হামাস না ইসরায়েল–সমর্থন করার আগে একটু ভাবুন

একদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শত শত মানুষ মরে যাচ্ছে আচমকা গোলায়। আধমরাদেরও যেন নিকেশ করার চিন্তা! আর অন্যদিকে ঘরে ঘরে ঢুকে প্রাণ বাঁচাতে লুকিয়ে থাকা মানুষগুলোকেও টেনে-হিঁচড়ে দাঁড় করানো হচ্ছে বন্দুকের নলের মুখে। টেবিলের নিচে লুকালেও গুলি করে মারা হচ্ছে খুঁজে খুঁজে। ভৌগোলিক হিসাব করলে এক সীমানার এপার আর ওপারে এভাবেই হত্যা করা হচ্ছে নিরীহ মানুষকে। শিশু, বৃদ্ধ, নারী- কেউ বাদ পড়ছে না গুলি ও গোলার শিকার হওয়া থেকে। দুই পক্ষেই থরে থরে লাশ পড়ে থাকছে নিথর হয়ে। আর আমরা যারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছি, তারাও হিসাব কষছি কোন লাশটা ফিলিস্তিনিদের বা কোনটা ইহুদিদের!

এই লাশ চিহ্নিতকরণের মধ্য দিয়ে আমরা কি উল্লসিতও হচ্ছি? কেউ আনন্দ প্রকাশ করছি হামাসের স্কোরবোর্ডে মানুষ শিকারের সংখ্যা বাড়লে। আবার কারও মনের প্রতিহিংসা পূর্ণতা পাচ্ছে ইসরায়েলের হামলায় নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ব্যথাতুর মুখ দেখলে। এই দুই পক্ষেই যারা আছেন, তারা কি কখনো ভেবে দেখেছেন যে – আপনাদের নৈতিক অবস্থান ঠিক থাকছে কিনা? এক মানুষ আরেক মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করলেও কি মানবতার জয় হয় বা হবে?

নৈতিক অবস্থানের এই বিরোধপূর্ণ আচরণ এখন বিশ্বজুড়ে। আমেরিকার কথাই ধরা যাক। সাধারণত আমেরিকাকে ইসরায়েলের প্রতি ব্যাপক সহানুভূতিশীল হিসেবেই গণ্য করা হয়ে থাকে। গত ৭ অক্টোবর হামাসের সদস্যরা সীমান্ত অতিক্রম করে ইসরায়েলের ভেতরে ঢুকে হত্যা ও অপহরণের মতো কর্মকাণ্ড চালানোর পর থেকেই আমেরিকার সরকার শর্তহীনভাবে ইসরায়েলের পাশে আছে। সেখানে ইসরায়েলের সমর্থনে বিক্ষোভ-সমাবেশ হচ্ছে। কোনো কোনো উগ্রপন্থী সংগঠন সরাসরি ইসরায়েলের পাল্টা হামলার গুণ-কীর্তন করছে। পশ্চিমা দেশগুলোর অনেকগুলোতেই ইসরায়েলের হামলায় সাধারণ ফিলিস্তিনিদের ভোগান্তি ও হতাহত হওয়ার বিষয়টিকে একটি পক্ষ সরাসরি সমর্থন করছে। ফিলিস্তিনকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যেন মস্ত বড় পুণ্যের কাজ! ফিলিস্তিনের হাজার হাজার শিশুকে একটি নারকীয় শৈশব উপহার দেওয়া কি ন্যায়ের উদাহরণ? নৈতিকতার উদাহরণ?

ওপরের এই পরিস্থিতি যেমন সত্য, তেমনি এর উল্টোটাও বিশ্বে প্রবলভাবে বিরাজমান। হামাসের নির্বিচারে ইসরায়েলের নাগরিক হত্যার পক্ষে আমেরিকার বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের একটি অংশ প্রকাশ্যে আনন্দ প্রকাশ করেছে।

হামাসের সদস্যদের বাড়ি বাড়ি ঢুকে হত্যাযজ্ঞ চালানোর বিষয়টিকে উদ্যাপন করা হয়েছে ‘ডিকলোনাইজেশন’ নামে। একে দেখা হয়েছে হামাসের ‘সাফল্য’ হিসেবে এবং খোদ নিউইয়র্কে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টদের একটি বড় অংশ মিছিল করেছে হামাসের এই সাফল্য উদ্যাপনের জন্য। আবার পশ্চিমা দেশ সামগ্রিকভাবে হিসাবের বাইরে রেখে আমরা যদি নিজেদের দিকে, স্পষ্টভাবে বললে নিজেদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোর দিকে তাকাই, তবে মনে হবে যে - ইসরায়েলকে নিকেশ করতে পারলেই হয়তো বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে! এমনকি হামাস সদস্যদের অংশ নেওয়া হত্যাকাণ্ডের ভিডিওচিত্রও শেয়ার করা হয় ‘কৃতিত্ব’ হিসেবে, অন্যায়ের ‘জবাব’ দেওয়া হিসেবে।

আসলে ন্যায় কোনটি? এক হত্যার জবাবে আরও দশ হত্যা কি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে? যে কোনো কারণে যে কোনো ধরনের হত্যার পক্ষে যাওয়া কি জায়েজ হয়? আসলে হয় না। এক মানুষ যখন আরেক মানুষকে প্রতিপক্ষ ভেবে নিয়ে হত্যা করতে উদ্যত হয়, ঠিক তখনই মানবতার মৃত্যু হয়। হত্যার পক্ষ নিয়ে কখনোই নৈতিক হওয়া যায় না। অথচ হামাস-ইসরায়েল সংঘাতে সেই একই ভুল সবাই করে চলেছে দেদারসে। হত্যার পক্ষ নিয়েই বলা হচ্ছে সেটিই নৈতিক অবস্থান, নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নাকি ওইটাই! যদিও নৈতিকতার নিদান দেওয়া কোনো উৎসই কখনোই বলেনি, হত্যায় কল্যাণ হয়!

হামাসের হামলায় নিহত ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তার মরদেহ নিয়ে যাচ্ছেন সেনা সদস্যরা। ছবি: রয়টার্সতাই কোনো এক পক্ষের জীবনকেই শুধু পবিত্র হিসেবে ধরে নিলে কোনো দিনই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান হবে না। বরং এই সংকট দিনকে দিন আরও গভীর হবে। যেমনটা গত ৭৫ বছরে হয়েছে। হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাতে আমরা হয়তো বেছে নেওয়ার জন্য সাদা চোখে শুধু দুইটি পক্ষই দেখছি। হামাস ও ইসরায়েল সরকারের বর্তমান নেতৃত্ব – এ দুটোই কিন্তু শেষ পর্যন্ত খুনের দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াবে। সেই কাঠগড়া ইট-কাঠের তৈরি হোক, আর মনের।

তবে এই দুই পক্ষের বাইরেও কিন্তু আরেকটি পক্ষ আছে। সেটি হলো সাধারণ মানুষ। এই গোত্রটি ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল - দুই এলাকাতেই আছে। এরা ভালো মানুষ, দয়ালু মানুষ। আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল সমীকরণে এদের কিছু যায় আসে না। তাদের কাছে ইরান-লেবানন-হিজবুল্লা বা আমেরিকা-ইংল্যান্ড-ফ্রান্স-রাশিয়ার কোনো ধরনের প্রণোদনা বা উসকানির কোনো মূল্য নেই। তারা চান শুধু দুটো খেয়ে-পরে পরিবার-পরিজন নিয়ে এই সুন্দর ধরণীতে শ্বাস নিতে। কিন্তু তাদের জান লুটে নিয়েই চলে অন্য দুই পক্ষের স্বার্থ উদ্ধার। নিরীহ ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে, নিপীড়ন করে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তার নাম দিচ্ছে ‘কোলাটেরাল ড্যামেজ’। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হামাসের সদস্যদের ‘পশু’ আখ্যায়িত করে বন্ধ করে দিচ্ছেন গাজার পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের লাইন। একবারও ভাবছেন না, ‘পশুদের’ শিক্ষা দিতে প্রাণ যাচ্ছে ফিলিস্তিনি দেবশিশুদেরও। এর উল্টোদিকে ইসরায়েলি শিশুদের শিরশ্ছেদ করার দৃশ্যও তকমা পাচ্ছে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের। অথচ সেটিরও আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী নৃশংস সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের উপাধিই পাওয়ার কথা।

দুই পক্ষেরই অবশ্য নিজেদের কর্মকাণ্ডের বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তির অভাব নেই। এক পক্ষ বলে – ‘আমাদের আর কি করার আছে? কীভাবে আমরা নিপীড়নের জবাব দেব তাহলে?’ আর আরেক পক্ষ বলে, ‘নিরীহ মানুষদের হত্যার দায় আমাদের নয়। দায় তাদের স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে এনে হামলা চালানো সংগঠনের’।

হ্যাঁ, এটি ঠিক যে, ইসরায়েল সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে মস্ত ‘বড় শক্তি’ হয়ে ওঠার বিষয়টি ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। এবং সেই সূত্রে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অত্যাচার-নিপীড়ন। পশ্চিমা বিশ্বের অব্যাহত সমর্থনে যেভাবে অর্থে-বলে বেড়ে উঠেছে ইসরায়েলের চরম ডানপন্থী শক্তি, সেটি গাজা ও পশ্চিম তীরকে এক অর্থে উপনিবেশকরণের দিকেই নিয়ে গেছে। আবার এটিও সত্য যে, হামাস ইহুদিবিরোধী একটি উগ্রবাদী সংগঠন। জরিপ অনুযায়ী ফিলিস্তিনের প্রায় অর্ধেক জনগণ এই সংগঠনের সহিংস নীতিতে আস্থা রাখেন না। এবং সর্বোপরি নিরীহ বেসামরিক ফিলিস্তিনি জনগণের ঘাড়ে বন্দুক রেখে গুলি চালাতে হামাস বিন্দুমাত্র অস্বস্তিবোধ করে না। অথচ এই দুই পথে গা ভাসিয়েই বিভক্ত হচ্ছে সারা দুনিয়ার মানুষ!

যারা এখনও হামাস ও ইসরায়েল সংঘাতে কোনো এক পক্ষে মাথা কুটে মরেননি, তাদের কাছে অবশ্যই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো – ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের সাধারণ মানুষের একটু শান্তিতে হাসিমুখে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দেওয়া। এর জন্য ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান বাস্তবতায় একমাত্র তখনই পাশাপাশি থাকা দুই রাষ্ট্রের সকল সাধারণ নাগরিক পরিপূর্ণ সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে জীবন কাটাতে পারবেন। এর চেয়ে ভালো কোনো উপায়ও যদি খুঁজে পাওয়া যায়, তবে সেটিও অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে সেখানে অবশ্যই কোনো অংশের কোনো নাগরিকের আত্মসম্মানকে বেচে দেওয়া যাবে না, এক অংশের মানবতাকে শূলে চড়ানো যাবে না।
অথচ তা নিয়ে না ভেবে দুই পক্ষে ভাগ হয়ে আমরা করে চলেছি শুধুই ঘৃণার আবাদ। সেই চাষে বিদ্বেষ কাঁচামাল, আর জিঘাংসা হলো উৎপাদিত পণ্য। এরপর সাধারণ মানুষের রক্ত ছিটিয়ে চলে মৃত্যুর প্রতি আহূতি।

এর বদলে তৃতীয় পক্ষটির পাশে কি দাঁড়ানো যায় না? ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর ছোড়া বোমায় হাত হারানো ফিলিস্তিনি শিশুটির আকুল কান্নায় বাঁধ দেওয়া যায় না? হামাসের হাতে প্রাণ হারানো কোনো ইহুদির পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়া যায় না?

ওপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ইতিবাচক হয়, তবেই বুঝবেন আপনি সঠিক নৈতিক অবস্থানে আছেন। সেই অবস্থানে দাঁড়িয়ে জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে যেকোনো হত্যার প্রতিবাদ করা সম্ভব। এই অবস্থানই একমাত্র বিশ্ব মানবতার কথা বলে। আর যদি এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে মুখে আসে ‘যদি’ বা ‘কিন্তু’, তবে ধরে নিতে হবে বাদবাকি দুই পক্ষের একটিতেই হয়তো আমাদের বসতবাড়ি। সেক্ষেত্রে পোড়া লাশের গন্ধেও মন ভালো থাকবে, যদি তা বিপক্ষের হয়! 

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন