয়টিও বেশ আলোচিত। নামমাত্র মূল্যে তার কাছে জমি বিক্রিতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। বেনজীর আহমেদকে যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের মধ্যে নাম আছে স্থানীয় সুজয় পোদ্দারের। 

একজন ভুক্তভোগী বলেন, ‘উত্তর কান্দায় পিলার গেড়েছে। বলেছে, এটা যদি না দাও তাহলে এই জমি আর পাবা না।’ 

যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সুজয় পোদ্দার। কেবল বালু বিক্রির সুবাদে বেনজীর আহমেদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল বলে দাবি তার। তিনি বলেন, ‘ভক্সপপ: আমি এই এলাকার একজন সাধারণ মানুষ। স্যার (বেনজীর) যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন তার হয়ে কি আমি কাউকে ক্ষমতা দেখাতে পারব?’ 

স্থানীয়দের অভিযোগ, বেনজীর আহমেদের ছত্রছায়ায় বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন সুজয় পোদ্দার।

এখন পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ অন্তত ১০ জেলায় বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে ২ হাজার ৩৮৫ বিঘা বা ৭৮৬ একর জমি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি জেলাগুলো হলো গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, সাতক্ষীরা, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, বান্দরবান ও কক্সবাজার। এসব জেলায় রয়েছে জমি, খামার, রিসোর্ট। সেন্ট মার্টিন দ্বীপেও আছে জমি।

আরও পড়ুন: