পশ্চিমা গণতান্ত্রিক কাঠামো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:০১ এএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে সদা সতর্ক করছে পশ্চিমা গণমাধ্যম ও থিংক ট্যাঙ্কগুলো। প্রাথমিক পর্যায়ের ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগ সরঞ্জামগুলো রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানের উন্নত অ্যালগরিদম ও ডেটা-চালিত ব্যবস্থাগুলো প্রায়শই বিপরীত কাজ করছে। মুক্ত আবহ তৈরির বদলে প্রভাবশালী অংশকে শক্তিশালী করছে।

আরেকটি সাধারণ আশঙ্কা হলো–এআই দিয়ে তৈরি লেখা, ছবি ও কণ্ঠস্বর জনমত ও নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারকারী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এই উদ্বেগগুলো যৌক্তিক। তবুও এসব উদ্বেগ আদতে আরও অস্বস্তিকর ও মৌলিক প্রশ্নকে আড়াল করার ঝুঁকি তৈরি করে। আর তা হলো–এআই থাকুক বা না থাকুক, পশ্চিমা ধাঁচের উদারনৈতিক গণতন্ত্রের কাঠামো কি এখনও তাদের নাগরিকদের জন্য সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সক্ষম?

গণতন্ত্র কখনও মানবজাতির একমাত্র বা সার্বজনীন নিখুঁত রাজনৈতিক মডেল ছিল না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাজতন্ত্র, সাম্রাজ্য, নগর-রাষ্ট্র বা রাজ্যপুঞ্জ বা নানা ধরনের সংঘ বিভিন্ন সমাজকে গঠন করেছে। আজকের বহুদলীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক কাঠামোর ব্যাপক প্রচলন হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। পশ্চিমা দেশগুলোতে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের প্রাধান্য মূলত শুরু হয় যুদ্ধোত্তর (বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তর) বাস্তবতায়, যা কেবল বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে নয়; বরং দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির কারণে বজায় ছিল।

গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে এআই। ছবি: এক্স থেকে নেওয়াতবে ২০০০-এর দশক থেকে ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য এবং কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণার পশ্চাদপসরণ এই ভিতকে দুর্বল করতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রে, সম্পদ বৈষম্যের ভয়াবহ দশাপ্রাপ্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ব্যয়ের উল্লম্ফন, ২০২০ সালের ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন এবং ২০২১ সালের ক্যাপিটল হিল দাঙ্গা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গভীর ফাটলকে সামনে নিয়ে আসে। ব্রিটেনে ২০১৬ সালে হওয়া ব্রেক্সিট গণভোট বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সূচনা করে। দেশটি তারপর থেকে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে।

ফ্রান্সে ২০১৮ সালে হওয়া হলুদ জ্যাকেট (ইয়োলো ভেস্ট) আন্দোলন বৈষম্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতির স্থবিরতাকে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। জরিপেও একই গল্প হাজির হয়। ১২টি উচ্চ-আয়ের দেশে পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, পশ্চিমা দেশগুলোতে গণতন্ত্র নিয়ে মানুষের সন্তুষ্টি ব্যাপকভাবে কমেছে। ২০২১ সালে যে সন্তোষের হার ছিল ৪৯ শতাংশ, তা চলতি বছর কমে ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দেশে দেশে ডান ও বাম উভয় ধারার জনতুষ্টিবাদী আন্দোলনগুলো জোরদার হয়েছে, যা সাধারণ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশারই পরিচায়ক।

বর্তমান ইউরোপ কাঠামোগত চাপের সম্মুখীন। এ চাপ তৈরি করছে অর্থনৈতিক সংকট, ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগোষ্ঠী এবং উদীয়মান শক্তিগুলোর কাছে প্রযুক্তিগত নেতৃত্বে পিছিয়ে পড়া। এ জনমিতিক ও অর্থনৈতিক সংকট পেনশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও টেকসই শ্রম বাজারের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এগুলো সমৃদ্ধি অর্জনকে আরও কঠিন করে তুলছে।

এ ক্ষেত্রে এশিয়ার সাথে ইউরোপ ও আমেরিকার বৈসাদৃশ্য চমকপ্রদ। ইউরোপ যখন রাজস্ব কৃচ্ছতানীতি নিয়ে ভাবছে, তখন চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও আসিয়ান জোটভুক্ত দেশগুলো ডিজিটাল অবকাঠামো, উৎপাদন ক্ষমতা ও শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। বিশ্বের অর্থনৈতিক কেন্দ্র ক্রমেই পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে। চাকরির বাজারে প্রবেশ করা তরুণ ইউরোপীয়রা তাদের পূর্বতনদের তুলনায় উচ্চতর জীবনযাত্রার মান উপভোগ করবেন–তেমন নিশ্চয়তা আর নেই।

বর্তমান ইউরোপ কাঠামোগত চাপের সম্মুখীন। ছবি: ফ্রিপিকের সৌজন্যেঅথচ এগুলোই পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতন্ত্রের বৈধতার ঐতিহাসিক ভিত্তি। এই প্রেক্ষাপটে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা অনুশীলিত শাসনপ্রণালী, যাকে ‘চীনা বৈশিষ্ট্যের সমাজতন্ত্র’ বা একদলীয় নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়–তা বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ করছে।

গত চার দশক ধরে চীন কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছে এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। এটি একটি মেধাভিত্তিক কাঠামোর ওপর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সামষ্টিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

চীন একা কিন্তু এই বিকল্প শাসন কাঠামো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে না। গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন পরিকল্পনার শঙ্কর মডেল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা সিঙ্গাপুর এশীয় উপযোগবাদের বড় উদাহরণ হয়ে আছে। অন্যদিকে, ভারত একটি ভিন্ন গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা উপস্থাপন করে–যা জটিল ও বিতর্কিত। তবে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমানভাবে আত্মবিশ্বাসী। এই বৈচিত্র্যগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রাজনৈতিক বৈধতার জন্য কোনো একক পথ নেই।

‘চীনা বৈশিষ্ট্যের সমাজতন্ত্র কী
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্বের সর্বত্র সমাজকে রূপান্তরিত করবে। শ্রম বাজার, তথ্যের দুনিয়া ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব হবে গভীর। তবে পশ্চিমের জন্য চূড়ান্ত প্রশ্নটি কেবল এআই কীভাবে গণতন্ত্রকে পুনর্গঠন করবে, তা নয়। বরং উদারনৈতিক গণতন্ত্রগুলো তাদের জমিনে সমৃদ্ধি আনতে না পারলে অন্যদের আর অনুপ্রাণিত করতে পারবে কিনা, সেটিই বড় প্রশ্ন।

যদি গণতন্ত্র জীবনযাত্রার মান উন্নত করার সক্ষমতা হারায়, তাহলে ক্ষমতার ভারাসম্য রক্ষার নীতি বা বাকস্বাধীনতার অধিকার ইত্যাদি আর রাজনৈতিক বৈধতা বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। যুদ্ধোত্তর ব্যবস্থা একটি দ্বৈত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল: রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি। এর একটি দুর্বল হলে অন্যটিকে রক্ষা করা কঠিন। এশীয়দের জন্য এই বিতর্কগুলো বিমূর্ত নয়।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি গড়ে তুলেছে চীন।  ছবি: ফ্রিপিকের সৌজন্যেপশ্চিমা গণতন্ত্রের চনচনে ভাব বৈশ্বিক বাজার, জোট ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে। তবে বিশ্বের রাজনৈতিক বিবর্তনকে ‘পশ্চিমা গণতন্ত্র’ ও ‘চীনা সমাজতন্ত্র’-এর মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখাটা ভুল।

বরং, আমরা একটি অধিক বহুমেরুর যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছি, যেখানে বিচিত্র শাসনকাঠামো একসাথে সহাবস্থান করে, প্রতিযোগিতা করে এবং এমনকি একে অপরের কাছ থেকে শেখে। এশীয় রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়ে আসছে যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, নির্বাচনী প্রতিনিধিত্ব ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নানা সমন্বয় বৈধ ও স্থিতিশীল ফলাফল উৎপাদন করতে পারে।

সুতরাং পশ্চিমের জন্য চ্যালেঞ্জটি কেবল এআই নিয়ন্ত্রণ বা নির্বাচন পরিচালনা করা নয়, বরং প্রমাণ করা যে গণতন্ত্র তার নাগরিকদের জন্য সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা এবং আশা উৎপাদন করতে পারে। যদি তা না পারে, তাহলে তার বৈশ্বিক আবেদন কমতে থাকবে। এ ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে সে কত চৌকষভাবে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, সে বিবেচনা একেবারেই অবান্তর।

পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো এআই-এর চেয়েও অনেক বড় একটি পরীক্ষার মুখোমুখি আজ। এর মূলে আছে বস্তুগত ও সামাজিক ভিত্তির ক্ষয়, যা এই ব্যবস্থাকে বৈধতা দিয়েছিল। অসমতা মোকাবিলা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ এবং সুফল প্রদানের সক্ষমতা প্রদর্শন যেকোনো অ্যালগরিদমের চেয়ে অনেক বেশি নির্ধারক ভূমিকা নেবে।

ইতিহাস বলছে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা কখনও স্থির নয়। এসব ব্যবস্থা বিকশিত হয়, প্রভাবিত করে এবং অভিযোজিত হয়। আমাদের সময়ের প্রশ্নটি এই নয় যে, একটি মডেল বৈশ্বিকভাবে বিজয়ী হবে কিনা, বরং প্রতিটি সমাজ স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির মধ্যে একটি ভারসাম্য খুঁজে পাবে কিনা কেবলমাত্র এই মৌলিক প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করার মাধ্যমেই গণতন্ত্র–বস্তুত, সকল রাজনৈতিক ব্যবস্থাই বিশ্বাসযোগ্য থাকতে পারে।

লেখক: তুরস্কের সাবেক কূটনীতিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

[লেখাটি সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করা হয়েছে]

চীনের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ–সম্পৃক্ততা নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সীমা ছাড়িয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সফর ছিল...
​সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক এবং পরবর্তী ঘোষণা অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও...
নেপালসহ দেশে দেশে সরকার পতন ও এরপরের ‘খিচুড়ি’ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিতে সেসব অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো না হয় ‘ডাল’ আর ‘চাল’-এর ভূমিকা নিয়েছে। আগুন হিসেবে কাজ করেছে জেন জি-র ক্ষোভ। কিন্তু খিচুড়ি রান্নার...
‘বিপ্লব, নাকি করপোরেট শক্তির খেল’–প্রশ্নটা আজ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির সামনে এক বিরাট ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চার বছরের মধ্যে ভারতের তিন প্রতিবেশী দেশ–শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপাল–গণআন্দোলনের জেরে...
রাজধানীর ভাটারার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দ্রুতগামী অজ্ঞাত এক গাড়ির ধাক্কায় সেকান্দার আলী নামে এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।
খাবার আর ওষুধসহ নানা খাতে ব্যয় বৃদ্ধিতে বিপাকে বগুড়ার মুরগির খামার ও হ্যাচারি ব্যবসায়ীরা। জেলার ৫ হাজারেরও বেশি খামার ও হ্যাচারি মধ্যে, গত ৩ বছরে বন্ধ হয়ে গেছে সাড়ে ৪ হাজার প্রতিষ্ঠান। এতে বেকার...
১১ কর্মকর্তার দায়িত্ব একজনের হাতে!
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পাশাপাশি ১১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। অফিসের করণিক,...
খাগড়াছড়িতে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। জেলার এলজিইডি নিয়ন্ত্রণাধীন ২৮টি সড়কের ২১ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহালছড়ির মুবাছড়ি ও পানছড়ির নালকাটায়...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর