বিচারাধীন বিষয় হলেও কোটা সংস্কার আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা আদালত অবমাননা করছেন বলে মনে করেন না আইনজ্ঞরা। বরং সুপ্রিমকোর্টের অনেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর মতে, আন্দোলন সমাবেশ করা তাদের সাংবিধানিক অধিকার। অন্যদিকে বিচারাধীন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ রাষ্ট্রপক্ষের।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-১ শাখা নবম গ্রেড এবং ১০ম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত সরাসরি নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করে একটি পরিপত্র জারি করা করে। এতে নারী কোটা ১০ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ এবং ১০ শতাংশ জেলা কোটা বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়।
পরে ওই পরিপত্র চ্যালেঞ্জ করে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও প্রজন্ম কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সভাপতি অহিদুল ইসলাম তুষারসহ সাতজন হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। ওই রিটের শুনানি শেষে গত ৫ জুন সরকারের জারি করা পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। এতে সরকারি চাকরিতে আবারও কোটা ফিরে আসে।
বিষয়টি আপিলে গেলে গত ৯ জুন হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে বিষয়টি আপিল বিভাগের বেঞ্চে শুনানীর জন্য পাঠান চেম্বার বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম। ৪ জুলাই আপিল বেঞ্চ জানায়, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর মামলাটির শুনানি শুরু হবে।
মূলত এরপর থেকেই আবারও কোটা সংস্কারের দাবিতে জোর আন্দোলন শুরু করেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের অংশ হিসেবে নিয়মিত সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করছেন। এতে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
এই অবস্থায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন বিচারাধীন বিষয় নিয়ে এভাবে আন্দোলন করা যায় কিনা? এতে আদালত অবমাননা হচ্ছে কিনা? সুপ্রিমকোর্টের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জানান, সংবিধানের ৩৭, ৩৮, ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সভা–সমাবেশ করা এবং দাবি জানানো নাগরিক অধিকার। রায়ের সমালোচনা করা যায় বলেও মত অনেকের। তবে এক্ষেত্রে কটাক্ষ করা যাবে না বিচার বিভাগকে।
সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা তো কোর্ট নিয়ে কিছু বলছে না। কোর্ট নিয়ে একটি খারাপ কথাও বলছে না। তারা কোটার কুফল বোঝাচ্ছে। তারা চাচ্ছে, সরকার আন্তরিক হোক। ঠিক যে-রকম ২০১৮ সালে হয়েছিল। কাজেই এখানে আমি বলবো জ্ঞ্যানপাপীরা সাবজুডিস বলে এগুলো বলছে, তারা আইনের যথার্থ ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না।’
সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘একটা রায় যখন হয়ে যায় সেটা পাবলিক প্রোপার্টি হয়ে যায়। যতভাবে সম্ভব এটার সমালোচনা করা যাবে। যেমন আমি সমালোচনা করছি, পলিসি ম্যাটারে হাইকোর্ট সব সময় বলে যে আমরা ইন্টারফেয়ার করব না। কিন্তু এক্ষেত্রে তো ইন্টারফেয়ার করে ফেলল।’
কোটা বিরোধী এই আন্দোলনকে আদালত অবমাননা বলছেন না অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন ও সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদও। তবে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে আন্দোলন করা থেকে বিরত থেকে চূড়ান্ত রায় পর্যন্ত অপেক্ষার পরামর্শ তাদের।
অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘আমি মনে করি, আন্দোলন না করাই ওনাদের উচিত হবে। আদালতে যেটা বিচারাধীন সেটা নিয়ে রাজপথে না দাঁড়িয়ে…. এটা তো আদালতে আছেই। বিচার তো হচ্ছেই। হবে।’
সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, ‘আন্দোলন করা আর আদালত অবমাননা করা এক কথা না। তারা যদি আদালতের কাজে বাধা সৃষ্টি করে বা আদালতকে তার বিচারিক কাজ থেকে দুরে রাখতে চায়। ধমক দিয়ে হোক বা যেভাবেই হোক। সেটা এক কথা।’
বুধবারের মধ্যে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পেলে বৃহস্পতিবার কোটা বাতিলে আপিল বিভাগে নিয়মিত আপিল করবে রাষ্ট্রপক্ষ।