চলুন সবাই ছাগল হয়ে যাই!

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৭:২০ পিএম

শীতের রাত। একজন বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তার ধারে, ফুটপাতে। আশপাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষের সংখ্যা কম নয়। তিনি হাত বাড়িয়ে রেখেছেন। তবে তাঁর বাড়িয়ে রাখা হাত এড়াতে কসুর করছেন না মোটা জামা–জ্যাকেট পরা ভদ্রমানুষেরা। বাড়িয়ে রাখা সেই হাত কাঁপছে। শীতের শীতলতায়, নাকি বয়সের ভারে—সেটি বোঝা সত্যিই দুষ্কর!

এমন বয়স্ক অসহায় মানুষ আপনি রাজধানীর রাস্তায় ঢের পাবেন। এমন দশটা হাত পেলে, হয়তো একটা–দুটো বাদে বাকিগুলো আমরা এড়িয়েই যাই। আমাদের মনে হয়, কত আর! মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। কারণ এই দেশের বেশির ভাগ মানুষের আয় সীমিত, ব্যয়ও সীমাবদ্ধ। প্রতিদিনের নির্দিষ্ট খরচের সীমারেখা অনেককেই লক্ষণরেখার মতো করে মেনে চলতে হয়। তা না করে এই দুর্মূল্যের বাজারে যে উপায়ও নেই।

বাজার এ দেশে বরাবরই গরমে থাকে। কখনো পেঁয়াজ সেঞ্চুরি হাঁকায়, তো কখনো মরিচ। এই তো সেদিন চালের বাজার অস্থির হয়ে গেল। এর আগে মুরগি বা গরুর মাংসের বাজারও দরের দিক থেকে উল্লম্ফন দেখেছে। সরকারিভাবে কঠোর হলে আবার সেসব মিইয়ে গেছে। এক্ষেত্রে ডিমের বাজার হতে পারে নিখুঁত উদাহরণ। মানুষকে ডিম দিয়েই যে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, তা তো বিভিন্ন অনুসন্ধানে বের হয়েও এসেছে। কীভাবে একটি পণ্যের বাজারে দরে উঁচু–নিচু করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা যায়, তা আমরা তাই দেখেই ফেলেছি। এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, সত্যি সত্যি কোনো পণ্যের দাম যুক্তিযুক্তভাবে বাড়লেও, মানুষ তাতে আস্থা পায় না।

এমন অবস্থায় যেখানে নিজেদের টিকে থাকাটাই একটা নিয়ত সংগ্রামের বিষয়, সেখানে রাস্তার ধারে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধাও সহজে মনযোগ আকর্ষণ করতে পারেন না। তিনি দাঁড়িয়েছেন একটাই কারণে, অভাবে। কারণ ষাটোর্ধ্ব বয়সে কয়জনের আর উপার্জনের সক্ষমতা থাকে। কুশল জিজ্ঞাসায় জানা গেল, শরীরটাও ভালো নয় তাঁর। কিছু অসুস্থতার কারণে ঘরে চাল–ডাল নেই। একেবারে মোটা চালও আবার খেতে পারছেন না অসুস্থতার কারণে। কিন্তু যেখানে মৌলিক চাহিদাটুকুই চেয়েচিন্তে পূরণ করতে হচ্ছে, সেখানে একটু চিকন চালের আবদার কে পূরণ করবে!

শেষতক অবশ্য একজন ভদ্রমহিলা পূরণ করেছিলেন। হয়তো বাসায় থাকা নিজের মায়ের কথা মাথায় এসেছিল বলেই। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ওই বৃদ্ধার অসহায়ত্বটুকু। হায়, এভাবে আমরা সবাই যদি অন্যের অনুভূতিটুকু একটু হলেও বোঝার চেষ্টা করতাম, তাহলে কি ভালো না হতো! হয়তো তখন বাজার করতে গিয়ে একজন ছাপোষা কেরানিকে নিঃস্ব অনুভূতি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হতো না। প্রিপেইড গ্যাসের বিল নিয়মিত দিয়ে যাওয়া একজন ভোক্তা হুট করেই মিটার চার্জ দ্বিগুণ করে দেওয়ার বোঝা ঘাড়ে নিতে বাধ্য হতেন না। হয়তো তখন খাবারে ভেজাল মিশিয়ে বা ওজনে কম দিয়ে অন্যের পকেট ফুটো করার আগে কেউ একটু হলেও ভাবতেন। আকাশে মেঘ জমলেই সিএনজি অটোরিকশার ভাড়া দ্বিগুণ করে ফেলতেন না কোনো চালক। কারণ ব্যক্তিমাত্রই বোঝে নিঃস্ব হওয়ার অনুভূতি কতটা হতাশা জাগায়, আরেক ব্যক্তিকে কতটা অসহায় করে তোলে। তাই বুঝদার কেউ জেনে–বুঝে কি গলায় ছুরি ধরে অন্যের বুকে অসহায়ত্বের সুর গুঁজে দিতে পারে?

না পারারই কথা। তবে আমাদের বোঝাবুঝিতেই সমস্যা কিনা। আমরা, এ দেশের অধিবাসীরা জাতি–ধর্ম–বর্ণ–পেশা নির্বিশেষে একে–অপরকে আদৌ কতটুকু বুঝি বা বোঝার চেষ্টা করি, তা নিয়ে সংশয় প্রবল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হতেই পারে যে, গরু–ছাগলেরা হয়তো মানুষকে আরও বেশি বোঝে! তবে আশ্চর্যবোধক চিহ্ন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা এখন আসলেই কম। কারণ গবেষণাতেই যে দেখা গেছে, মানুষের দুঃখ–কষ্ট আসলেই বোঝে ছাগল। সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, হংকংয়ের সিটি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যালান ম্যাকএলিগটের নেতৃত্বাধীন একটি গবেষক দল ছাগলের মানসিক বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা চালান। তাতে দেখা গেছে, সুখী মানুষ, দুঃখী মানুষ কিংবা রাগান্বিত মানুষের কণ্ঠস্বরের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে ছাগল।

অথচ এ দেশে মানুষের কষ্ট বা ক্ষোভ মানুষ বুঝলে হয়তো বিশ্ব অর্থনীতির এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতেও একতরফা সিদ্ধান্তে ভাড়া বাড়িয়ে দিতেন না বাড়িওয়ালারা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বাড়ি ভাড়া সূচকের (এইচআরআই) ২০২৩-২৪ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসে সারা দেশে বাড়িভাড়া বেড়েছে ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাঁচাঘর বিভাগে ভাড়া সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, ১১২ দশমিক ৪৭। টিনের ঘর বিভাগে সূচক বেড়েছে ১১০ দশমিক ৮১। অথচ, এই দুই ধরনের ঘরেই নিম্নবিত্তের মানুষদের বেশি বসবাস। তাদের বেশির ভাগের অবস্থাই দিন আনি, দিন খাইয়ের মতো। কিন্তু তাদের ঘাড়েই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির এই বিশাল ভার।

এর বাইরে পাকা, আধা–পাকা বাড়ির ভাড়াও বেড়েছে। রাজধানীসহ সব বিভাগীয় শহরেই বাড়িভাড়া বেড়েছে। বিভাগীয় হিসাবে সবচেয়ে বেশি বাড়িভাড়া বেড়েছে ঢাকা বিভাগে। এর ভুক্তভোগী হিসেবে নিজের নামও নেওয়া যায়। করোনার বছর বাদ দিলে প্রতি বছরই এ দেশে বাড়িভাড়া বাড়ে। সদ্যই বাড়তি ভাড়া দিতেও হয়েছে। এই বাড়তি ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভোক্তার সঙ্গে কোনো আলাপ–আলোচনাও করা হয় না। স্রেফ জানিয়ে দেওয়া হয় সিদ্ধান্ত। ১৯৯১ সালের আইন সম্পর্কে কেউ জানে বলেও মনে হয় না, ওর প্রয়োগ তো দূর অস্ত! আলাপ করতে গেলে উল্টো অপদস্থ হতে হয়। এভাবে স্বেচ্ছাচারিতায় গা ভাসানো আমরাই আবার গণতন্ত্রের কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলি! 

অর্থাৎ, আমরাই আসলে একে–অপরকে চাপে ফেলি। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষটাকে টপকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে ল্যাং মারি, প্রয়োজনে গলায় পা দিতেও কসুর করি না। সেদিক থেকে দেখলে, এই দেশের মানুষেরাই একে–অন্যকে বোঝে খুবই কম! বোঝার চেষ্টাও হয়তো নেই।

এর চেয়ে ছাগল ভালো। উপরে উল্লিখিত গবেষণায় বিজ্ঞানীদের ধারণা, মানুষের সঙ্গে দলবদ্ধভাবে কাজ করার দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে গৃহপালিত প্রাণী বা পোষা প্রাণীরা আমাদের কণ্ঠস্বরের সংবেদনশীলতা বুঝতে শিখেছে। অন্তত মানুষের সুখ, দুঃখ–কষ্ট বা ক্ষোভ বুঝতে পারে ছাগল। বুঝতে পারার পরই তো সহমর্মী হবে, নাকি? কিন্তু আমরা দুপেয়ে মানুষেরাই যে আরেক হোমো সেপিয়েন্সকে বুঝতে পারি না। নইলে কি আর, এদেশের এত এত মানুষ অন্য মানুষের দেওয়া চাপ মাথায় নিয়ে কেবল গ্রাসাচ্ছাদনের অন্বেষণ করেই পুরো জীবনটা কায়ক্লেশে কাটিয়ে দিতে বাধ্য হয়?

সেক্ষেত্রে ছাগল হওয়া আসলে দোষের কিছু নয়। এমনিতেই এ দেশে গরু–ছাগলের সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছেই। এমন সংবাদও আমরা মাঝে মাঝেই সংবাদমাধ্যমে পাই। বাড়ুক বরং। মানুষের দুঃখ–কষ্ট বোঝার প্রাণি তো অন্তত পাওয়া গেল। এই ইট–কাঠের দুনিয়ায় আমার দুঃখ–কষ্ট–রাগ–ক্ষোভ কেউ যে বুঝতে পারে, সেই’বা কম কীসে!

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

সমাজের চোখে শিক্ষার্থী কী? এক কথায়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। একদিন তারা সমাজ গড়বে, রাজনীতি বলুন, অর্থনীতি বলুন, কিংবা চিকিৎসা-সশস্ত্রবাহিনী-প্রশাসন বলুন… পুরো সমাজের নেতৃত্ব দেবে, এই স্বপ্ন দেখে বলেই তো...
নারীদের ছাড়া এ দেশে কোনো আন্দোলন হয়নি। সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও নারীরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, লড়েছেন। কিন্তু তারপর? রাজনীতিতে আসা নারীকে লক্ষ্যবস্তু করে কুরুচিকর সব বক্তব্য দেওয়া কি...
এখনও যদি ভিন্নমত দমন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সামাজিক বিভাজন ও সম্প্রীতি নষ্টের মতো গুরুতর প্রশ্ন ওঠে, তাহলে ফ্যাসীবাদী সরকারের পতন হলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্রে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে? তবে...
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যায় বর্তমানে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি। সেই ২০২২ সাল থেকেই বেশি। একটি দেশের অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বিতর্কিত করে, দমন করার চেষ্টা করে, কেবলই পুরুষের যৌনবস্তু...
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজন জাহিদুল ইসলাম ও ফয়সাল আহমেদ রাব্বীর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
হবিগঞ্জে পৃথক অভিযানে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের মূল হোতাসহ মোট ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৯। সোমবার দুপুরে হবিগঞ্জে র‍্যাব-৯-এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‍্যাব কর্মকর্তারা।
বেলুচিস্তানের খোজদার জেলার জিদিতে চালানো এক অভিযানে ১৯ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যার দাবি করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। বেলুচিস্তান পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর