গাড়িওয়ালারা বৃষ্টি হলেই কেন গায়ে কাদা-পানি ছিটান?

একজন নারী ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। বৃষ্টি হওয়ায় ফুটপাতের পাশেই জমে ছিল পানি, বেশ ভালো পরিমাণেই। ওই সময়ই দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল দুরন্ত গতিতে ছুটে আসছিল একটি গাড়ি। আর তা দেখেই সেই নারী হাতে তুলে নিলেন একটা ইট বা পাথর! এতেই ম্যাজিকের মতো কমে গেল গাড়ির গতি। একদম শান্ত-সুবোধ বালকের মতো গতি একেবারে কমিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে গাড়িটি পার হলো। এক ইটেই ওই নারী বেঁচে গেলেন গাড়ির চাকায় ছেটানো কাদা-পানি থেকে!  

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে এই ভিডিও বেশ ভাইরাল। এমন নানা ধরনের ভিডিও দেখতে পাওয়া যায় ফেসবুক-ইউটিউবে। ওপরের ওই ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট যে, গাড়িওয়ালাদের বৃষ্টির দিনে এভাবে পথচারীদের গায়ে কাদা-পানি ছিটিয়ে দেওয়া বেশ সাধারণ একটি দৃশ্য। তা দেশে হোক বা বিদেশে। যদিও ওই নারী গাড়ি ভাঙার মতো কোনো কাজ করেননি। বরং কিছুটা মরিয়া হয়েই তেমনটা করেছিলেন বলে বোধ হয়। অবশ্য সেটি কোনো আদর্শ পন্থাও হয়তো নয়।

যেকোনো দেশের রাজধানী শহরে হুজ্জত থাকে অনেক। এক তো মানুষের ভিড় থাকে তুলনামূলক বেশি, সেই সঙ্গে মানুষের ভিড়ে সুযোগ-সুবিধাও থাকে খানিকটা সীমিত। বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সংকট কিছুটা বেশি থাকে। এসব সংকট ব্যক্তি ও পেশা জীবনেও হানা দেয় মাঝেমধ্যে। কীভাবে? আসুন, সে সম্পর্কেই একটু আলোচনা করা যাক।

এই তো সেদিনকার ঘটনা। ঘন-ঘোর বরষায় আকাশ কাঁদছিল বিরতিহীনভাবে। অবশেষে জল ঢালায় একটুখানি বিরতি দেওয়ায় ফাঁক বুঝে বের হওয়ার চেষ্টা চলছিল। প্রথমে রিকশাকে অবলম্বন মেনে চলল দ্বিতীয় যান হিসেবে বাস অভিমুখে যাত্রা। আর যাই হোক, ঝড়-বাদলে তো আর পেটের খিদে কমে না। আর পেটের খিদেকে বাগে রাখতে হলে রুটি-রুজির সংস্থান আবশ্যক।

কিন্তু মাঝপথেই ঘটে গেল দুর্ঘটনা। রাস্তার মোড়ে আসতেই একটি গাড়ি দ্রুত গতিতে পাশ কাটাতে গিয়ে ছিটিয়ে দিল একরাশ কাদা-পানি। রিকশাচালক ও হতভাগা আমার তখন নতুন রূপ! কাদা-পানি পোশাকের পাশাপাশি আমাদের অনাবৃত হাতেও তখন এই শহরের বালুমাটির স্পর্শ দিয়েছে। কাপড়-চোপড়ের কথা আর কী বলব! পুরো প্রিন্টেড হয়ে গেছে তখন আমার এক রঙা শার্ট-প্যান্ট। রিকশাচালক ভাইকে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ স্থানু হয়ে থাকতে হলো এবং সেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হয়ে গেল। আসলে ভাবছিলাম যে, এই ছাপা ছাপা কাপড়ে অফিসের ঊর্ধ্বতনেরা কি আমাকে মেনে নেবেন?

নানান অবস্থায় ঊর্ধ্বতনদের এই মেনে নেওয়া, না নেওয়ার বিষয়গুলো নিয়েই বিশেষভাবে ভাবতে হয় এ শহরের নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষদের। কারণ ওসবের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে রুটি-রুজি। কথায় তো আছেই– আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী!

এসব ভাবতে ভাবতেই আবার মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে চলে আসে হাতে পরা ঘড়ি। সে টিক টিক করে জানিয়ে দিচ্ছিল কর্মস্থলে যাওয়ার নির্ধারিত সময়ের বিষয়টি। ফলে দুই হাতে পোশাকের ছোপ ছোপ দাগ যতটা সম্ভব আবছা করার বৃথা চেষ্টা করে পা চালাতেই হলো। ভেবে নিতেই হলো, ‘এভাবে রাঙিয়ে দিলে আমার আর কী-ইবা করার আছে!’

ঠিক এমন ভাবনা হয়তো এই শহরের অনেককেই জোর করে ভেবে নিতে হয়। কারণ, বৃষ্টির দিনে এভাবে আশপাশের মানুষদের কাদা-পানিতে রাঙিয়ে দেওয়ার কাজটি প্রায়ই করে থাকেন গাড়িওয়ালারা। এই গাড়ি বলতে আসলে ব্যক্তিগত, পাবলিক ও মোটরসাইকেল চালানো সবাইকেই বোঝানো হচ্ছে। যন্ত্রচালিত যানবাহনের উদ্ভব হয়েছিল ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের পর থেকে। বর্তমানে তো এসব ছাড়া দুনিয়া কল্পনাই করা যায় না। আগেকার মতো এখনও যন্ত্রযানের মালিক হওয়া এক ভিন্ন ধরনের সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। আর আমাদের ঢাকা শহরে বাড়তি হিসেবে বৃষ্টির দিনে এসব শকটের বাদবাকি সবাইকে ভিজিয়ে দেওয়ার প্রবণতা হয়ে ওঠে প্রকট।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, তবে কি রাস্তায় গাড়ি চলবে না? দোষ কি শুধু গাড়ির? বর্ষা-বাদল এলেই যে রাস্তা খুঁড়ে গর্ত বানিয়ে তাতে কাদা-পানি তৈরি করার বন্দোবস্ত হয়, তার কি কোনো দোষই নেই? শুধু গাড়ি তার চাকা চালালেই দোষ?

অবশ্যই দোষ শুধু গাড়ির নয়। সমস্যা হলো, অসময়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে সটান রাস্তাকে মেঠোপথ বানিয়ে দেওয়ার রীতি একদিনের নয়। এ নিয়ে কথাও হয়েছে অনেক। কিন্তু তা আসলে অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কিছু না। কখনো কখনো আবার প্রয়োজনেও এটি করতে হয়। কারণ যা-ই হোক, এমনটা এ দেশে হয়ে থাকে, সেটিই হলো বাস্তবতা। এখন সেই ক্ষোভে যদি আমরাও আশপাশের কারও কথা না ভেবে সজোরে গাড়ি চালানো শুরু করি, তবে কি আর কোনো সমাধান আসবে? বৃষ্টির দিনে বরং যদি শুধু নিজেদের কথা না ভেবে, এই শহরের ছাতা মাথায় দিয়ে পথচলতি অন্য মানুষদের কথাও একটু স্মরণে রাখা যায়– তাতেই কিন্তু কাদা-পানিতে মাখামাখি হওয়া থেকে অন্যদের রক্ষা করা যায়। সে জন্য প্রয়োজন শুধু একটুখানি সহমর্মী হওয়া, সহানুভূতিশীল হওয়া। গতি একটু কমিয়ে রাস্তায় চললে নিশ্চয়ই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না।

যদিও এই সমাজে আমাদের অনেকের মর্যাদাজনিত জটিলতার কারণেও অনেক সময় গাড়িজনিত বেলেল্লাপনা হয়ে থাকে। এই যেমন ধরুন, আপনার গায়ে প্রায় গা লাগিয়ে প্রচণ্ড গতিতে লাউড স্পিকারে গান বাজাতে বাজাতে চলে গেল কোনো গাড়ি। কেউ কেউ আবার অযথা হর্ন বাজিয়ে অন্যের কানের বারোটা বা একটা বাজাতে খুবই ভালোবাসেন। কাদা-পানি ছিটানোর সঙ্গে সঙ্গে এসব ঘটনাও সাধারণদের সঙ্গে হরহামেশাই ঘটে এই শহরে। এগুলোর মূল কারণই হলো, গাড়ির ভেতরের এবং বাইরের মানুষের মধ্যকার আর্থ-সামাজিক তফাৎকে বড় করে দেখানো। এবং সেই দেখানোপনা থেকেই জন্ম হয় অন্য পক্ষকে যন্ত্রণা দিয়ে তা বোঝানোর তাড়না।

এ প্রসঙ্গে একটি অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নেওয়া যাক। এই অভাজনের এক বন্ধু বেশ শখ করে একবার একটি মোটরবাইক কেনেন। এর আগ পর্যন্ত তিনি রিকশায় বা হেঁটে চলাচল করতেন। সেই সঙ্গে গা ঘেঁষে চলা যানবাহনদের নিয়ে নানা ক্ষোভও ঝাড়তেন। কিন্তু বাইক কিনে নিজে চালানো শুরুর পর থেকেই সেই বন্ধুর অন্য রূপ দৃশ্যমান হলো। সেটি হলো– বাইকের আশপাশে কেউ এলেই খেপে যাওয়া শুরু হলো তাঁর, তা মানুষ হোক বা রিকশা। কেউ সামনে পড়লেই তার ঘাড়ে রাস্তায় চলতে না পারার অক্ষমতা মৌখিকভাবে চাপিয়ে দিতে থাকলেন তিনি। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যে, তাঁর বাইকে লাগিয়ে দেওয়া দূরের কথা, চৌহদ্দির মধ্যে আসাটাই যেন একটা অপরাধ! বোঝাই গেল যে, বাইক কেনায় বন্ধুবরের মর্যাদার স্কেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সমৃদ্ধি ঘটেছে। আর তাতে এখন আর সাধারণেরা কোনো পাত্তা পাচ্ছেন না। অন্যরা তখন কুজাত, আর তিনিই যেন অভিজাত!

শকটের প্রভাবে নিজেদের এই অভিজাত ভেবে নেওয়ার প্রকট ভাবনার কারণেই কিন্তু গাড়ির মালিকেরা একসময় গাড়িওয়ালা বনে যান। তখন গাড়ি স্রেফ চলাচলের বাহন থাকে না, বরং উঁচু-নিচুর মধ্যকার বিভেদের দেওয়াল হয়ে দাঁড়ায়। হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতার প্রতীক। আর কে না জানে যে, ক্ষমতার অহমিকা সংক্রামক। এই কারণেই কিন্তু কাদা-পানি ছিটবে জেনেও আমরা গাড়ি চালাই রেসিং কারের গতিতে। কে ভিজল, কার গায়ে কাদার ছাপ বসে গেল– সে নিয়ে তখন কে ভাবে তখন?

অথচ একটু সহমর্মী হলেই এসব এড়ানো সম্ভব। এর জন্য নিজের মতো অন্যদেরও শুধু মানুষ বলে ভাবতে হবে কেবল। নিজের গায়ে অহেতুক কাদা লাগলে কেমন লাগত– সেই অনুভূতিটা কল্পনায় ভেবে হলেও মনের কোণে জমা রাখতে হবে। তবেই দেখবেন, বৃষ্টির দিনে রাস্তায় কাদা-পানি দেখলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পা চলে যাবে ব্রেকে, ভুলে যাবেন একসেলেটরকে। কারও দৃষ্টিতে ভিলেন হওয়ার বদলে এটা নিশ্চয়ই অনেকগুণে ভালো– কী বলেন?

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন