প্রশ্ন: হামাসের হামলা ইসরায়েলের পক্ষে একটি গোয়েন্দা ব্যর্থতা ছিল?
ফারহাং জাহানপুর: স্পষ্টতই এটি বড় ধরনের গোয়েন্দা ব্যর্থতা। ইসরায়েলিরা বিশ্বকে বিশ্বাস করাতে চেয়েছিল যে, তাদের কাছে সবচেয়ে দক্ষ গোয়েন্দা ব্যবস্থা আছে এবং তারা অজেয়। হামাসের আক্রমণ এই দুই অনুমানকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। এসব ঘটেছে নেতানিয়াহুর অধীনে, যিনি ফিলিস্তিনিদের কাছে পৌঁছানোর এবং তাদের অন্ততপক্ষে স্বাধীনতা ও মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করার পরিবর্তে পশ্চিম তীরে আরও অবৈধ বসতি নির্মাণ চালিয়ে গেছেন এবং খোলাখুলিভাবে পুরো এলাকেকে গিলে খাওয়ার কথা বলেছেন। সর্বশেষ উদাহরণ হলো, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তাঁর অসম্মানজনক বক্তৃতা। তিনি বলেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের পারমাণবিক হুমকি থাকা উচিত। এ সময় তিনি সমগ্র গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর ও গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে ইসরায়েলের একটি মানচিত্র দেখান। বোঝাই যায়, এভাবেই পুরো ফিলিস্তিনকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হবে। সাম্প্রতিক মর্মান্তিক ঘটনাগুলো এবং এর ফলে যদি মধ্যপ্রাচ্যের বাকি অংশে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সবকিছুর জন্য তিনিই প্রধানত দায়ী থাকবেন।
প্রশ্ন: সৌদি-ইসরায়েল চুক্তি এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডের ভবিষ্যতের ওপর এ ঘটনা কী প্রভাব ফেলবে?
ফারহাং জাহানপুর: তথাকথিত আব্রাহাম অ্যাকর্ড ফিলিস্তিনিদের পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কিছু আরব শাসককে ঘুষ দেওয়ার মতো একটি নিষ্ঠুর ও অবৈধ পদক্ষেপ। আমেরিকানরা সুদানকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। তবে আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছিলেন, সুদান সরকার ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলে তাঁরা সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের ঘোষণা তুলে নেবেন।
পশ্চিম সাহারার মালিকানা নিয়ে মরোক্কো ও আলজেরিয়া সমর্থিত পলিসারিও ফ্রন্টের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। উভয় পক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি জাতিসংঘকে নিষ্পত্তি করতে হবে। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলে ট্রাম্প একতরফা ও অবৈধভাবে সাহারাকে মরক্কোকে উপহার দেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পারস্য উপসাগরীয় এলাকার কিছু দেশের সাথে ইসরায়েলের গোপন সম্পর্ক রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এফ–৩৫ যুদ্ধবিমানসহ বেশ কিছু অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র কিনতে চেয়েছিল। তাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, তারা ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলে ওগুলো কিনতে পারবে। এটি করার পরও আমেরিকা বিক্রি করতে পারেনি। কারণ মার্কিন কংগ্রেস এই অত্যাধুনিক অস্ত্র বিক্রির বিরোধিতা করেছিল।
তারপর সৌদি আরবের পালা। ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়ে দেশটি। কিন্তু সৌদি আরবের কিছু কঠিন শর্ত ছিল। যার মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলকে ফিলিস্তিন এলাকায় দুই-রাষ্ট্র সমাধান মানতে হবে ও অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র বিক্রির নিশ্চয়তা দিতে হবে। এ ছাড়া ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মতো সৌদি আরবের জন্য মার্কিন সমর্থন এবং পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সহায়তার দাবি ছিল। এগুলো ছিল কঠিন দাবি, যার সাথে ইসরায়েল ও কংগ্রেস একমত হবে না। কিন্তু এখন সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে সেসব চুক্তি এখন বিশবাঁও জলে।
অবশ্যই, ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে প্রকৃত শান্তিকে সবসময় স্বাগত জানাব। তবে যদি তা উভয় পক্ষের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে নিয়ে আসে এবং তা কোনোমতেই ফিলিস্তিনিদের অধিকার ক্ষুণ্ন করার বিনিময়ে নয়।
প্রশ্ন: আপনার মতে হিজবুল্লাহ, কাতার ও ইরানের ভূমিকা কী?
ফারহাং জাহানপুর: বহু বছর ধরে নেতানিয়াহু আমেরিকাকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর জন্য অত্যন্ত কঠোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঠিক যেভাবে তিনি ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের আগে সফলভাবে কাজটি করেছিলেন। ট্রাম্প প্রায় মানার কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। বন্ধুদের কাছে দেখানো কিছু গোপন নথি তারই সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বাইডেন সেই পরিকল্পনা অনুসরণ করতে অস্বীকার করেন। যদিও তিনি ইরানের ওপর ট্রাম্পের অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেননি এবং নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ইরান পারমাণবিক চুক্তিতে (জেসিপিওএ) ফিরে আসেন। যেমনটা তিনি ট্রাম্পের অন্যান্য প্রায় সব চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে করেছিলেন। তবুও তিনি ইরানের সাথে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি একটি বন্দী বিনিময়ের ব্যবস্থা করেন। ইরান ইরানি-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিকদের মুক্তি দেয়। বিনিময়ে কিছু দ্বৈত নাগরিকের মুক্তির ব্যবস্থা করে ওয়াশিংটন, যারা ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে আমেরিকায় বন্দী ছিল।
বাইডেন ইরানের কিছু অবৈধভাবে আটকে রাখা তহবিল ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। শর্ত ছিল— এ জন্য ইরানকে তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৬০ শতাংশের কম রাখতে হবে। ইরানের অর্থ কাতারের একটি ব্যাংকে স্থানান্তরিত হয়েছে। তবে মার্কিন কংগ্রেস এই বিনিময় ব্যবস্থাটি প্রত্যাখ্যান করছে এবং কাতারকে এই তহবিল ইরানের হাতে না তুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। যা হোক, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নেতানিয়াহুকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দেন–দরবার করার আরেকটি সুযোগ দিয়েছে। যদিও পেন্টাগন ও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—উভয়ই বলেছে যে, তারা ইসরায়েলে হামাসের অনুপ্রবেশে ইরানের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পায়নি। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী ইরানও ইসরায়েলে হামাসের অনুপ্রবেশে বিস্মিত হয়েছিল।
হামাস একটি কট্টরপন্থী সুন্নি আন্দোলন, যা তুরস্ক, মিশর, কাতার ও উপসাগরীয় অন্যান্য দেশ থেকে প্রাথমিকভাবে বেশি সাহায্য পেয়েছে। কিন্তু এটা গোপন নয় যে, ইরানও আর্থিক এবং সম্ভবত সামরিক সহায়তা দিয়ে সাহায্য করেছে। তবে হামাস ও হিজবুল্লাহ স্বাধীন সংগঠন এবং তারা ইরানের আদেশে চলে না। সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানকে জড়ানোর চেষ্টা হলো মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধে আমেরিকাকে টেনে আনার জন্য নেতানিয়াহু ও তাঁর মার্কিন সমর্থকদের একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ। তারা ইরান পর্যন্ত যুদ্ধের প্রসার ঘটাতে সফল হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বলবে।
প্রশ্ন: কীভাবে এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান স্থিতাবস্থাকে পরিবর্তন করবে?
ফারহাং জাহানপুর: ভবিষ্যৎ কী হবে তা অনুমান করা কঠিন। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়েছে। বিভিন্ন দেশের অনেক মানুষ গাজায় ইসরায়েলের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। আম্মানে ফিলিস্তিনিদের সাহায্যের জন্য সীমান্তের দিকে অগ্রসর হওয়া বিশাল জনতাকে থামাতে নিরাপত্তা বাহিনীকে টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করতে হয়েছে। গত শুক্রবার নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ বৈঠকের পর থেকে, সৌদি আরবসহ আরও অনেক আরব দেশ গাজায় বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার নিন্দা করেছে। ইসরায়েল যদি গাজায় তার স্থল আক্রমণ শুরু করে এবং ২৩ লাখের বেশি গাজাবাসীকে দক্ষিণে বা মিশরে স্থানান্তরের পরিকল্পনায় এগিয়ে যায়, তবে অনেক মুসলিম দেশে ফিলিস্তিনিদের জন্য আরও বেশি সমর্থন থাকবে।
ইতিবাচক দিক থেকে, পশ্চিমা নেতাদের যদি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করার কোনো অভিপ্রায় থাকে, তাহলে তারা এই ভয়ানক ট্র্যাজেডিটি ব্যবহার করে ইসরায়েলকে তার ৫৬ বছরের নিষ্ঠুর দখলদারত্বের অবসান ঘটাতে বাধ্য করবে। যদিও দুঃখজনকভাবে এই মুহূর্তে তার কোনো লক্ষণ নেই। এ ছাড়া ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলো এবং দুই-দেশ সমাধানের জন্য জাতিসংঘের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা, অথবা বর্তমান সমস্ত বর্ণবাদী নীতি তুলে নিয়ে ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি একক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পথে এগোনোর কোনো লক্ষণ নেই।
সর্বোপরি, বহু শতাব্দী ধরে ইহুদি ও আরবরা ফিলিস্তিনে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণভাবে একসাথে বাস করে এসেছে। এটি আবার হতে পারে না এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।
(ফারহাং জাহানপুর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওরিয়েন্টাল স্টাডিজে পিএইচডি করেন। সেখানে তিনি পাঁচ বছর শিক্ষকতাও করেন। ইরানি বংশোদ্ভূত এই সাবেক অধ্যাপক ইসফাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি ভাষা অনুষদের ডিন এবং হার্ভার্ডের একজন সিনিয়র ফুলব্রাইট রিসার্চ স্কলার। মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি বিবিসি মনিটরিং-এ ২০ বছর কাজ করেছেন। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে পড়াচ্ছেন।)
ইন্ডিয়া ন্যারেটিভের সৌজন্যে