ক্যামেরুনের বর্তমান প্রেসিডেন্টের বয়স ৯৩ বছর। এতটা না থাকলেও বিশ্বের বেশ কয়েকজন উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রনেতার বয়স এখন ৮০ পেরিয়ে। আর সত্তরোর্ধ্ব রাষ্ট্রনেতার হিসাবে বসলে কোনো থই পাওয়া যাবে না। এ তো থাকতেই পারে। জনতা তো নেতা হিসেবে একজন অভিজ্ঞ মানুষকেই চায়। এই চাওয়া থেকেই তারা রাষ্ট্রনেতা হিসেবে হয়তো একজন বয়সী মানুষকে নির্বাচন করে। তাহলে এ প্রশ্ন উঠছে কেন?
প্রশ্নটি হঠাৎ করেই যে সামনে এসেছে তাও নয়। বেশ কিছুদিন ধরেই এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এটা এতটাই যে সম্প্রতি আমেরিকায় এ নিয়ে জরিপও হয়েছে। এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে, এ প্রশ্নের কেন্দ্রে আছেন জো বাইডেন, স্বয়ং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বর্তমান বয়স ৮০ বছর। তাঁর চেয়ে বেশি বয়সী রাষ্ট্রনেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ও সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ। দুজনেরই বয়স ৮৭ বছর। এর মধ্যে শেষোক্ত দুজনকে নিয়ে তেমন হল্লা নেই। প্রথমজন প্রেসিডেন্ট হলেও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের মধ্যে অনেকটাই নির্জীব এক নেতা, যাকে জনতা বেছে নিয়েছে কিনা, তা নিয়েও নানা আলোচনা আছে। আর দ্বিতীয়জনকে আক্ষরিক অর্থেই নির্জীব বলা যায়, যেখানে রাজতন্ত্র চলছে। কারণ, সৌদি আরবের কার্যত শাসক (ডি-ফ্যাক্টো) হলেন তাঁর ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমান। ফলে জো বাইডেনই যে এই বয়স নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
বলা হচ্ছে, ২০২৪ সালে আমেরিকার আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যারা লড়বেন, তাঁদের সবারই বয়সের কোনো গাছপাথর নেই। এ নিয়ে মার্কিন জনপরিসরে বেশ আলোচনাও চলছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, রাজনীতিকদের কেন অবসরের বয়সসীমা থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে নেই। কোনো দেশের আইনসভার সদস্য হওয়ার বা প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর মতো পদে আসীন হওয়ার জন্য ন্যূনতম বয়সের একটা সীমা কোথাও কোথাও থাকলেও উচ্চসীমা নির্ধারণ করে দেওয়ার চর্চা নেই। আমেরিকায়ও নেই। তবে আলোচনাটা আছে।
এই আলোচনার কারণ জো বাইডেন নিজেই। তাঁর অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর বা এ ধরনের গুঞ্জন তাঁর ওভাল অফিসে প্রথম প্রবেশের পর থেকেই বেশ চাউর হয়েছে। এখন যখন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হবেন কিনা, সে বিষয়ে নানা সমীকরণ চলমান, তখন তো এ নিয়ে হইচই হবেই। এতে আবার রসদ জোগাচ্ছেন একমেবাদ্বিতীয়ম ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি কিনা নিজেও বয়সী এবং পুনরায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার খায়েশ রাখেন।
ফলে গোটা আমেরিকাতেই এখন জোর আলোচনা চলছে যে, কত বছর বয়স হলে কোনো রাজনীতিকের পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ নিয়ে নানা তত্ত্বও সামনে আসছে।
আমেরিকায় অবসরের বয়স ৬৫ বছর। সে হিসাবে জো বাইডেন (৮০) বা ডোনাল্ড ট্রাম্প (৭৭) দুজনই অবসর সীমা পেরিয়ে গেছেন। শরীরও তাঁদের বসে নেই। বর্তমান প্রেসিডেন্টের যদি হোঁচট খাওয়ার প্রবণতা থাকে তো সাবেক প্রেসিডেন্টের ছিল গুরুত্বপূর্ণ সভায় ঘুমিয়ে পড়ার প্রবণতা। এ নিয়ে হাস্যরসও কম হয়নি।
থাক সেসব আলোচনা। দেখা যাক, বয়স হলে আসলেই কী হয়, বিশেষত মগজে। কারণ একজন নেতার জন্য মানসিক সক্ষমতা থাকাটা সবচেয়ে জরুরি। তা না হলে দেখা যাবে, শুধু বয়সের কারণেই হয়তো কোনো নেতা অহেতুক চটে যাচ্ছেন কিংবা জরুরি সময়ে নির্লিপ্ত বসে আছেন।
স্নায়োবিক বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান বলছে, একজন মানুষের বয়সের সাথে সাথে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো মানসিক সক্ষমতা থাকবে কি থাকবে না, তা আসলে অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বয়স কোনো বিষয় নয়। সেটা আসলেই একটা সংখ্যা কেবল। কিন্তু তাঁরা তো ব্যতিক্রম।
দেখা যাক বরং বয়সের সাথে সাথে মানুষের মস্তিষ্কে কী ঘটে? গবেষণার বরাত দিয়ে এ সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, সাধারণত স্বাস্থ্যবান মানুষের অগ্রমস্তিষ্কের সক্ষমতা প্রতি দশকে ৫ শতাংশ হারে কমতে থাকে। এই অগ্রমস্তিষ্ক আসলে কী করে? মস্তিষ্কের বাকি অঞ্চলগুলোর সাথে সমন্বয় করে এটি আসলে জটিল সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। একই সঙ্গে লক্ষ্য নির্ধারণ, সমস্যা সমাধানের মতো কাজগুলোর সাথেও এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কবে থেকে কমতে শুরু করে এই অগ্রমস্তিষ্কের সক্ষমতা? উত্তর হলো ৩০ বছরের পর থেকে। একটু কি হতাশ লাগছে? লাগাটাই স্বাভাবিক। কারণ, চালু বয়ানের বিপরীতে যাচ্ছে তথ্যটি। চালু বয়ানটি হলো-লাইফ স্টার্টস আফটার ফরটি। নানা দিক থেকে বিষয়টি সত্য মনে হলেও মস্তিষ্কের সক্ষমতা বিচারে যে ভুল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ কারণেই শিক্ষা, চর্চা, কর্মজীবনের শুরু ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় জীবনের শুরুর ২৫ বছরের মধ্যে করার ওপর জোর দেওয়া হয়। এও বহু পুরোনো আমল থেকেই।
তবে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। মস্তিষ্কের আর কতটাই-বা সাধারণ জনতা ব্যবহার করে! খুব বেশি নয়। তাই নিঃশেষ হওয়া নিয়ে অত ভয় পাওয়ারও কিছু নেই। মূল বিপত্তি বাধে সত্তর বছরের পর থেকে। আগের দশকগুলোয় এই ক্ষয় রোধ সম্ভব হলেও বা এর প্রভাব থেকে বাঁচা গেলেও সত্তরের পর থেকে এর প্রভাব পড়ে ভীষণভাবে। তখন থেকেই মস্তিষ্কের সক্ষমতা কমতে থাকে তুলনামূলক দ্রুত গতিতে। এ কারণেই দেশে দেশে ৬৫ বছরকে অবসরের বয়সসীমা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর নিউরোপলিটিকস বিভাগের পরিচালক মার্ক ফিশার বিবিসিকে বলেন, ৬৫ বছরের পর থেকে মানুষের মস্তিষ্কের সক্ষমতা কমার প্রভাব তার কাজে পড়তে থাকে। এ কারণে ৬৫ বছর পর্যন্ত বয়সকে নির্বাহী কাজের জন্য গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করা যায়।
কিছু দেশে অবশ্য অবসরের বয়সসীমা ৬০ বছর ধরা হয়। এটি অবশ্য দেশে দেশে আলাদা। কারণ, এর সাথে ওই সব দেশের মানুষের গড় আয়ু জড়িত। পাশাপাশি বেকারত্বের হার, স্বাস্থ্যসেবার মান ইত্যাদি অনেক বিষয়ও এর সাথে সম্পৃক্ত। সে ভিন্ন আলোচনা।
আমেরিকায় জো বাইডেনের বয়স নিয়ে যে হল্লা হচ্ছে এবং যা সময়ের সাথে বিশেষত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষণ এগিয়ে আসার সাথে সাথে বাড়তে থাকবে, তাতে আর সন্দেহ নেই। বাইডেন প্রশাসন ও তাঁর দল বিষয়টি কীভাবে মোকাবিলা করে, তা দেখার বিষয়। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানদের বয়স নিয়ে যে আলোচনা উঠে গেল এই অজুহাতে, তা কিন্তু দিন দিন শক্ত ভিত পাচ্ছে। আমেরিকা, ব্রিটেন থেকে শুরু করে পশ্চিমা বহু দেশের জনপরিসরে এখন মৃদুভাবে হলেও দাবি উঠছে যে, যদি নেতার ন্যুনতম বয়স ঠিক করা যায়, তবে একটা উচ্চসীমাও নির্ধারণ করা জরুরি। কারণ, না হলে বয়সী নেতার খেয়াল-খুশির ফাঁদে পড়তে পারে দেশ। শেষ পর্যন্ত এই দাবির পালে হাওয়া লাগে কিনা, নাকি অন্য অজস্র দাবির মতো এও তলিয়ে যায়, তা দেখতে ও বুঝতে অপেক্ষা করতে হবে বহু দিন। সে পর্যন্ত এ কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া অবান্তর হবে না যে, বয়সে কিন্তু অভিজ্ঞতাও হয়। আর নেতৃত্বে অভিজ্ঞতার মূল্য কে অস্বীকার করবে?
ফজলুল কবির: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন