ভারতের চারটি রাজ্যে প্রায় দেড় মাসব্যাপী নির্বাচন শেষ হয়েছে আজ রোববার (৩ ডিসেম্বর) ভোটের ফল প্রকাশের মধ্য দিয়ে। রোববার ভারতে সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে সবই প্রায় বন্ধ থাকে। লোকজন সাধারণত বাড়িতেই থাকে। ভারতের টিভি চ্যানেলগুলো এই ভোটের ফলাফলকে এতটাই আকর্ষণীয় পন্থায় দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করে যে, না দেখে উপায় থাকে না। টি-টোয়েন্টি ম্যাচের চেয়েও আকর্ষণীয়। আমরা যারা এই উপমহাদেশের রাজনীতি থেকে গা বাঁচিয়ে চলা মধ্যবিত্ত, তাদের জন্য ছুটির দিনে আরামকেদারায় শরীর এলিয়ে ভোটের ফল নিয়ে বিতর্কের মতো মুখরোচক কিছু এখনো আসেনি। অন্তত আমি তেমনটাই মনে করি। ভারতে টিভি চ্যানেলে এই আলোচনার গুরু অবশ্যই প্রণয় রায়। এই ‘বরিশাইল্যা বাঙাল’ একে যে শিল্পরূপ দান করেছেন, তা–ই ভাঙিয়ে খাচ্ছে অন্যরা। এত কথা বলার উদ্দেশ্য একটাই, আজকের ভোট বিশ্লেষণে এনডিটিভিতে প্রণয় রায়, দোরাব আর সুপারিওয়ালা, যোগেন্দ্র যাদব– এঁদের খুব মিস করেছি।
আর যে চার রাজ্য—রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও তেলেঙ্গানায় ভোটের ফল প্রকাশিত হয়েছে, সেটাকে বেশ কিছুদিন ধরে সেমিফাইনাল বলে প্রচার করছিল ভারতীয় গণমাধ্যম। বিষয়টা এমনই, এখানে যারা (বিজেপি বা কংগ্রেস) ভালো করবে, তারা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে যাবে। জয়ের আশাবাদটা কংগ্রেসের দিক থেকেই বেশি ছিল। দলের নেতা রাহুল গান্ধীও বলে ফেললেন, চার রাজ্যেই কংগ্রেস জিতবে। খুব বেশি হলে রাজস্থানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। গতকাল ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত কংগ্রেসের নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমানে এই প্রচার চালিয়ে গেছেন। কিন্তু ‘…মূর্তি ভাবে আমি দেব—হাসে অন্তর্যামী’– এই কথাটা ওই নেতারা বোধ হয় কখনো শোনেননি।
যে কারণে সকাল থেকে ফল প্রকাশের সাথে সাথে তাদের সবার মুখ শুকিয়ে চুন হয়ে গেছে। তবুও যতক্ষণ ২-২ চলছিল; অর্থাৎ, বিজেপি মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানে এবং কংগ্রেস তেলেঙ্গানা ও ছত্তিশগড়ে এগিয়ে, তখনো কিছুটা আশা ছিল। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ছত্তিশগড়ে এগিয়ে যেতে থাকে বিজেপি। শেষমেশ কংগ্রেসের জন্য তেলেঙ্গানা ছাড়া আর কিছুই রইল না। দিন শেষে বিজেপি ৩–১ কংগ্রেস। স্কোরকার্ড দেখে কী বলবেন একে? ইনকামবেন্সি বা ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনমত প্রবল থাকায় কংগ্রেস রাজস্থান ও ছত্তিশগড় হারাল। কিন্তু ১৮ বছর ক্ষমতায় থাকার পর মধ্যপ্রদেশে বিজেপির ভোট ও আসন দুই–ই বেড়েছে। অথচ উল্টোটাই হওয়া দস্তুর ছিল। তেলেঙ্গানায়ও গরিষ্ঠতা এমন সূক্ষ্ম সুতোর ওপর দাঁড়িয়ে যে, কংগ্রেস কতদিন সেখানে সরকার টিকিয়ে রাখতে পারবে, তাতে সন্দেহ আছে।
আসলে এমনটা হলো কেন? জয়ের ব্যাপারে কংগ্রেসের নেতারা এতটা আত্মবিশ্বাসী হলেনই–বা কীভাবে? ইন্ডিয়া জোট করার পর? নাকি কর্ণাটকে বিজেপিকে গো হারা হারানোর পর? তাহলে কংগ্রেস নেতাদের প্রজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন তুললে কি কেউ কিছু মনে করবেন? মনে হয় না।
আসুন, চার রাজ্যে ভোটের চিত্রটা দেখা যাক। মধ্যপ্রদেশ (বিজেপি ছিল ক্ষমতায়): বিজেপির ভোট ভাগ বেড়েছে ৯%, কিন্তু কংগ্রেসের কমেছে ০.৫% । রাজস্থান (কংগ্রেস ছিল ক্ষমতায়): কংগ্রেসের ভোট একই রয়ে গেছে। তবে বিজেপির বেড়েছে ৩.৫%। ছত্তিশগড় (কংগ্রেস ছিল ক্ষমতায়): বিজেপির ভোট বেড়েছে ১৩%, পাশাপাশি কংগ্রেসের কমেছে ০.৪%। তেলেঙ্গানা (আইআরএস ছিল ক্ষমতায়): কংগ্রেসের ভোট বেড়েছে ১১.৪%। বিজেপিরও বেড়েছে ৮.৫%। অর্থাৎ, চার রাজ্যেই বিজেপির ভোট বেড়েছে। অন্যদিকে তিনটি রাজ্যে ভোট হারিয়েছে কংগ্রেস। ১৩৮ বছরের পুরোনো একটি দলের নেতারা এই হিসাবটা অনুমানই করতে পারলেন না! উল্টো ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকলেন।
এর বাইরেও কংগ্রেসের ব্যর্থতার আরও অনেক কারণ আলোচনায় আছে। যেমন কেন্দ্রীয়ভাবে কংগ্রেস অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু রাজ্যের প্রধান নেতা তা মানেননি। মধ্যপ্রদেশের যে কমলনাথকে কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ভেবেছিল, তিনি এমন একজন টিভি অ্যাংকরকে ফ্লাইটে বসে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, যাঁকে আগেই ইন্ডিয়া জোট বয়কট করেছিল। রাজস্থানে অশোক গেহলট ও শচীন পাইলটের সমস্যা মেটাতে পারেনি কংগ্রেস। বরং প্রচারের সাথে সাথে দুই বড় নেতার মতপার্থক্যও প্রকট হয়েছে। একই অবস্থা ছত্তিশগড়ে। অন্যদিকে বিজেপির একক নেতৃত্বে শুধুই নরেন্দ্র মোদি। এর বাইরে কোনো মুখকেই তারা প্রচারের আলোয় আনেনি। এমনকি মধ্যপ্রদেশে দলের বিপুল জয়ের যে কারিগর শিবরাজ সিং চৌহান, তাঁকেও না। এ নিয়ে দলের মধ্যে টানাপোড়েন থাকলেও তা পাত্তা দেয়নি বিজেপি।
মধ্যপ্রদেশে কমলনাথকে দলের প্রধান মুখ করা যদি কংগ্রেসের বড় ভুল হয়, তাহলে এর বাইরে আছে দলের নরম হিন্দুত্ব নীতি, অনুপযুক্ত টিকিট বিতরণ, উৎসাহের অভাব, অত্যধিক আত্মবিশ্বাস। কমলনাথ ও কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব হয়তো ভেবেছিলেন—গতবার তাঁদের দলকে জোর করে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য রাজ্যের মানুষ বিজেপিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। কিন্তু ভোটের ফল প্রমাণ করে যারা ক্ষমতা পাওয়ার পরও ধরে রাখতে পারে না, তাদের ভোট দিয়ে লাভ নেই—রাজ্যের মানুষ এমনটাই ভেবেছে। ছত্তিশগড়ে বাঘেলাও হিন্দুত্বের লাইন নিয়ে টেনে উঠতে পারলেন না। পারবেন কীভাবে, আরএসএস-বিজেপির সাম্প্রদায়িক অ্যাজেন্ডা যে তাঁর চেয়ে অনেক শক্তিশালী ও কার্যকরী।
বিহারে জনগণনার সময় জাতিশুমারি বিষয়টি সামনে আনেন নীতিশ কুমার। বিজেপির ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্বকে রুখতে পাল্টা ব্যবস্থা ছিল এটা। যাতে প্রমাণিত হয়, ভারতে ব্রাহ্মণ্যবাদীরাই সবার চেয়ে সংখ্যালঘু। কংগ্রেস এই জাতিশুমারির বিষয়টি জনসাধারণের কাছে ঠিকমতো মার্কেটিং বা বিপণন করতে পারেনি। এর জন্য যে প্রস্তুতি, গবেষণা ও প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন, তার কিছুই ছিল না। ছিল শুধু অনুমোদন।
অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইন্ডিয়া জোট হলো। কিন্তু জোট যাদের চিরকালের অপছন্দ, তারা এটাকে সফল করবে কীভাবে? শরিক ও সমমনা দলগুলোকে তো মর্যাদা দিতে হবে। কংগ্রেস ভারতে সর্বশেষ একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হয়েছিল ১৯৮৪ সালে, তা-ও ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর ভাবাবেগের জোয়ারে ভেসে, আর শিখ-বিদ্বেষে ভর করে। কিন্তু ৪০ বছরেও তারা সেটা ভুলতে পারেনি। এমনকি দলে একাধিক ভাঙনের পরও। অখিলেশ যাদবকে যেভাবে মধ্যপ্রদেশে আসন নিয়ে হেনস্তা হতে হয়েছে, তাতে ইন্ডিয়া জোট নিয়ে প্রশ্ন তুললে অন্তত কংগ্রেসের কোনো জবাব দেওয়ার থাকবে না।
সর্বোপরি দলের শীর্ষ নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে, না সোনিয়া–রাহুল–প্রিয়াঙ্কা—এই নিয়ে কিন্তু ধোঁয়াশা দূর হয়নি। হারের পর খাড়গের করা টুইটে এক কংগ্রেস সমর্থক লিখেছেন, ‘আপনাদের ধারেকাছে তো পৌঁছানোই যায় না। ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পরও যদি কংগ্রেস নেতারা এখনো এই অবস্থায় থাকেন তাহলে তাঁরা কবে শিক্ষা নেবেন?’
চার রাজ্যের ফলাফলের আভাস পাওয়ার সাথে সাথে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক ডেকেছেন মল্লিকার্জুন খাড়গে। ৬ ডিসেম্বর বৈঠক। দিনটি বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দিন। ফলে দিনটার একটা গুরুত্ব আছে। রাহুল গান্ধী ভোটারদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নতুন করে লড়াই শুরুর কথা বলেছেন। দুই নেতা কি এই ফলাফল থেকে এটা বুঝতে পেরেছেন যে, ইন্ডিয়া জোটের রাজনীতিতে কংগ্রেসের দাদাগিরি চলবে না। তাদের এখন শরিকদের কয়েক ছটাক জায়গা ছাড়লে চলবে না, বিঘার পর বিঘা জমি ছাড়ার মানসিকতা থাকতে হবে। যদি আসলেই তাঁরা ২০২৪-এ ৫৬ ইঞ্চির নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে লড়তে চান।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন