একটা সময় ছিল, যখন সংবাদপত্রের পাতায় ছাপা হওয়া একটি ভালো বা অনুসন্ধানী লেখা নিয়ে হতো তুমুল আলোচনা। সে সময় মূলত ছিল পাঠক। গত শতকের আশি বা নব্বইয়ের দশকের হিসাব করলেই এই চিত্রটি যে কারও মানসপটে ভেসে উঠবে। কিছুটা হলেও পড়াশোনার চল থাকা পরিবারে তখন পত্রিকা পড়া ছিল বেজায় উৎসাহের কাজ। নানা কিসিমের বইয়ের বাইরে সাদা-কালো কিংবা ঈষৎ রঙিন ৮/১০/১২ পৃষ্ঠার পত্রিকাই মেটাত দেশ ও দেশের বাইরে সম্পর্কে জানার সব ক্ষুধা।
নতুন শতকেই এ দেশে পড়ার পাশাপাশি রমরমা হলো দেখার যুগ। তৈরি হলো দর্শক শ্রেণি। সংবাদমাধ্যমের যাবতীয় গ্ল্যামার আটকে গেল ক্যামেরা আর বুমে। তবে তখনো সেই দেখানোর কিছুটা রাখঢাক ছিল। যা-তা দেখানো খুব একটা হতো না। বরং গুরুত্ব দেওয়া হতো সাংবাদিকতার মূলনীতিকেই। সেসব নীতি মেনেই একটি প্যাকেজ তৈরি করা হতো। প্রতিবেদকেরাও সেভাবেই রিপোর্টিং করতেন। এমন কিছু করার চেষ্টা করতেন না, যাতে সাংবাদিকদের ভাঁড় মনে হয়। তবে হ্যাঁ, কেউ কেউ যে ব্যতিক্রম ছিলেন না, সেটি বলা যাবে না। অবশ্য তা সংখ্যার বিচারে নগণ্যই ছিল।
এই দেখার যুগ শুরুর কিছুদিন পরই নতুন করে শোনার বিষয়টি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশে। কিছুদিন বেশ রমরমা চলে এফএম রেডিওগুলো। তবে ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়তে থাকায় দেখার যুগ আবার ফিরে আসে প্রবল প্রতাপে। সেটিই এখনো চলছে। তবে বদলে গেছে মাধ্যম। টেলিভিশনের বদলে এখন দেখার মাধ্যম হয়ে গেছে হাতে থাকা স্মার্টফোনটি। আর তাতেই কি বদলে গেল এ দেশের সাংবাদিকতার ধারা?
কোনো যদি-কিন্তু ও ব্যাখ্যা বাদে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে বললে, বলতেই হয় যে—হ্যাঁ। এ দেশের সংবাদমাধ্যম জগৎ এই ইন্টারনেট বুমের বিষয়টি ঠিকমতো ধরতেই পারেনি। অবস্থাটি একটু রূপক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাক। ধরুন, আপনি গ্রামের মেঠো পথে মোটরসাইকেল বা মোটরবাইক চালিয়ে অভ্যস্ত। কিন্তু ইন্টারনেটের দৌলতে বাজারে চলে আসা পাঠাও, উবারের দিনে এসে আপনার মনে হতেই পারে যে বাইক চালিয়ে দুই পয়সা রোজগার করলে ক্ষতি তো নেই! এই সমাজের উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের কতিপয় মানুষের হিসাব বাদ দিলে, আমাদের বেশির ভাগই খেটে খাওয়া মানুষ। ফলে উপার্জন বাড়ানোর একটি তাড়না মনের মধ্যে থাকেই। কিন্তু গ্রামের পথে মোটরবাইক চালানোর অভ্যস্ততা ও দক্ষতা নিয়ে আপনি যখন রাজধানী শহরে এসে পেশাদার রাইড শেয়ারিং–এ ঢুকে উপার্জনের চেষ্টা চালাবেন, তখন আপনাকে কিছুটা ধন্ধে পড়তেই হবে। যদি দক্ষতা ও নতুন বিষয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা আপনার থাকে, তবে নিশ্চয়ই উন্নতি হবে। নইলে পদে পদে পিছিয়ে পড়তে হবে। প্রথমত, আপনি নগরের ঢঙে সব নিয়ম মেনে মোটরবাইক চালাতে গিয়ে হিমশিম খাবেন। দ্বিতীয়ত, নগরের অধিবাসীদের সঙ্গে আচরণও ঠিক নাগরিকসুলভ ও পুরোপুরি সেবামুখী হবে না। আর এতে দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন আপনিই।
এ দেশের সংবাদমাধ্যমের জগৎ এখন ঠিক এই অবস্থাতে পড়েই হিমশিম খাচ্ছে। ডিজিটাল বা ইন্টারনেটভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে ফায়দা লুটতে গিয়ে ঘটনা ঘটছে সেই সোনার ডিম পাড়া হাঁসের পেট কেটে ফেলার মতো। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার), টিকটক বা ভিডিওভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব, এ দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোকে কিছু বিকল্প উপায়ের সন্ধান দিয়েছে। এসব বিকল্প উপায়ের মাধ্যমে পাঠক, দর্শক বা শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে পারে সংবাদমাধ্যমগুলো। মজার ব্যাপার লক্ষ্য করুন, পাঠক, দর্শক ও শ্রোতার কাছে সংবাদমাধ্যমের পৌঁছাতে আগে ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমের প্রয়োজন হতো। আর এখন এই তিনটি কাজই করা যাচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে। আর আচমকা সবকিছু একসাথে পেয়ে গেলে একটি শিশুও যেমন বিভ্রান্ত হয়ে যায়, তেমনি আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমও ‘আউলায়’ গেছে। সাংবাদিকতার মূলনীতির বদলে তাই ভিউ বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকে পড়া হচ্ছে প্রবলভাবে। এই ঝোঁকা এতটাই যে, তার সঙ্গে শুয়ে পড়ার পার্থক্য খুবই কম!
এখন কথা হলো, এই ভিউ বাণিজ্যের প্রতি অত্যধিক ঝুঁকে পড়ার ফলে সাংবাদিকতার মূলনীতি কীভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়ছে? মনে রাখতে হবে, বুম হাতে যে টেলিভিশন সাংবাদিকতা, সেটায় এ দেশে বেশির ভাগ সময়েই হয়েছে অনুভূতি জানার সাংবাদিকতা। অন্তত এইটিই আলোচিত বা সমালোচিত হয়েছে বেশি। বিষয়টি এমনই দাঁড়িয়ে গেছে যে, ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকতা করতে গেলে স্বল্প প্রস্তুতিও কাজে দেয় প্রায়সময়। এই বিষয়টিকে খানিকটা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণও করা হয়েছে। অগ্রজ সাংবাদিকেরাই সেটি করেছেন। ফলে অগভীর সাংবাদিকতা এ দেশে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে দৃঢ়ভাবে। তাৎক্ষণিকতার ফেরে পড়ে আমরা অগভীর বিষয়কে গভীরতার ওপরে স্থান দিয়েছি। এতে করে ভেসে থাকাটাই একমাত্র বাস্তবতা হয়ে গেছে এবং ডুবসাঁতার তার দাম হারিয়েছে। কারণ, আমরা সামগ্রিকভাবেই কোয়ালিটির তুলনায় কোয়ান্টিটিকে গুরুত্ব দিয়েছি বেশি। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই এ দেশের সংবাদমাধ্যম জগতের রুগ্ন আর্থিক অবকাঠামো এবং পেশাদারত্বের অভাব দায়ী। তবে সেই সঙ্গে জাতিগতভাবে হালকা বিষয়ের ওপর আমাদের অতিচর্চার অভ্যাসও প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে। আর তাতে আমাদের সংবাদমাধ্যমের অবস্থা হয়ে গেছে সস্তার তিন অবস্থার মতো!
ফলাফল হিসেবে তাই আমাদের সাংবাদিকেরা এখন ভূমিকম্প উপদ্রুত এলাকায় ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধার হওয়া মানুষের কাছেও অনুভূতি জানতে চান। লাইভ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করা সাংবাদিক কিছু না জেনেই অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসেন কোনো বিশেষজ্ঞ পেশাজীবীকে। আর ভ্লগারদের সাথে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠতে উঠতি সাংবাদিকেরা বিশ্বাসের সঙ্গে বিতর্কিতভাবে মেলাতে চায় সম্পূর্ণ বিপরীত বিষয়, যুক্তি বা প্রচলিত কোনো ধারণাকে। কারণ জলে–পেট্রলে মিলমিশ অসম্ভব। কিন্তু যেটা সম্ভব, সেটি হলো জলের উপরিতলে আগুন জ্বালানো! বিতর্ক এখানে মূল আকাঙ্ক্ষিত বিষয়। কারণ বিতর্ক তৈরি করতে পারলেই ইস্যু তৈরি হবে ডিজিটাল দুনিয়ায়। সাধারণ মানুষ হুমড়ি খেয়ে দেখবে তা। বাড়বে ভিউ, আসবে ডলার, পরিচিতি বাড়বে ‘ট্রেন্ডি’ হিসেবে। কারণ জাতিগতভাবেই আমরা জনপ্রিয়তা মাপি এখন ভিউ দিয়ে। তা নাটকে হোক, বা সাংবাদিকতায়। বেশি লোক দেখেনি, মানে তা আর পাতে তোলার যোগ্য নয়!
এই ইঁদুরদৌড়ে শামিল হতে গিয়েই আমাদের দেশের সাংবাদিকতার আজ এই হাল। আক্রান্তের পাশে দাঁড়ানোর বদলে আক্রান্ত বানানোই এখন লক্ষ্য কখনো কখনো। আর তা করতে গিয়েই সাংবাদিকেরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘আক্রমণ’ করছেন। সেটি অনেকটা পরিকল্পনা করেই যে করা, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই বাজারের হিসাবে আজ সাংবাদিকতা তাল মেলায়, সত্য সংবাদের মোড়কে চটুল বিজ্ঞাপনী প্রচার করে। সাংবাদিকতার নীতি–নৈতিকতা সেখানে ঝড়ে ওড়া শুকনো পাতা মাত্র।
এসবের কারণে কী হচ্ছে? প্রথমত, যেসব প্ল্যাটফর্ম ঘিরে এই ভিউ বাণিজ্য গড়ে উঠেছে, তারাও মাঝে মাঝে লজ্জা দিচ্ছে। নিজেদের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভিডিও সরায় ইউটিউব। নিয়মিতভাবেই এই কাজ করে প্ল্যাটফর্মটি। এ নিয়ে করা বৈশ্বিক তালিকায় অষ্টম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদশ। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই দেশের প্রায় দেড় লাখ ভিডিও মুছে ফেলেছে ইউটিউব। সব মিলিয়ে পুরো ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে আপলোড হওয়া ৬ লাখ ৩৮ হাজার ৪৪০টি ভিডিও অপসারণ করা হয়েছে। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালের শেষ তিন মাসে ভিডিও অপসারণের হার বেড়েছে ৩১ দশমিক ১৯ শতাংশ।
বলতেই পারেন যে, এই সব ভিডিও কি দেশি সংবাদমাধ্যমগুলো বানিয়েছে নাকি! নাহ্, অপসারণ করা সব ভিডিও সংবাদমাধ্যমের তৈরি নয়। কিন্তু একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যে অবশ্যই, তা বলাই যায়। কারণ নীতি–নৈতিকতা ভুলে এ দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে চটুল ও আক্রমণাত্মক কনটেন্ট তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তাতে এই বক্তব্য দেওয়াই যায়। এ ক্ষেত্রে আরেকটি হিসাব দিই। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার বলছে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচারের প্রবণতা বেশ কয়েক বছর ধরেই আলোচিত একটি বিষয়। ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) মোট ১৭৯টি বিষয়ে দেশের ১৭৬টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সর্বমোট ১৪২৭ টি প্রতিবেদনে থাকা ভুল (তথ্য, ছবি, ভিডিও) শনাক্ত করে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রিউমর স্ক্যানার। আর ২০২৩ সালের শেষ ছয় মাসের (জুলাই থেকে ডিসেম্বর) মধ্যে মোট ১১৮টি বিষয়ে দেশের ২০৫টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সর্বমোট ১৫৫১ টি প্রতিবেদনে থাকা ভুল (তথ্য, ছবি, ভিডিও) শনাক্ত করা হয়েছে।
হলপ করেই বলা যায় যে, এসব ভুলের সিংহভাগই হয়েছে ‘ভিউ’ ধরতে গিয়ে। এই ব্যাধি আসলে সংক্রামকও। আবার পুরো সংবাদমাধ্যম জগতই যখন এতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন তা থেকে কতিপয় ব্যতিক্রমদের বেঁচে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কেউ কম করে, কেউ বেশি, কিন্তু করতে হয় কম–বেশি সবাইকেই। নইলে যে পেট চালানোই দায়!
ওপরের এতটা লেখা পড়ার পর মনে হতেই পারে যে—এ দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো কি তবে নিজের চেষ্টাতেই বখে গেছে? না, একদমই না। যে দেশের বা সমাজের জনরুচি বা গণের ধারা যেমন, প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানও তেমনি হয়। তাই সংবাদমাধ্যমগুলোর সোশ্যাল মিডিয়া পেজের বিভিন্ন পোস্টের নিচে যেসব পাঠক, দর্শক বা শ্রোতা সাংবাদিকতার গুষ্ঠি উদ্ধারে লেগে পড়েন, তাদের জেনে রাখা উচিত যে, এ দেশের সাংবাদিকেরা অন্য দেশ বা সমাজ থেকে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করতে আসেননি। পাশের মানুষটা যে ধরনের খবর পড়ে বা ভিডিও দেখে বলে বিভিন্ন হিসাব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সাংবাদিককে জানায়, যেটায় ‘ভিউ’ বা সাড়া ভালো মেলে, যেটায় বিজ্ঞাপনদাতারা বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যাবে বলে আগ্রহ দেখায়—সাংবাদিকেরা সেসবের পেছনেই ছোটে বা ছুটতে বাধ্য হয়। কারণ সাংবাদিকেরও বেতনের টাকা দিয়ে চাল কিনেই খেতে হয়, মুফতে মেলে না।
তাই এ দেশের সাংবাদিকতার পরিবর্তন আনতে হলে এই জাতি–সমাজের ধ্যান–ধারণাতেও বদল আনা জরুরি। শুধু এক পক্ষের ওপর দোষ দিলে হবে না। তবে নিজের পরিবর্তন আনয়নে নিজেকে যেমন উদ্যোগী হতে হয় বেশি, তেমনি সাংবাদিকদেরও আগে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টাটা করতে হবে। চিলে আসলেই কান নিয়ে গেছে কিনা, সেটি জানতে জনগণ কিন্তু দিনশেষে সংবাদমাধ্যমের দ্বারস্থই হবে। সেই আস্থার জায়গা একবার হারিয়ে ফেললে, তা ফিরে পাওয়া কঠিন। তখন দেখা গেল, সাধারণের সাথে গলা মিলিয়ে সংবাদমাধ্যমও চিলের পেছনেই ছুটছে কেবল। কানে হাত দিতে আর খেয়াল থাকবে না কারোরই!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
আরও পড়ুন: