‘রানির কালো সন্তান হয়েছে। কেমন কালো? কুচকুচে কালো, ঠিক কাকের মতো। রানি কাক প্রসব করেছেন। রানি ঝাঁকে ঝাঁকে কাক প্রসব করেছেন।’
এই যে বাক্যপ্রবাহ, এর মধ্যেই আছে গুজবের হদিস। ছোটবেলায় শোনা এ গল্প শুনে মানুষের বাড়িয়ে বলা নিয়ে বা বানিয়ে বলা নিয়ে বেশ একটা বোধ হয়তো তৈরি হয়েছে। কিন্তু কখনো কি প্রশ্ন জেগেছে যে, আচ্ছা এমন গুজব রাজ্যময় ছড়ানোর পর ওই রানির কী হলো? তাদের রাজত্বটি টিকল তো? বলা যেতে পারে ছোটবেলায় খেলা সেই মজার খেলার কথা, যেখানে একজন আরেকজনকে কানে কানে একটি তথ্য বলত এবং সে আরেকজনকে। এভাবে দশ–বারোজনের কান ও মুখ ঘুরে শেষ পর্যন্ত প্রথম বক্তার কাছে যে তথ্যটি ফিরে আসত, তা হতো অভিনব। বাক্য বা তথ্যের এই রূপান্তরে হেসে কুটি কুটি হতো সবাই। কিন্তু এখন বোধ হয় আর এতে কেউ হাসবে না।
কারণ দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, অন্তত গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে তো বটেই গোটা বিশ্বে গুজব, অপতথ্য, মিথ্যা তথ্য ইত্যাদিকে ঘিরে যত সংঘাত, যত অঘটন ঘটেছে, তাতে মানুষের এই স্বভাবকে আর নিরীহ বলার জো নেই। ২০২০ সালের ক্যাপিটল হিল হামলা হোক, কিংবা দেশের নাসিরনগর—সবখানে গুজব একই ধরনের পরিণতি ডেকে এনেছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স গুজব বা ভুয়া তথ্য নিয়ে দুজন ব্যক্তির নাম এই মুহূর্তে মনে আসছে—একজন নাৎসি জার্মানির প্রচার প্রধান গোয়েবলস, অন্যজন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রথমজনের বক্তব্য হিসেবে প্রচারিত যে, একটি মিথ্যা ১০ বার বললে তা সত্য হয়ে যায়। আর দ্বিতীয়জন গুজব ও অপতথ্যের দুনিয়ার দিকে ফিরে তাকাতে সবাইকে বাধ্য করেছেন। না, তিনি সাধু ছিলেন না। নিজেও বিস্তর মিথ্যা বলেছেন। তবে বিরুদ্ধ যেকোনো খবরকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার যে চল শুরু করেছিলেন, তাতে বিপরীতে হিত হয়েছিল। সবাই নিজের অজান্তেই ফেইক নিউজ বা ভুয়া খবর বিষয়ে সচেতন হতে শুরু করেছিল। এরই প্রভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর পরবর্তী জমানায় এসে এত এত স্বাধীন ফ্যাক্টচেকার শুধু নয়, রীতিমতো ফ্যাক্টচেকার এজেন্সি দাঁড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়।
এই যে গুজব, এটি কিন্তু নিরীহ কিছু নয়। ফ্যাক্ট বা তথ্যের মধ্যে কোনো ধারণা বা অন্য কিছু থাকার সুযোগ নেই। এটি তখনই মিথ্যা বা অপতথ্যে পরিণত হয় যখন, তা পুরোপুরি বা আংশিক মিথ্যা বা ধারণাপ্রসূত বিষয়াদি যুক্ত করে পরিবেশন করা হয়। আর গুজব? হ্যাঁ, গুজব বিষয়টি এ দুইয়ের মধ্যেই পড়ে এর রকমবিচারে। কখনো পূর্ণ মিথ্যা, কখনো আংশিক সত্য ছড়িয়ে পড়ে গুজব হিসেবে। একটি তথ্য বা তথ্যসমষ্টি তখনই গুজব হিসেবে সাব্যস্ত হয়, যখন তা এর উৎস বা সত্যাসত্য বিচার ছাড়াই মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান বাস্তবতায় এই গুজব ছড়ানোর সবচেয়ে ভয়াবহ মাধ্যম হলো সামাজিক মাধ্যম। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রচলিত অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলোয় ১০ শতাংশের কিছু বেশি ক্ষেত্রে তথ্য উৎস হিসেবে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু গুজবের ক্ষেত্রে দেখা গেছে এ ধরনের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভুয়া তথ্যের মধ্যে ৪১ শতাংশের বেশির উৎস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
এটি কারা উৎপাদন করে? যে কেউ করতে পারে। কখনো সংবাদমাধ্যমও গুজবের উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়। তবে বিভিন্ন সময় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি, বিনোদন জগতের তারকারা এই গুজবের জন্ম দেন। সম্প্রতি যেমন এমন গুজবের জন্ম দিয়েছিলেন ভারতের বিনোদন জগতের আলোচিত তারকা পুনম পাণ্ডে। নিজের মৃত্যুসংবাদ তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীর মাধ্যমে প্রচার করেন। জানান যে, ক্যানসারের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। পরে নিজেই নিজের জীবদ্দশার কথা জানিয়ে বলেন, এ কাণ্ড তিনি ঘটিয়েছেন ক্যানসার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে। ততক্ষণে কিন্তু বহু সংবাদমাধ্যম এই মৃত্যুসংবাদ প্রচার করে বিপাকে পড়ে গেছে।
এ ঘটনার সরাসরি প্রভাব পড়ল বাংলাদেশে আরেক তারকার মৃত্যুতে। মৃত্যু সংবাদ জানার পরও অনেকেই খবরটি প্রচারের আগে বাড়তি সতর্কতা নিল। কয়েকটি সূত্র মারফত নিশ্চিত হয়েও দ্বিধা কাটাতে সময় নিতে হলো। এ ঘটনা বলে দেয় অপ বা মিথ্যা তথ্যের প্রভাব তথ্যের প্রচারের ওপর কতটা পড়ছে।
এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমগুলোকে পড়তে হচ্ছে বড় ধরনের সংকটে। একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে দ্রুততম সময়ে যথাযথ তথ্য পাঠক–দর্শকের সামনে হাজির করার চাপ, অন্যদিকে তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে এর যাচাইয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা ও বিভ্রান্তির ফেরে পড়তে হচ্ছে প্রচলিত সংবাদমাধ্যমগুলোকে। এ ক্ষেত্রে ইউটিউব, ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমের নানা প্ল্যাটফর্ম থেকে আয়ের সুযোগ এবং সেই সূত্রে লাইক–ভিউ ইত্যাদির ইঁদুর দৌড়ে এগিয়ে থাকার লোভও অনেক সময় যথাযথভাবে যাচাই ছাড়া সংবাদ পরিবেশনে প্ররোচিত করছে। কথা হলো—মানুষ গুজবে কেন বিশ্বাস করে? সোজা উত্তর—মানুষ তার অনুমানের সাথে মিলিয়ে দেখতে চায় সবকিছু। এ ক্ষেত্রে সত্য ও মিথ্যার এমন এক দুর্দান্ত রেসিপি হাজির করা হয়, যা অধিকাংশ সাধারণ মানুষকে তা বিশ্বাসে প্রলুব্ধ করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ও অস্তিত্বের সংকটকে লক্ষ্যবস্তু করে গুজবের রেসিপিটি তৈরি করা হয়।
অর্থাৎ, সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ভুল, ভুয়া, অপ বা মিথ্যা তথ্য যা–ই হোক না কেন, তার পেছনে অসাবধানতা যেমন থাকে, তেমনি কিছুটা হলেও সামাজিক মাধ্যম থেকে আরও আরও ডলার আনার বিষয়টিও যুক্ত। মূলত চটকদার খবর বা তথ্য পরিবেশন করে দর্শক–পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ ও সেই সূত্রে ভিউয়ের দৌড়ে এগিয়ে যাওয়া ও আরও বেশি সোশ্যাল রেভিনিউই এর পেছনে একটা প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। এখানে এটা বলার সুযোগ নেই যে, সব সংবাদমাধ্যমই এ দৌড়ে নেমে হিতাহিত জ্ঞান ভুলে যায়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বহু সংবাদমাধ্যমের নাম দেওয়া সম্ভব, যারা সঠিক তথ্য পরিবেশনের ওপরই সর্বোচ্চ মনোযোগ দেয়।
প্রতীকী ছবি: পিক্সাবে এবার তাকানো যাক কোনো একটি অর্ধসত্য বা ভুয়া বা অপতথ্যকে গুজবে রূপ দিয়ে ব্যবসায়িক মুনাফা কামানোর দিকে। এর ফেরে পড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোকে ঠিক বিপরীত পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। ১৯৮০–এর দশকে আমেরিকায় পপ রকস ব্র্যান্ডের একটি ক্যান্ডি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। হঠাৎ করেই এই ক্যান্ডের সাথে কোকাকোলাকে মিশিয়ে এক অদ্ভুত গুজব চাউর হয়। দাবি করা হয়—পপ রকস ক্যান্ডি খাওয়ার পর কোকাকোলা পান করে পেট ফেটে মিকিমাউস মারা গেছে। লক্ষ্য পরিষ্কার—ক্যান্ডির মুখ্য ভোক্তা শিশুরা। এটা এতটাই যে, কোম্পানিটি রীতিমতো বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়। মিকি মাউস জীবিত বলেও কোনো লাভ হচ্ছিল না। বলা হলো—ওটা মিকি মাউস নয়, তার মতো দেখতে কিছু একটা। শেষে এফডিএর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়। এমন ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে পেপসি, কেএফসিসহ বহু নামজাদা ব্র্যান্ডকে।
ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলের গুজবের সাথে আর্থিক বিষয়াদি জড়িয়ে থাকবে—এতো জানা কথাই। তাহলে অন্য গুজব? হ্যাঁ, অন্য গুজবগুলোর সাথেও কোনো না কোনোভাবে আর্থিক বিষয়াদি যুক্ত থাকে। কোনো পক্ষ মুনাফা গোনে, তো কোনো পক্ষকে গুনতে হয় লোকসান। রাজনৈতিক গুজবগুলোর সরাসরি লক্ষ্য থাকে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল বা নেতা–কর্মীরা। এ ক্ষেত্রে হয় কোনো দলকে মূল্য চোকাতে হয়, নাহলে কোনো নেতাকে। আর বর্তমান দুনিয়ায় রাজনীতি আর্থিক লাভালাভ নিরপেক্ষ নয়—এ তো সবাই জানে। এমনকি ধর্মকে কেন্দ্র করে ছড়ানো নানা গুজবের সাথেও লেপ্টে থাকে আর্থিক বিষয়াদি। ভূমি থেকে উৎখাত হোক, কিংবা ব্যবসা বা অন্য কোনো ক্ষমতা বা প্রভাবের সমীকরণের প্রয়োজনে হোক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এ সম্পর্কিত গুজব চাউর করাটা এই বিশ্বে বহু আগে থেকে চলে আসছে।
পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট স্ট্যাটিস্টার তথ্যমতে, ২০২০ সালেই শুধু গুজবের কারণে ৭ হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলারের আর্থিক মূল্য চোকাতে হয়েছে বিশ্বকে। এ তো গেল তদনগদ অর্থনৈতিক ক্ষতি। গুজবের সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করলে এর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতিটি আরও অনেক বেশি।
ফরাসি প্রতিষ্ঠান বাস্টার ডট এআই জানাচ্ছে, গুজবের কারণে এক পক্ষ যেমন লোকসান গুনছে, অন্য পক্ষ কিন্তু মুনাফাও গুনছে। সেটা কেমন? তারা বলছে, এই ধারাটি একটি সমান্তরাল অর্থনীতিতে রূপ নিচ্ছে। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়ে বড় নির্বাচনগুলোকে কেন্দ্র করে প্রচার ও অপপ্রচার সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন খাত থেকে সারা বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানি আয় করেছে ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ২০১৬ সালে এক আমেরিকাতেই হয়েছে ২০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের প্রচার ব্যবসা। কিন্তু রাজনীতিই কেবল লক্ষ্যবস্তু নয়। ২০২১ সালে সাড়ে ৩ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছিল শুধু জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত ধারণা নিয়ে সংশয় ছড়াতে।
ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে, গুজব কোনো হেসে উড়িয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। নানা ধরনের আপাত নিরীহ এবং বোকা বোকা গুজবের পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে বিরাট কোনো অর্থনৈতিক–রাজনৈতিক পরিকল্পনা। আর প্রতিটি গুজবের সামাজিক প্রভাব তো আছেই। গুজব মূলত বিরাট জনপরিসরের মন ও চিন্তা নিয়ে খেলে। এই জনসমষ্টি কিন্তু ভোক্তাও। এখানে ভোক্তা বলতে শুধু পণ্যের ভোক্তা ধরে নিলে ভুল হবে। সংস্কৃতি, সাহিত্য, ধারণা, চিন্তা ইত্যাদিরও কিন্তু ভোক্তা আছে। গুজব মূলত এই ভোক্তা সমাজ নিয়ে কাজ করে। ফলে কোনো তথ্যকে গুজব হিসেবে চিহ্নিত করে চুপ করে বসে থাকার বা সামাজিক মাধ্যমে এ সম্পর্কিত পোস্টে ‘হাহা’ প্রতিক্রিয়া দিয়ে বা কোনো প্রতিক্রিয়া না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়াটা ওই গুজবকে আরেকটু শিকড় গাড়তে দেওয়ারই নামান্তর। এ ক্ষেত্রে উচিত ওই গুজবকে চ্যালেঞ্জ করা, যা মানুষকে সত্যাসত্য বুঝতে সহায়তা করবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনেরও অনেকটা দায়িত্ব আছে। কারণ, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বদলে যথাযথ তথ্য উপস্থাপন ও সেই তথ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার গুজব ছড়িয়ে পড়ার পথ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
কারণ দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, অন্তত গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে তো বটেই গোটা বিশ্বে গুজব, অপতথ্য, মিথ্যা তথ্য ইত্যাদিকে ঘিরে যত সংঘাত, যত অঘটন ঘটেছে, তাতে মানুষের এই স্বভাবকে আর নিরীহ বলার জো নেই। ২০২০ সালের ক্যাপিটল হিল হামলা হোক, কিংবা দেশের নাসিরনগর—সবখানে গুজব একই ধরনের পরিণতি ডেকে এনেছে।
এই যে গুজব, এটি কিন্তু নিরীহ কিছু নয়। ফ্যাক্ট বা তথ্যের মধ্যে কোনো ধারণা বা অন্য কিছু থাকার সুযোগ নেই। এটি তখনই মিথ্যা বা অপতথ্যে পরিণত হয় যখন, তা পুরোপুরি বা আংশিক মিথ্যা বা ধারণাপ্রসূত বিষয়াদি যুক্ত করে পরিবেশন করা হয়। আর গুজব? হ্যাঁ, গুজব বিষয়টি এ দুইয়ের মধ্যেই পড়ে এর রকমবিচারে। কখনো পূর্ণ মিথ্যা, কখনো আংশিক সত্য ছড়িয়ে পড়ে গুজব হিসেবে। একটি তথ্য বা তথ্যসমষ্টি তখনই গুজব হিসেবে সাব্যস্ত হয়, যখন তা এর উৎস বা সত্যাসত্য বিচার ছাড়াই মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান বাস্তবতায় এই গুজব ছড়ানোর সবচেয়ে ভয়াবহ মাধ্যম হলো সামাজিক মাধ্যম। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রচলিত অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলোয় ১০ শতাংশের কিছু বেশি ক্ষেত্রে তথ্য উৎস হিসেবে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু গুজবের ক্ষেত্রে দেখা গেছে এ ধরনের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভুয়া তথ্যের মধ্যে ৪১ শতাংশের বেশির উৎস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
এটি কারা উৎপাদন করে? যে কেউ করতে পারে। কখনো সংবাদমাধ্যমও গুজবের উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়। তবে বিভিন্ন সময় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি, বিনোদন জগতের তারকারা এই গুজবের জন্ম দেন। সম্প্রতি যেমন এমন গুজবের জন্ম দিয়েছিলেন ভারতের বিনোদন জগতের আলোচিত তারকা পুনম পাণ্ডে। নিজের মৃত্যুসংবাদ তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীর মাধ্যমে প্রচার করেন। জানান যে, ক্যানসারের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। পরে নিজেই নিজের জীবদ্দশার কথা জানিয়ে বলেন, এ কাণ্ড তিনি ঘটিয়েছেন ক্যানসার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে। ততক্ষণে কিন্তু বহু সংবাদমাধ্যম এই মৃত্যুসংবাদ প্রচার করে বিপাকে পড়ে গেছে।
এ ঘটনার সরাসরি প্রভাব পড়ল বাংলাদেশে আরেক তারকার মৃত্যুতে। মৃত্যু সংবাদ জানার পরও অনেকেই খবরটি প্রচারের আগে বাড়তি সতর্কতা নিল। কয়েকটি সূত্র মারফত নিশ্চিত হয়েও দ্বিধা কাটাতে সময় নিতে হলো। এ ঘটনা বলে দেয় অপ বা মিথ্যা তথ্যের প্রভাব তথ্যের প্রচারের ওপর কতটা পড়ছে।
এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমগুলোকে পড়তে হচ্ছে বড় ধরনের সংকটে। একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে দ্রুততম সময়ে যথাযথ তথ্য পাঠক–দর্শকের সামনে হাজির করার চাপ, অন্যদিকে তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে এর যাচাইয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা ও বিভ্রান্তির ফেরে পড়তে হচ্ছে প্রচলিত সংবাদমাধ্যমগুলোকে। এ ক্ষেত্রে ইউটিউব, ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমের নানা প্ল্যাটফর্ম থেকে আয়ের সুযোগ এবং সেই সূত্রে লাইক–ভিউ ইত্যাদির ইঁদুর দৌড়ে এগিয়ে থাকার লোভও অনেক সময় যথাযথভাবে যাচাই ছাড়া সংবাদ পরিবেশনে প্ররোচিত করছে। কথা হলো—মানুষ গুজবে কেন বিশ্বাস করে? সোজা উত্তর—মানুষ তার অনুমানের সাথে মিলিয়ে দেখতে চায় সবকিছু। এ ক্ষেত্রে সত্য ও মিথ্যার এমন এক দুর্দান্ত রেসিপি হাজির করা হয়, যা অধিকাংশ সাধারণ মানুষকে তা বিশ্বাসে প্রলুব্ধ করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ও অস্তিত্বের সংকটকে লক্ষ্যবস্তু করে গুজবের রেসিপিটি তৈরি করা হয়।
অর্থাৎ, সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ভুল, ভুয়া, অপ বা মিথ্যা তথ্য যা–ই হোক না কেন, তার পেছনে অসাবধানতা যেমন থাকে, তেমনি কিছুটা হলেও সামাজিক মাধ্যম থেকে আরও আরও ডলার আনার বিষয়টিও যুক্ত। মূলত চটকদার খবর বা তথ্য পরিবেশন করে দর্শক–পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ ও সেই সূত্রে ভিউয়ের দৌড়ে এগিয়ে যাওয়া ও আরও বেশি সোশ্যাল রেভিনিউই এর পেছনে একটা প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। এখানে এটা বলার সুযোগ নেই যে, সব সংবাদমাধ্যমই এ দৌড়ে নেমে হিতাহিত জ্ঞান ভুলে যায়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বহু সংবাদমাধ্যমের নাম দেওয়া সম্ভব, যারা সঠিক তথ্য পরিবেশনের ওপরই সর্বোচ্চ মনোযোগ দেয়।
ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলের গুজবের সাথে আর্থিক বিষয়াদি জড়িয়ে থাকবে—এতো জানা কথাই। তাহলে অন্য গুজব? হ্যাঁ, অন্য গুজবগুলোর সাথেও কোনো না কোনোভাবে আর্থিক বিষয়াদি যুক্ত থাকে। কোনো পক্ষ মুনাফা গোনে, তো কোনো পক্ষকে গুনতে হয় লোকসান। রাজনৈতিক গুজবগুলোর সরাসরি লক্ষ্য থাকে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল বা নেতা–কর্মীরা। এ ক্ষেত্রে হয় কোনো দলকে মূল্য চোকাতে হয়, নাহলে কোনো নেতাকে। আর বর্তমান দুনিয়ায় রাজনীতি আর্থিক লাভালাভ নিরপেক্ষ নয়—এ তো সবাই জানে। এমনকি ধর্মকে কেন্দ্র করে ছড়ানো নানা গুজবের সাথেও লেপ্টে থাকে আর্থিক বিষয়াদি। ভূমি থেকে উৎখাত হোক, কিংবা ব্যবসা বা অন্য কোনো ক্ষমতা বা প্রভাবের সমীকরণের প্রয়োজনে হোক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এ সম্পর্কিত গুজব চাউর করাটা এই বিশ্বে বহু আগে থেকে চলে আসছে।
পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট স্ট্যাটিস্টার তথ্যমতে, ২০২০ সালেই শুধু গুজবের কারণে ৭ হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলারের আর্থিক মূল্য চোকাতে হয়েছে বিশ্বকে। এ তো গেল তদনগদ অর্থনৈতিক ক্ষতি। গুজবের সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করলে এর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতিটি আরও অনেক বেশি।
ফরাসি প্রতিষ্ঠান বাস্টার ডট এআই জানাচ্ছে, গুজবের কারণে এক পক্ষ যেমন লোকসান গুনছে, অন্য পক্ষ কিন্তু মুনাফাও গুনছে। সেটা কেমন? তারা বলছে, এই ধারাটি একটি সমান্তরাল অর্থনীতিতে রূপ নিচ্ছে। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়ে বড় নির্বাচনগুলোকে কেন্দ্র করে প্রচার ও অপপ্রচার সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন খাত থেকে সারা বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানি আয় করেছে ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ২০১৬ সালে এক আমেরিকাতেই হয়েছে ২০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের প্রচার ব্যবসা। কিন্তু রাজনীতিই কেবল লক্ষ্যবস্তু নয়। ২০২১ সালে সাড়ে ৩ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছিল শুধু জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত ধারণা নিয়ে সংশয় ছড়াতে।
ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে, গুজব কোনো হেসে উড়িয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। নানা ধরনের আপাত নিরীহ এবং বোকা বোকা গুজবের পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে বিরাট কোনো অর্থনৈতিক–রাজনৈতিক পরিকল্পনা। আর প্রতিটি গুজবের সামাজিক প্রভাব তো আছেই। গুজব মূলত বিরাট জনপরিসরের মন ও চিন্তা নিয়ে খেলে। এই জনসমষ্টি কিন্তু ভোক্তাও। এখানে ভোক্তা বলতে শুধু পণ্যের ভোক্তা ধরে নিলে ভুল হবে। সংস্কৃতি, সাহিত্য, ধারণা, চিন্তা ইত্যাদিরও কিন্তু ভোক্তা আছে। গুজব মূলত এই ভোক্তা সমাজ নিয়ে কাজ করে। ফলে কোনো তথ্যকে গুজব হিসেবে চিহ্নিত করে চুপ করে বসে থাকার বা সামাজিক মাধ্যমে এ সম্পর্কিত পোস্টে ‘হাহা’ প্রতিক্রিয়া দিয়ে বা কোনো প্রতিক্রিয়া না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়াটা ওই গুজবকে আরেকটু শিকড় গাড়তে দেওয়ারই নামান্তর। এ ক্ষেত্রে উচিত ওই গুজবকে চ্যালেঞ্জ করা, যা মানুষকে সত্যাসত্য বুঝতে সহায়তা করবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনেরও অনেকটা দায়িত্ব আছে। কারণ, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বদলে যথাযথ তথ্য উপস্থাপন ও সেই তথ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার গুজব ছড়িয়ে পড়ার পথ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন