‘উদ্ধারের আগে দুই দিন সাগরে ভেসেছিলাম’

অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে গত সপ্তাহে আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২৫০ জন। মর্মান্তিক এই ঘটনা আবারও অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকি ও মানবপাচারের নির্মম বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে। 

দুর্ঘটনায় বেঁচে ফেরা নয় সদস্যের একজন হলেন কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিক। তার রোমহর্ষক বর্ণনায় উঠে এসেছে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।

সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে রফিক বলেন, 'আমাদের নিয়ে ৪ঠা এপ্রিল টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল ট্রলারটি। ৮ই এপ্রিল সকালে আন্দামান সাগরে এটি ডুবে যায়। উদ্ধার হওয়ার আগে দুই দিন আমি সাগরের নোনা পানিতে ভেসেছিলাম।'

তার ভাষ্যমতে, ট্রলারটি ডুবে যাওয়ার আগেই অন্তত ৩০ জন যাত্রী অনাহার এবং নির্যাতনে মারা যান। আরোহীদের মাছ রাখার কোল্ড স্টোরেজে গাদাগাদি করে লুকিয়ে রাখা হতো এবং নিয়মিত মারধর করা হতো।

মোহাম্মদ রফিক আরও জানান, আমরা যখন আন্দামান সাগরে পৌঁছাই, তখন পানি চেয়েছিলাম। কিন্তু পাচারকারীরা আমাদের একটি রুমে আটকে রাখে। সেখানে প্রচণ্ড গরম ছিল। আমরা শ্বাস নিতে পারছিলাম না। অনেকেই শ্বাস নিতে না পেরে মারা গেছে।

তিনি বলেন, ‘ট্রলারটি ঝড়ের কবলে পড়ার সময় আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। গরম তেল আমার শরীরে পড়ে। পরে জ্ঞান ফেরার পর দেখি আমি সমুদ্রে ভাসছি। আমরা একদিন একরাত পানিতে ভেসেছিলাম। পরে একটি তেলবাহী জাহাজ আমাদের উদ্ধার করে।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে রফিক জানান, তিনি ট্রলারে অন্তত ১৩ জন পাচারকারীকে দেখেছেন।

উল্লেখ্য, গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি বোঝাই একটি ট্রলার। এর ৪ দিন পর বৈরি আবহাওয়া ও অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে ট্রলারটি ডুবে যায়।

মঙ্গলবার জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানায়, এ ঘটনায় নারী-শিশুসহ অন্তত ২৫০ রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নিখোঁজ হন। তাদের অনেকেই আর বেঁচে নেই বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ উম্মে হাবিবার মা উম্মে তারা। তিনি জানান, তার মেয়ে উম্মে হাবিবার এখনও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। মালয়েশিয়ায় স্বামীর সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন নিয়েই যাত্রা করেছিলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার মেয়ে বলেছিল, সে স্বামীর কাছে যাবে, পরিবার গড়বে। অনেকেই তাদের স্বজনের খবর পেয়েছে, কিন্তু আমার মেয়ের কোনো খবর নেই। আমার মন বলছে, সে হয়তো আর বেঁচে নেই।’ 

এই ট্রলারডুবির ঘটনা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকি ও মানবপাচারের নির্মম বাস্তবতা।

আন্দামানে নিখোঁজ ট্রলারযাত্রীদের খোঁজে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন তাদের স্বজনরা। বিবিসি'র এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, টেকনাফের বাসিন্দা নেজাম উদ্দিন হন্যে হয়ে খুঁজছেন তার ছোট ভাই তারেককে। দালালের মাধ্যমে পর্যটন ভিসায় মালয়েশিয়া পাঠানোর নামে তারেকের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা ও পাসপোর্ট নিয়েছিল পাচারকারীরা। 

রফিকের মতো বেঁচে ফেরাদের কাছে তারেকের ছবি দেখানোর পর তারা নিশ্চিত করেছেন যে, তারেক ওই ট্রলারে ছিলেন, কিন্তু তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। নেজাম উদ্দিনের মতো আরও অনেক পরিবার এখন প্রিয়জনের ফেরার প্রতীক্ষায় সাগরের দিকে চেয়ে আছেন।

উল্লেখ্য, গত ৯ই এপ্রিল আন্দামান সাগরে ভাসমান অবস্থায় আটজন পুরুষ ও একজন নারীকে উদ্ধার করে বাংলাদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ 'মোটর ট্যাংকার মেঘনা প্রাইড'। পরে তাদের কোস্ট গার্ডের জাহাজ 'মনসুর আলী'র কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, গভীর সমুদ্রে পানির ড্রাম এবং কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরা অবস্থায় ওই নয়জনকে পাওয়া যায়। ট্রলারটিতে প্রায় ২৫০ বা তারও বেশি যাত্রী ছিল বলে ধারণা করছে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। তবে এখন পর্যন্ত ডুবে যাওয়া ট্রলারটির কোনো ধ্বংসাবশেষ বা বাকি যাত্রীদের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি এবং তিনজন রোহিঙ্গা। টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা নাগরিকদের ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া ছয় বাংলাদেশির মধ্যে চারজন ওই পাচারকারী চক্রের সদস্য বা ট্রলারের স্টাফ বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে মানবপাচার মামলা দায়ের করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, পাচারকারীরা ভালো চাকরি, মোটা অঙ্কের বেতন এবং অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ট্রলারে তুলেছিল। দারিদ্র্য ও সামাজিক অসহায়ত্বকে পুঁজি করে পাচারকারীরা গভীর সমুদ্রে বড় বোটে করে যাত্রী পারাপার করে।

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের তথ্যমতে, গত এক বছরে তারা ৫৭০ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার এবং ৪৮ জন পাচারকারীকে আটক করেছে। তবে রুটি-রুজির সন্ধানে এই মরণযাত্রা থামাতে টেকনাফ ও সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।