সম্প্রতি একুশের বইমেলায় একটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন উঠেছে। কেউ কেউ এ ঘটনা যাঁরা ঘটিয়েছেন, তাঁদের ‘বীর’ আখ্যা দিতে ব্যস্ত। এই সংখ্যাটাই আসলে বেশি। এক দম্পতিকে পাবলিক প্লেসে ‘লজ্জা’ উপহার দিতে পেরে তাঁরা অত্যন্ত গর্বিত। খুবই গুটিকয়েক মানুষ এর বিরোধিতা করছেন। হয়তো তাঁরাই বুঝতে পারছেন যে, লজ্জা পাওয়ার মতো কাজ আসলে কারা করেছেন!
বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, গত ৯ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার বইমেলাতে গিয়েছিলেন খন্দকার মুশতাক আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী তিশা। তাঁদের বিয়ে করার ঘটনা এর আগে আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। রাজধানীর একটি স্কুল-কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য ষাটোর্ধ্ব মুশতাক আহমেদ ওই প্রতিষ্ঠানেরই বয়স ২০ পার না হওয়া শিক্ষার্থী তিশাকে বিয়ে করেন। এ ব্যাপারে আইনি প্রক্রিয়ায় হাইকোর্ট খন্দকার মুশতাক আহমেদকে বলেছেন, ‘আপনি নৈতিকভাবে কাজটি ঠিক করেননি।’ খন্দকার মুশতাককে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন আদালত।
আইনিভাবে অবশ্য তিশা-মুশতাকের বিয়ে বৈধ বিবেচিত হয়। তিশা প্রকাশ্যেই এই বিয়েতে সম্মতির কথা বলেছিলেন। আর মুশতাক তো বলেছেনই। এখানে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য যে, নৈতিকভাবে বেঠিক কাজও কখনো কখনো আইনিভাবে বৈধ হতে পারে। নীতির বিষয়টি অনেক বেশি সমাজকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল, সমাজ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু আইন চলে যুক্তিতে, প্রমাণে। ফলে এই দুইয়ের মধ্যে তারতম্য ঘটতেই পারে।
যদিও সেই কাজটিই করা হয়েছে গত শুক্রবার। তিশার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক নিযে মুশতাক আহমেদের লেখা বই প্রকাশিত হয়েছে এবারের বইমেলায়। স্ত্রীসহ তিনি মেলাতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের দুয়োধ্বনি দেওয়া হয়েছে, ‘ভুয়া ভুয়া’ ও ‘ছিঃ ছিঃ’ রবে অপমান করার প্রকাশ্য চেষ্টা চলেছে। এমনকি মেলায় আসা কিছু দর্শনার্থী শেষ পর্যন্ত তাঁদের ঘিরে ধরে জোর করে ‘লজ্জা’ অনুভব করানোর চেষ্টা করেছেন। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন ভিডিওচিত্র নানা সংবাদমাধ্যম প্রচার করেছে। তাতে সমাজ রক্ষার্থে সতত নিয়োজিত সেই ‘বীর’ যোদ্ধাদের বলতে শোনা গেছে—‘করছে কি ভাই, লজ্জা! কামডা কি ভাই, লজ্জা। ১৮-৬৫ লজ্জা। কেমনে মিলে? লজ্জা! ভাইরে ভাই, লজ্জা। সারা দেশের লজ্জা। বিশ্ববাসীর লজ্জা…’ ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত তিশা-মুশতাককে মেলা ছেড়ে বের হয়ে যেতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায়। তাঁরা এরই মধ্যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও অভিযোগ করেছেন গণমাধ্যমের কাছে।
বুঝে দেখেন—কী পরিমাণ লজ্জায় ডুবে গিয়েছিলেন এই সমাজের কিছু তরুণ! এ থেকে ভেসে উঠতেই হয়তো তাঁরা লজ্জা উপহার দিতে উঠেপড়ে লাগলেন। সোশ্যাল মব তৈরি করে সবাই মিলে ‘হুলিগান’ সাজলেন! এবং একটি পর্যায়ে সমাজ রক্ষার সেই মহান ব্রত পালনে সফল হলেন। হ্যাঁ, আপনার একটা কিছু অপছন্দ হতেই পারে। অসহ্য বোধও হতে পারে। কিন্তু পাবলিক প্লেসে বা ব্যক্তিগতভাবে বা শারীরিকভাবে আপনি কারও ওপর চড়াও হতে পারেন না। কারও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হয়ে উঠতে পারেন না, কাউকে অপমানও করতে পারেন না। সেই অধিকার এই দেশের কোনো নাগরিককেই দেওয়া হয়নি। সেটিই যদি হয়, তাহলে আর আইন-আদালতের প্রয়োজন কী?
আর এ দেশের সমাজতাত্ত্বিকদের প্রতি একটি আরজি আছে। তাত্ত্বিকভাবে নাগরিক বলতেই সভ্য বলে বিবেচনা করা হয়। যদিও আমাদের দেশে তা বারবারই ভুল প্রমাণ হয়ে চলেছে। এ সমাজে এখন নাগরিকের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিবিভাগ করা অতীব প্রয়োজন। সেটি হলো—সভ্য নাগরিক ও অসভ্য নাগরিক। এ সংক্রান্ত একটি পরিমাপক পদ্ধতি প্রণয়ন করা এখন খুবই দরকার। তা না হলে এই পুরো দেশ ও সমাজই ধন্ধে পড়ে যাবে প্রতিনিয়ত। অন্যকে লজ্জা দিতে গিয়ে নিজেদের নির্লজ্জ হিসেবে প্রমাণ করা হুলিগানরাই হয়ে যাবে এ দেশের নাগরিক সমাজের প্রতিভূ। আমরা কি সেই লজ্জার মালা গলায় পরতে চাই?
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন