ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপরে বিতর্কিত, অসমাপ্ত রামমন্দির উদ্বোধনের পর সমাজমাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী শিবিরের যে মিডিয়া সেল, তারা গৈরিক বস্ত্র পরিহিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবি ভাইরাল করে ফেলেছে। এই গৈরিক বস্ত্র পরিহিত প্রধানমন্ত্রীর ছবি দেখে সারদামণি দেবীর জীবনের একটি ঘটনা মনে পড়ে যাচ্ছে। তিনি তখন জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে উপস্থিত হয়েছেন, তখন এক গৈরিক বস্ত্র পরিহিত রমণী বাগবাজারে তাঁর বাড়িতে আসেন। তিনি সারদা দেবীকে প্রণাম করতে গেলে সন্ন্যাসিনীর প্রণাম নিতে চান না সারদা দেবী। এরপর সেই গৈরিক বস্ত্র পরিহিতা সারদা দেবীর কাছে মন্ত্র দীক্ষা প্রার্থনা করেন। সারদা দেবী তাঁকে বলেন, তুমি যাঁর কাছে গেরুয়া পেয়েছ, তাঁর কাছেই তো মন্ত্র দীক্ষা পাবে। তখন সেই রমণী বলেন, তিনি প্রথাগতভাবে কখনো সন্ন্যাস নেননি, নিজের খুশিমতো এই গৈরিক বস্ত্র ধারণ করেছেন। সারদা দেবী তখন সেই রমণীকে বলেন, গেরুয়া পরা কি এতই সহজ?
আজ যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ত্যাগের প্রতীক গৈরিককে নিজের সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার শুধু নয়, সামাজিক বিভাজনের মধ্যে দিয়ে, সহনাগরিক মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের মনে ভয়ের পরিবেশ তৈরির মতো অতি সংকীর্ণ অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে, তখন সারদা দেবীর ওই প্রশ্নটাই মোদির উদ্দেশ্যে ভারতীয় জনমানসে উঠতে শুরু করেছে।
গৈরিক ধারণ কি এতই সহজ? ভারতের চিরন্তন সমন্বয়বাদী, বহুত্ববাদী, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির একটি অঙ্গ ও ত্যাগের প্রতীক এই গেরুয়া। এই প্রতীকের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল, অগণতান্ত্রিক, ফ্যাসিস্ট মানসিকতার সম্পর্ক নেই।
বিগত ২২ জানুয়ারিকে (২০২৪) কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদী শক্তি তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি যেভাবে চালাবে বলে আমরা মনে করেছিলাম, তার থেকেও উগ্র মানসিকতার ভেতর দিয়ে সেই কর্মসূচিকে তারা পরিচালিত করেছে। তাদের এই পরিচালনার ভেতরে ভয়ংকর সংকেত আগামী দিনের জন্যে থাকলেও সেই পরিচয়ের সংকেত ঘিরে আমরা আশ্চর্য হইনি। কারণ, হিন্দুত্ববাদীদের কাছে এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। রাষ্ট্রশক্তি করায়ত্ত করবার পর ধর্মের যে রাজনৈতিক ব্যবহার হচ্ছে, তা সেই রাষ্ট্রশক্তিকে চিরস্থায়ী করার একটা কৌশল। সেই কৌশলের পথে তারা যাবে, এবং আমাদের গোটা ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থী বা বাম–নন কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি আস্থা আছে, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মানসিকতা আছে—এমন সমস্ত মানুষকে জান কবুল লড়াই করতে হবে, এ নিয়েও কোনো সংশয় ছিল না।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে; হিন্দুত্ববাদী শক্তির রাজনৈতিক কর্মসূচিকে বাস্তবায়িত করতে কেন গোটা রাষ্ট্রশক্তি ঝাঁপিয়ে পড়বে? রাষ্ট্রের কাজ কি কোনো বিশেষ ধর্ম বা সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের সাম্প্রদায়িক কর্মসূচিকে, বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করার গোটা পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করবার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করা? ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান অনুযায়ী ভারত রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো ধর্ম নেই। ভারত রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি নাগরিক, তাদের নিজেদের মতো করে ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে। সেই অধিকার তারা সংবিধান থেকে পেয়েছে। তাহলে গণতান্ত্রিক উপায়ে অর্জিত রাষ্ট্রক্ষমতাকে একটি বিশেষ ধর্ম সম্প্রদায়ের কিছু অংশের লোকের ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের ভেতর দিয়ে অগণতান্ত্রিক উপায়ে চিরস্থায়ী করবার আস্ফালনকে রাষ্ট্রশক্তি কেন মদত দেবে? অযোধ্যায় বিতর্কিত রামমন্দিরের উদ্বোধন ঘিরে কেন রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অফিস–কাছারি, ব্যাংকসহ সমস্ত কিছু বিশেষ রকমের ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবে দিনের বেলায় অর্ধদিবস ছুটি পালন করবে?
কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি বা তাদের সহযোগী শক্তিগুলো যে যে রাজ্যে ক্ষমতাসীন, সেসব রাজ্যে এই ধরনের রাষ্ট্রীয় ধর্ম পালনের নজির আমরা দেখেছি। উত্তরপ্রদেশে তো কথাই নেই। সেখানে হিন্দুত্ববাদীদের তথাকথিত ডবল ইঞ্জিন সরকার। ফলে সেখানে হিন্দু সম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে বাস্তবায়িত করতে গোটা রাষ্ট্রশক্তি যেভাবে আত্মনিয়োগ করেছিল, রাষ্ট্রের একটি বিশেষ ধর্মের প্রতি সরাসরি পক্ষপাতিত্বের এ রকম নজির স্বাধীন ভারতে এর আগে কখনো তৈরি হয়নি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের কাছে। তারা প্রকাশ্যে বিজেপির বিরোধিতা করে থাকে। যদিও বিতর্কিত রামমন্দিরের উদ্বোধন ঘিরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাঁর সরকার বা তাঁর দলের প্রকৃত অবস্থান যে কী, তা কিন্তু আমাদের সকলের শেষ পর্যন্ত জানা নেই। মমতা কখনোই এই বিতর্কিত রামমন্দিরের উদ্বোধন ঘিরে নিজের রাজনৈতিক আপত্তির কথা জানাননি।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, পিভি নরসিমা রাওয়ের মন্ত্রিসভায় থাকাকালে কলকাতার শহীদ মিনারে জনসভা করে মমতা দাবি করেছিলেন, বাবরি মসজিদ ভাঙার আশঙ্কা অবাস্তব। এটা সিপিআই (এম)–এর অপপ্রচার মাত্র। মসজিদ ভাঙার মতো কোনো ঘটনা ঘটবে না।
সেই মমতার সঙ্গে আরএসএসের যে ঘনিষ্ঠতা, তার সম্মুখ পরিচয় আমরা জেনেছি। আর সেটা জানবার পরই আমাদের বিশ্বাস জেগেছে, যেখানে সিপিআই (এম) নেতা সীতারাম ইয়েচুরি, কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী বা তাঁদের দলের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বা বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও আরজেডির সভাপতি লালুপ্রসাদ যাদব প্রমুখ, এ পর্যন্ত বিতর্কিত রামমন্দির উদ্বোধনে যাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, সেখানে মমতা আদৌ আমন্ত্রিত ছিলেন কিনা, এ সম্পর্কে না আরএসএস একটি শব্দ উচ্চারণ করেছে, না মমতা নিজে কোনো শব্দ উচ্চারণ করেছেন।
প্রশাসনিক সভায় মমতা বলেছেন, রামমন্দির হলে তাঁর কিছু যায়–আসে না। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস সাংসদ অধীর চৌধুরীর মতো মানুষ আমন্ত্রিত হয়েছেন। যদিও এঁরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু মমতা আদৌ আমন্ত্রণ পেয়েছেন কিনা, পেলে কেন তিনি ওই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি–এসব সম্পর্কে স্পষ্টভাষায় একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। কিন্তু অযোধ্যায় বিতর্কিত রামমন্দির হলে তাঁর কিছু এসে–যায় না—এই কথাটাই কি প্রচ্ছন্নভাবে মমতা বোঝাতে চেয়েছেন?
আরএসএসের উগ্র ধর্মান্ধতাকে এ রাজ্যে বিজেপির রাজনৈতিকভাবে পা রাখবার জায়গা করে দেওয়ার জন্য মমতা দীঘাতে যে জগন্নাথ মন্দির করছেন বা বিভিন্ন মন্দিরে তিনি রাজ্যের মানুষের করের টাকায় যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক অনুদান দিচ্ছেন, সেই সমস্ত ফিরিস্তি মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। রাজ্যের আর্থিক দুরবস্থা নিয়ে মুখে মমতা অনেক কথা বললেও বিরোধী বামপন্থীদের দাবি অনুযায়ী, কেন্দ্রের কাছে তাঁর পাওনা ইত্যাদি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের ধারপাশ দিয়ে কিন্তু মমতা আজ পর্যন্ত হাঁটেননি।
ক্ষমতায় আসবার পরই তৎকালীন দ্বিতীয় দফার ইউপিএ সরকারের কাছে তিনি যে মরাটরিয়াম দাবি করেছিলেন। সেই দাবি তিনি আদৌ কখনো নরেন্দ্র মোদি সরকারের সামনে উপস্থিত করেননি। বিরোধী বামপন্থী শিবিরের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, কেন্দ্রের কাছে রাজ্য সরকারের পাওনাগণ্ডার ব্যাপারে মমতা অবিলম্বে শ্বেতপত্র প্রকাশ করুন। সেই শ্বেতপত্রে যদি দেখা যায়, সত্যিই ইচ্ছাকৃতভাবে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের প্রাপ্য টাকা আটকে রেখেছে, তাহলে সেই টাকা আদায়ের জন্য বামপন্থীরা আন্দোলন করবে। লড়াই করবেন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে।
বলাবাহুল্য বামপন্থীদের এই দাবি সম্পর্কে মমতা একটা শব্দও আজ পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি। শ্বেতপত্র প্রকাশ তো দূরের কথা। ধর্মান্ধ সম্প্রদায়িক আরএসএস ও বিজেপির ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে লোক দেখানো প্রতিবাদ হিসেবে, ধর্মের আড়ম্বর পালনে আমিও কারওর থেকে কম যাই না—এটাই হলো মমতার রাজনৈতিক অবস্থান। আর এই রাজনৈতিক অবস্থানের ফলেই মমতা নিজেকে আরএসএস ও বিজেপির ধর্মান্ধতার মোকাবিলার নাম করে, প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতাকে এমন একটা জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছেন, যার ফলে এই রাজ্যের মুসলমান সমাজ একটা বড় রকমের সামাজিক, আর্থিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
মমতা নিজেকে সংখ্যালঘু মুসলমানদের মসিহ বলে দাবি করলেও গত ২২ জানুয়ারি রামমন্দিরের উদ্বোধন ঘিরে একেবারে নিচের তলায় আরএসএস, বিজেপি, বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, হিন্দু জাগরণ মঞ্চসহ সমস্ত হিন্দুত্ববাদী শিবির আর প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার ধারক–বাহক তৃণমূল কংগ্রেস কার্যত মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। হিন্দু জাগরণ মঞ্চ উত্তর ২৪ পরগনার বারাকপুর শিল্পাঞ্চলের গঙ্গা আরতির আয়োজন করেছিল অযোধ্যায় বিতর্কিত মন্দির উদ্বোধনের আগে।
সেই আয়োজনে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস উপস্থিত ছিলেন। আবার সেই আয়োজনে আমরা দেখেছি রাজ্যের শাসক দল নিয়োজিত বারাসাত কোর্টের সরকারি প্লিডার উপস্থিত ছিলেন। যে মানুষটি আরএসএসের শাখা সংগঠন, হিন্দু জাগরণ মঞ্চের মতো একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠনের কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন, সেই মানুষটি কি আদৌ আদালতের ভেতরে সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি অবিচার ঘিরে যথার্থ ভূমিকা পালন করতে পারেন?
বিতর্কিত রামমন্দিরের উদ্বোধন হঠাৎ করে একটি দিনের কোনো ধর্মীয় উন্মাদনার বহিঃপ্রকাশ নয়। গোটা কার্যক্রমটিকে ঘিরে ধর্মান্ধ সম্প্রদায়িক শক্তি এবং তাদের দোসর প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার ধারক–বাহকেরা, ঐকমত্যের ভিত্তিতে দীর্ঘ দিন ধরে বিভাজনের অক্ষরেখাটিকে ক্রমশ মজবুত করেছেন। হিন্দু-মুসলমানকে আলাদা করে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে (২০২৪) বিজেপিকে আবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংসদে আসীন করবার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে তারা। তাদের সেই কার্যক্রম এক দিনে যেমন শুরু হয়নি, তেমনি এক দিনে শেষও হবে না।
ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময়কালে ঐতিহাসিক তনিকা সরকারেরা কয়েকজন মিলে যে ছোট্ট পুস্তিকা রচনা করেছিলেন আরএসএসের কর্মসূচি এবং বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড ঘিরে, সেই সব বিষয় গত কয়েক বছর ধরে গোটা ভারতের মতোই পশ্চিমবঙ্গেও একটা মহামারির আকার নিয়েছে। এখন পশ্চিমবঙ্গের শহর থেকে মফস্বল—যেখানেই যাওয়া যাক না কেন, প্রতি এক কিলোমিটারের মধ্যে এই বিতর্কিত রামমন্দিরের উদ্বোধন ঘিরে নানা ধরনের পোস্টার, ব্যানার, পতাকা ইত্যাদি আমরা দেখতে পাব। তার পাল্টা হিসেবে আমরা দেখব আরও বিভিন্ন দেবদেবীকে ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেস বা তাদের বিভিন্ন ধরনের নামে–বেনামে সমাজসেবী সংগঠনগুলো ব্যানার–পোস্টার দিয়ে দেয়াল ঢেকে দিয়েছে।
এভাবে সাধারণ মানুষ, যাঁরা অসাম্প্রদায়িক কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে বিশ্বাসী, অথচ সহনাগরিক মুসলমান সম্প্রদায়ের সম্পর্কে একটা শ্রদ্ধা–ভালোবাসার জায়গা নিজেদের মনে রক্ষা করে চলেন, সেই মানুষগুলোর মধ্যে একেবারে গোয়েবলসের কায়দায় চোখ–কানসহ পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে দিয়ে, তথাকথিত ধর্মাচরণের নাম করে, রাজনৈতিক হিন্দু চেতনার এক ভয়াবহ অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে।
এই কাজটি যেমন আরএসএস করছে, তাদের শাখা সংগঠনগুলো করছে, তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি করছে, তেমনি কিন্তু বিজেপিকে সংসদীয় গণতন্ত্রে সাফল্য পাইয়ে দিতে নানা আকারে–কৌশলে একই ধরনের কাজ করে চলেছে রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে, পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসসহ সব ধরনের রাজনৈতিক হিন্দু সংগঠনগুলো প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে।
মমতা হঠাৎই আরএসএস-বিজেপির বাড়বাড়ন্তের জন্য প্রকাশ্যে সিপিআইকে (এম) দায়ী করে নিজের ন্যক্কারজনক ভূমিকা থেকে মানুষের দৃষ্টিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছেন। বিতর্কিত রামমন্দিরের উদ্বোধন ঘিরে গোটা পশ্চিমবঙ্গে সহনাগরিক মুসলমান সমাজ একটা ভয়াবহ আতঙ্কের মধ্যে এখন দিন কাটাচ্ছেন। লোকসভা নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শিবির এবং তাদের স্বাভাবিক মিত্র, প্রতিযোগিতামূলক সম্প্রদায়িক শিবির, দুটি কৌশলে সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের ভেতরে এক আতঙ্কের বোধ তৈরি করছে।
বিজেপি ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এত ভয়ংকরভাবে করছে, যার ফলে গ্রামেগঞ্জে বা শিল্পাঞ্চলে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের মধ্যে একটা বড় রকমের আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল যেখানে রাজ্যের আর কেন্দ্রের শাসকের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে জনপ্রতিনিধি থেকে কর্মী আদান-প্রদান ঘটে, সেখানে এই বিতর্কিত রামমন্দির উদ্বোধনের দিন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বহু গরিব মুসলমান নিজেদের বাড়িতে থাকতে সাহস করেননি। তাঁরা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় চলে গিয়েছিলেন কেবল নিজেদের প্রাণটুকু বাঁচানোর তাগিদে। তা সত্ত্বেও এই অঞ্চলে ২২ জানুয়ারি রাতে একেবারে বেছে বেছে বহু গরিব মুসলমান মানুষের বাড়ির দরজায়, বাড়ির জানালায় বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।
এসব খবর সাধারণভাবে প্রথাগত মিডিয়ায় আসেনি। এমনকি সমাজমাধ্যমে যাঁরা ব্যস্ত থাকেন, তাঁদেরও সময় হয়নি সহায়–সম্বলহীন এসব গরিব মুসলমান, যাঁদের বেশির ভাগই হিন্দি বা উর্দুভাষী, তাঁদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত খবরাখবর সাধারণ মানুষকে জানানোর। হিন্দি বলয়ে, পুনেতে হিন্দুত্ববাদীদের দাঙ্গার ষড়যন্ত্রের খবর বাংলা বিকল্প ধারার সংবাদমাধ্যমে এলেও বাংলার পরিস্থিতি এখনো নজরে আসেনি।
বিতর্কিত রামমন্দিরের উদ্বোধনের পর একটা কথাই জোর দিয়ে বলা যায়—ভারতের বিভিন্ন অংশের মতো আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গ এখন কার্যত সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে, সামাজিক বিভাজনের প্রশ্নে আগ্নেয়গিরির প্রান্তসীমায় এসে অবস্থান করছে। ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি যখন–তখন, যেকোনো ছলছুঁতোয় সহনাগরিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর একতরফা হামলা করতে পারে। আর এই হামলার কাজে তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার ধারকবাহক রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসকে পেয়ে যাবে, যেভাবে তারা বিগত ২২ জানুয়ারি তাদের পেয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক অবস্থা কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। রাজ্য সরকার দান–খয়রাতি করতে করতে প্রায় দেউলিয়া অবস্থায় এসেছে। ভয়াবহ দুর্নীতির জেরে সরকারি কোষাগার প্রায় শূন্য। কেন্দ্রের কাছ থেকে পাওয়া টাকা-পয়সার সঠিক হিসাব কেন্দ্রীয় সরকারকে সঠিকভাবে না দেওয়ার ফলে কেন্দ্র রাজ্যের প্রাপ্য টাকা আটকে দিয়েছে।
এই রকম একটা অবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসন্ন লোকসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাঁর স্বভাবসুলভ দান–খয়রাতির কর্মকাণ্ড আবারও শুরু করে দিয়েছেন। ১৩ লাখ মহিলা আবার নতুন করে লক্ষীর ভাণ্ডার থেকে টাকা পাবে–এই ঘোষণার মধ্যে দিয়ে তিনি মানুষের তাঁর সরকারের প্রতি যে সীমাহীন ক্রোধ, সেই ক্রোধধারাকে অন্য খাতে বইয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক খেলা শুরু করে দিয়েছেন।
রাজ্যে নতুন কোনো শিল্প নেই। কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলোকে তাদের তাঁবেদার শিল্পপতিদের কাছে জলের দরে বিক্রি করে দিচ্ছে। বামপন্থীরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কংগ্রেস এ নিয়ে প্রতিবাদে সরব। মিটিং–মিছিল করছে। কিন্তু রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেস একেবারে নীরব। বিগত ১৩ বছরের পশ্চিমবঙ্গে একটি নতুন শিল্প হয়নি। বামফ্রন্টের আমলে নতুন যেসব শিল্প, বিশেষ করে প্রযুক্তি, তথ্য–প্রযুক্তি সংক্রান্ত যেসব শিল্প পশ্চিমবঙ্গে এসেছিল, তাদের অধিকাংশই এই রাজ্যের পরিকাঠামোগত দুর্দশার কারণে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এ রাজ্যের উচ্চশিক্ষিত বেকার থেকে শুরু করে প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ পাননি—এমন বেকার, প্রত্যেকেই পেটের তাগিদে আজ ভিন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন।
এই রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। স্বাস্থ্যসাথির নাম করে একটা চটকদার ব্যাপার মমতা ঘটানোর চেষ্টা করলেও এই ব্যবস্থা ঘিরে তাঁর চটকদারিটা সাধারণ মানুষ ধরে ফেলেছে। অস্থিশল্য চিকিৎসাকে ইতিমধ্যেই মমতা সরকার এই স্বাস্থ্যসাথি কার্ডের আওতার বাইরে নিয়ে এসেছে। এরপর একে একে আরও কত কী স্বাস্থ্যসাথির আওতার বাইরে নিয়ে আসা হবে, এটাই শুধু এখন দেখার অপেক্ষায় আমরা আছি।
দুর্নীতি আর সরকারের অপদার্থতার জেরে শিক্ষাব্যবস্থা কার্যত এখন বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে। এ রকম একটা অবস্থায় কেন্দ্রের বিজেপি সরকার, যেমন তাঁদের অপদার্থতা আড়াল করতে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকেই একমাত্র অস্ত্র হিসেবে তুলে ধরেছে, সেভাবেই পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ও ধর্মান্ধতার মোকাবিলায়, প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতাকে একটা জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। যাতে সাধারণ মানুষের যে বেসিক দাবি: কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী সুরক্ষা, বেকারত্ব দূরীকরণ, সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণ—এসব প্রশ্ন এখন ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতা বনাম প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার যে টানাপড়েন, তার জেরে সাধারণ মানুষের চিন্তা–চেতনার বাইরে সরে যেতে শুরু করেছে।
কেন্দ্রে মোদি সরকার যেমন চায় না মানুষ তার ন্যায্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন হোন, ঠিক একইভাবে রাজ্যের মমতার সরকারও চায় না এখানকার মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার সম্পর্কে সোচ্চার হোন।
লেখক: পশ্চিমবঙ্গের গবেষক ও লেখক