দেখতে দেখতে ২০২৩ শেষের পথে। ২০২৪ সাল সমাগত, আর মাত্র কয়েকটি দিনের অপেক্ষা। আগামী বছরটা কেমন যাবে, এ নিয়ে চিন্তার শেষ নেই। অথচ চিন্তা করে যে বিশেষ কোনো ফল লাভ হবে, তার সম্ভবনাও কম। আমাদের মতো যারা সংবাদমাধ্যমের সাথে জড়িত, তাদের কাছে এর ভবিষ্যৎ চিন্তা শুধু রুটি-রুজির জন্য নয়। তারচেয়েও বড়—দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম না থাকলে আসলে দুনিয়াটা কেমন হবে, সেটা। সবাই এ ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসনের পরিচিত সেই উক্তিটি টানবেন–‘আমাকে যদি সংবাদপত্র ছাড়া সরকার বা সরকার ছাড়া সংবাদপত্র– দুটোর মধ্যে একটাকে বেছে নিতে বলা হয়, তবে আমি দ্বিতীয়টিকে বেছে নেব।’
এই বছরটা আসলে অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমের জন্য খুব ভালো যায়নি। প্রচলিত সংবাদপত্র বা টেলিভিশন অনেক দিন ধরেই ভীষণভাবে অনলাইননির্ভর। তাদের আয়ের একটা বড় অংশই আসছে এখান থেকে। আর সেখানেই ধাক্কাটা লেগেছে জোরসে। দুনিয়াজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলো অনলাইনে ফেসবুক বা এক্স (সাবেক টুইটার)-এর মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং গুগল বা বিং-এর মতো সার্চ ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই দুই মাধ্যম উপহার হিসেবে সংবাদমাধ্যমকে এত পাঠক বা এত এত মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দিয়েছিল যে, সে নিজেই চলতে ভুলে গিয়ে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। আসলে ২০২৩-এ নিজেদের অ্যালগোরিদমে ব্যাপক পরিবর্তন এনে সংবাদমাধ্যমের এগিয়ে যাওয়ায় রাশ টানে ফেসবুক ও গুগল। ফলে এতদিন এই দুই মাধ্যমের ওপর নির্ভর করার ফল হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে সব সংবাদমাধ্যম।
গুগল তার ক্রোম ব্রাউজারে কুকি রিড করার বিষয়টি ২০২৪-এর জুন থেকে বন্ধ করে দেবে। এর আগেই নতুন বিভীষিকা হিসেবে এসেছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই। একে স্বাগত জানাবে না বর্জন করা হবে, সেটাই এখনো ঠিক করতে পারেনি সংবাদমাধ্যমগুলো। আর আয়ের খাতে ধাক্কা তো আছেই। বিশেষ করে করোনা থেকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, ধাক্কার শুরুটা সেখান থেকেই, সর্বশেষ সংযোজন ইসরায়েলের গাজা অভিযান।
মূলধারার সংবাদমাধ্যম এসব নিয়ে এমনিতে বিপদে আছে। এর সাথে যোগ হয়েছে তাদের পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টি। এই পছন্দ-অপছন্দ এতটাই প্রকট যে, পাঠকের একটা বড় অংশ প্রথমেই হারাচ্ছে তারা। এই বিষয়টি সুন্দর করে তুলে ধরেছে ব্রিটেনের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক দ্য ইকোনমিস্ট। মূলত তাদের আলোচনা আমেরিকা ঘিরে। আমরাও ওর মধ্যে সীমিত থাকব। তবে এখান থেকে রসদ সবাই পাবেন।
সাপ্তাহিকটি আমেরিকার মূলধারার পত্রিকা ও টেলিভিশন শো-র ছয় লাখ নমুনা সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করেছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নমুনার মধ্যে যেগুলো রাজনৈতিক-বিষয়ক, সেখানে সংবাদমাধ্যম মধ্যপন্থী অবস্থান হারিয়ে ফেলছে। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঝুঁকে গেছে ডেমোক্র্যাটদের দিকে। এর ফলে বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গাটা হারিয়ে ফেলছে তারা।
আগামী বছর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কল্যাণে ইতিমধ্যে আমেরিকা ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান দুই শিবিরে খাড়াখাড়ি ভাগ হয়ে গেছে। এই ভাগাভাগির খুবই নির্মম ইতিহাস কিন্তু আমেরিকার আছে। সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু এই ভাগ হওয়ার কারণে নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, সিএনএন-এর মতো সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের পাঠক ও দর্শক হিসেবে ট্রাম্প তথা রিপাবলিকান সমর্থকদের হারিয়েছে। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে মঞ্চে আর্বিভূত হয়েই ট্রাম্প সাহেব মূলধারার সব মিডিয়াকে নাকচ করে দিয়েছিলেন ‘অপসাংবাদিকতা’র লেবেল সেঁটে দিয়ে। আমেরিকার পাবলিক কিন্তু সেটা ভালোভাবেই খেয়েছিল। শুধু খেয়েছিল বললে ভুল হবে, এখনো খাচ্ছে। যে কারণে এসব সংবাদমাধ্যম দীর্ঘ দিন ধরে পাঠকের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
এখানে একটা ছোট্ট গল্প বলা দরকার। গল্পটি ইকোনমিস্ট থেকেই নেওয়া। নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় পাতার দায়িত্বে ছিলেন জেমস বেনেট। ২০২০ সালের মে-জুন মাস। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে জর্জ ফ্লয়েড নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকের শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তার হাতে খুন হওয়া নিয়ে আমেরিকা তখন উত্তাল। এ ঘটনাকে ঘিরে আরাকানসাসের রিপাবলিকান সিনেটর টম কটনের একটি লেখা ছাপা হয় নিউইয়র্ক টাইসমের সম্পাদকীয় পাতায়। লেখায় কটন দাঙ্গাকারীদের হামলা থেকে সাধারণ মানুষের জীবন ও ব্যবসা বাঁচানোর জন্য ব্যবস্থা নিতে পুলিশের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিলেন। আর যাবে কোথায়? নিউইয়র্ক টাইমসের সংবাদ কক্ষে রীতিমতো বিদ্রোহ। এমন লেখা গেল কীভাবে? লেখাটা আসলে বেনেটের হাত দিয়েই গিয়েছিল। ফলে সব দোষ গিয়ে পড়ে তাঁর ওপর। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রকাশক এ জি শুলবার্গ মাত্র তিন দিন ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন এই ক্ষোভ। এরপর ৭ জুন, ২০২০ তিনি বেনেটকে বিদায় নিতে বলেন।
এই পরিচয়ের কারণে প্রগতিশীল বলে পরিচিত সংবাদমাধ্যম আগেই একটা বড় পাঠক বা দর্শক হারাচ্ছে। ফলে বিভক্ত সমাজে সংবাদমাধ্যমের পাঠকও ভাগ হয়ে যায় শুরুতেই। ছোট্ট আরেকটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কেবল নিউজ নেটওয়ার্ক বা সিএনএনের সাথে আমরা কম-বেশি সবাই পরিচিত। সিএনএন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮০ সালে টেড টার্নার ও তাঁর সহযোগীর হাত ধরে। ডেমোক্র্যাট সমর্থক এই চ্যানেলটি দীর্ঘ দিন জনপ্রিয়তার নিরিখে ওপরের দিকেই ছিল। অন্যদিকে মিডিয়া মোগল বলে পরিচিত রুপার্ট মারডক নিউইয়র্কে ফক্স নিউজ নামে টিভি চ্যানেল চালু করেন ১৯৯৬ সালে। ফক্স শুরু থেকেই রক্ষণশীল ধারার মুখপাত্র হয়ে ওঠে এবং ছয় বছরের মধ্যে রেটিং-এ সিএনএনকে পেছনে ফেলে দেয়। এখন পর্যন্ত সিএনএন পেছনেই আছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অন্ধের মতো সমর্থন করার পরও জনপ্রিয়তায় তারা ধাক্কা খায়নি ফক্স। যদিও ট্রাম্প ২০২০-এর নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন।
আমেরিকার মতো একটি ‘মুক্ত গণমাধ্যম’-এর দেশে যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে অন্যত্র একই হবে—এটাই স্বাভাবিক। এখন একই সংবাদমাধ্যমে প্রগতিশীল ও রক্ষণশীল ধারা পাশাপাশি থাকতে পারে কিনা, সে বিষয়ে আরও দীর্ঘ বিতর্কের দরকার হলেও, তা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এবং প্রযুক্তির বিরাট উল্লম্ফণ সমাজকে যে জায়গায় নিয়ে গেছে সেখান থেকে কোনো টাইম মেশিনে পেছনে ফেরত আসা সম্ভব না। ফলে তাকাতে হবে সামনেই। আর মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখবে পাঠক, দর্শক ও শ্রোতারা। ফলে কাউকে অবহেলা করার আগে অবশ্যই দুবার ভাবতে হবে।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন