দিকে দিকে নির্বাচনের ঢাকে অনিয়মের সঙ্গত

দেশে দেশে নির্বাচন হচ্ছে। এটা নির্বাচনেরই বছর, যা শুরু হয়েছে বাংলাদেশের নির্বাচন দিয়ে। এর পর তাইওয়ান ঘুরে সর্বশেষ পাকিস্তানের নির্বাচন শেষ হয়েছে। ভারত, আমেরিকাসহ আরও বেশ কিছু দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে এ বছরই। সব মিলিয়ে বেশ একটা জমজমাট বছর বলতে হবে।

এই যে এত এত নির্বাচন—এ নিয়ে জনপরিসর থেকে শুরু করে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোতে মূখ্য আলোচনাটি কী? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, নির্বাচন যে দেশেই হোক—আলোচনার কেন্দ্রে কিন্তু একটি বিষয় ঘুরেফিরেই আসছে। আর তা হলো—অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট। সাথে কোনো দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচারে ‘অংশগ্রহণমূলক’ শব্দটিও ঢুকে যাচ্ছে। আর এই সব শব্দমালাকে অবধারিতভাবে অনুসরণ করছে ‘আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতির’ বিষয়টি।

এই যেমন পাকিস্তানে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো গত ৮ ফেব্রুয়ারি। দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক–ই–ইনসাফ (পিটিআই) দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারল না। ভোটের দিন দলটির প্রার্থীদের প্রচারের একমাত্র হাতিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও রুদ্ধ করা হলো নিরাপত্তার অজুহাতে। তবুও পিটিআইয়ের প্রার্থীরা বিনা দলীয় প্রতীকে জয় পেলেন। কিন্তু দেশটির সেনা নেতৃবৃন্দ বাকি দুই দল বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি ও সাবেক ক্ষমতাচ্যুত ও নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পিএমএল–এনকেই ক্ষমতায় দেখতে চায়।

পাকিস্তানের অঘোষিত শাসকদের এই চাওয়া এবং ইমরানকে বা তাঁর দলকে ক্ষমতার আশপাশে না চাওয়া এখন আলোচনার কেন্দ্রে। পাকিস্তান তো বটেই, সারা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যমগুলো দেশটির নির্বাচনে কারচুপি নিয়েই আলোচনায় ব্যস্ত। দেশটির ভোটার জনগোষ্ঠীর মধ্যেও নিশ্চয়ই এ নিয়ে আলোচনা চলছে। সুষ্ঠু ভোট হলে কী হতো—ইত্যাদি বেশ গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। রয়টার্স ফাইল ছবি

সামনে ভারতের লোকসভা নির্বাচন। সেখানেও নির্বাচনের আগে আগে দেশটির শাসক দল বিজেপির নির্বাচনকে প্রভাবিত করার নানা কৌশলের দিকে চোখ রাখছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। বাদ নেই আমেরিকাও। সেখানেও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে এক ধরনের আলোচনা চলছে। সেই আলোচনায় ট্রাম্প নিজেই হাওয়া দিচ্ছেন, যিনি সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়ই বলে দিয়েছেন—আমেরিকার নির্বাচন ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত। এর মধ্যে আবার ফোড়ন কেটে রেখেছে রাশিয়া। সম্প্রতি দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন ও ট্রাম্পের মধ্যে কাকে বেশি পছন্দ—সে কথা জানিয়ে রেখেছেন। এখানে মনে রাখা জরুরি যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পেছনে পুতিনের দেশের হ্যাকারদের ভূমিকা ছিল বলে জোর অভিযোগ ছিল। এ নিয়ে মার্কিন কংগ্রেস তদন্তও করেছিল।

অর্থাৎ, বর্তমানে বিশ্বের যে দেশেই নির্বাচনের ঢাক বাজুক না কেন, তার সাথে সাথে সঙ্গত হিসেবে বাজছে ‘কারচুপি’, ‘প্রভাব’ ইত্যাকার শব্দের চাপা সুরও। এর বাইরে এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত, বা গোটা বিশ্বকে গণতন্ত্রের সবক শেখানো আমেরিকাও নেই। এমনকি মার্কিন নির্বাচনে বাইডেনকে জয় পাইয়ে দিতে টেইলর সুইফটের মতো তারকাও কাজ করছেন বলে সন্দেহের কথা জানাচ্ছেন দেশটির ভোটারেরা।

চলতি বছরে ভারতে লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রয়টার্স ফাইল ছবি

দেশে দেশে নির্বাচন, ভোট, নির্বাচনী ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস দিন দিন বাড়ছে। ফলে তারা এ সম্পর্কিত আলোচনাতেই মশগুল। হয়তো বাজার ঠিকমতো হয়নি, হয়তো দুদিন আগেই তার ঘরে চুরি হয়েছে, হয়তো তার বাড়িতেই কেউ একজন খুন হয়েছে কয়েক দিন আগে, হয়তো নাগরিক সেবা পেতে গিয়ে নাকে–চোখে পানি এসে যাচ্ছে, হয়তো বিদেশ ভ্রমণে যাওয়ার সময় হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে, হয়তো ব্যবসা স্থাপন করতে গিয়ে প্রশাসনিক নানা ধকল সইতে হচ্ছে কিংবা কিছুই নয়—প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছে কেউ একজন নজর রাখছে সর্বক্ষণ। কিন্তু সামষ্টিক আলোচনায় যখনই বসছে, এসবের নিত্যকার সংকটের কোনো কিছুই আর আসছে না। আসছে নির্বাচন, আসছে ভোট, আসছে সুষ্ঠু–অসুষ্ঠু, আসছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বা চাপ, আসছে ভিন্ন দেশের প্রভাবের মতো বিষয়গুলো।

এটি ঘটছে, কারণ গেল এক দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্বের নানা দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কোথাও স্থূল, তো কোথাও সূক্ষ্ম কারচুপি। কোথাও এসেছে চীন–রাশিয়া–আমেরিকা ইত্যাদি দেশের প্রভাব। নিজ দেশের জনগণের চেয়ে অন্য দেশের ইচ্ছা–অনিচ্ছা, তাদের চাওয়া–পাওয়া ইত্যাদি চলে এসেছে মূখ্য আলোচনায়।

জনপরিসরের এই যে আলোচনা—এটিই কিন্তু বাকি সবকিছুকে আড়াল করে দিচ্ছে। নির্বাচন, ভোটের মতো বিষয়াদি এতটাই প্রবল যে, তা নাগরিকদের যথার্থভাবে ভুলিয়ে দিতে পেরেছে ব্যক্তিগত চাওয়া–পাওয়াকে। নিজের অধিকারবোধের ওপর ভোটের আলাপ এক মোটা ও পুরু স্তরের প্রলেপ দিয়েছে। সেই স্তর ভেদ করে আর মানুষের পক্ষে খুঁড়ে দেখা সম্ভব হচ্ছে না যে—তার আয়ের সাথে বাজার পরিস্থিতি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি–না। সে আর বুঝতে পারছে না যে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়ার ভারটি রাষ্ট্রের। সসম্মানে নাগরিক অধিকার কেন মিলছে না—সে প্রশ্ন তার পক্ষে আর তোলা সম্ভব হচ্ছে না। গণপরিবহনের প্রাপ্যতা ও ভাড়া, দ্রব্যমূল্য ইত্যাদি আর কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছে না সেভাবে, যেমনটা দাঁড়ানোর কথা। আর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা? এমন বিদ্যমানতায় দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মতো বিষয়কে বিলাসিতা বলে মনে হয়।

এ বছর আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রয়টার্স ফাইল ছবি

বোঝাই যাচ্ছে ভোট, নির্বাচন, নির্বাচনী ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে অতি আলাপ আদতে নাগরিকদের রাষ্ট্র থেকে প্রাপ্য তাদের অধিকারকেই ভুলিয়ে দিচ্ছে। এর সুফল কে পাচ্ছে? সোজা উত্তর—শাসক। শুধু শাসকের ভূমিকায় থাকা রাজনীতিক নন, প্রশাসনের নানা অঙ্গে বসে ক্ষমতার মধুপানের সুযোগ পাওয়া ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলো নাগরিক পরিসর থেকে কোনো জোর ধাক্কা ছাড়াই নির্বিঘ্নে তাদের কাজ করে যেতে পারছে। কাজ বা অকাজ—কোনোটির জন্যই তাদের আর সেভাবে জবাবদিহির মুখে পড়তে হচ্ছে না। এমনকি বিরোধী পক্ষে থাকা রাজনীতিকেরা, যারা কিছুদিন আগে হয়তো ক্ষমতায় ছিল, কিংবা কিছুদিন পর ক্ষমতায় আসীন হবে—তারাও তাদের কৃত কর্ম বা ভবিষ্য কর্মের জন্য আর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে না। তাদের অন্তত এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে না যে, তারা জনগণের জন্য কী করেছে বা ভবিষ্যতে কী করবে?

জাতীয় ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পুরোটা দখল করে আছে দুটি শব্দ—নির্বাচন ও ভোট। যেন এর যথার্থতার ওপরই সবটা নির্ভরশীল। যেন অযথার্থ ভোটের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় বসে যেতে পারলেই সব মিটে–চুকে গেল। কোনো প্রশ্নের উত্তর আর দিতে হবে না। জনতার কাছ থেকে শাসক বর্গ (যে ক্ষমতায় আছে এবং যে নেই; কিন্তু ভবিষ্যতে যে আসতে পারে) সুকৌশলে এক দায়মুক্তি যেন নিয়ে নিয়েছে। এই দায়মুক্তি বলে সকল ক্রিয়া, যা ভোটের চেয়েও বেশি জীবনঘনিষ্ঠ, তার থেকে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে এই বর্গটি। আর জনতা সেই ভোট ও নির্বাচনের দারুণ আস্তরণে তৈরি লেবেঞ্চুসটি সজোরে চুষে যাচ্ছে—যেন এ–ই সেই মোক্ষ।

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন