তিশা-মুশতাককে লজ্জা দিতে গিয়ে যাঁরা নির্লজ্জ হলেন

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৭:২০ পিএম

সম্প্রতি একুশের বইমেলায় একটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন উঠেছে। কেউ কেউ এ ঘটনা যাঁরা ঘটিয়েছেন, তাঁদের ‘বীর’ আখ্যা দিতে ব্যস্ত। এই সংখ্যাটাই আসলে বেশি। এক দম্পতিকে পাবলিক প্লেসে ‘লজ্জা’ উপহার দিতে পেরে তাঁরা অত্যন্ত গর্বিত। খুবই গুটিকয়েক মানুষ এর বিরোধিতা করছেন। হয়তো তাঁরাই বুঝতে পারছেন যে, লজ্জা পাওয়ার মতো কাজ আসলে কারা করেছেন!

বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, গত ৯ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার বইমেলাতে গিয়েছিলেন খন্দকার মুশতাক আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী তিশা। তাঁদের বিয়ে করার ঘটনা এর আগে আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। রাজধানীর একটি স্কুল-কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য ষাটোর্ধ্ব মুশতাক আহমেদ ওই প্রতিষ্ঠানেরই বয়স ২০ পার না হওয়া শিক্ষার্থী তিশাকে বিয়ে করেন। এ ব্যাপারে আইনি প্রক্রিয়ায় হাইকোর্ট খন্দকার মুশতাক আহমেদকে বলেছেন, ‘আপনি নৈতিকভাবে কাজটি ঠিক করেননি।’ খন্দকার মুশতাককে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন আদালত।

আইনিভাবে অবশ্য তিশা-মুশতাকের বিয়ে বৈধ বিবেচিত হয়। তিশা প্রকাশ্যেই এই বিয়েতে সম্মতির কথা বলেছিলেন। আর মুশতাক তো বলেছেনই। এখানে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য যে, নৈতিকভাবে বেঠিক কাজও কখনো কখনো আইনিভাবে বৈধ হতে পারে। নীতির বিষয়টি অনেক বেশি সমাজকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল, সমাজ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু আইন চলে যুক্তিতে, প্রমাণে। ফলে এই দুইয়ের মধ্যে তারতম্য ঘটতেই পারে।

শেষ পর্যন্ত বইমেলা থেকে তিশা-মুশতাককে বের হয়ে যেতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায়। ছবি: সংগৃহীত বেশ কিছুদিন ধরেই এই দম্পতি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বেশ সরব। তাঁদের উপস্থিতি প্রায়ই চোখে পড়ছিল। সেটি পুরোপুরিই তাঁদের বিষয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় কে কি করবে, তা নিয়ন্ত্রণের ভার বা দায়িত্ব আমাদের কারও হাতেই নেই। এগুলো ওপেন প্ল্যাটফর্ম, যে কেউ যা খুশি করতে পারে। এ সংক্রান্ত কোনো নীতিমালাও সেভাবে নির্দিষ্ট নয়। সহিংসতা বা বৈষম্যমূলক কিছু করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আছে বটে। সেটি একেক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিজেদের মতো করেই আরোপ করে। যদিও একে সোশ্যাল বলা হচ্ছে, তবে প্রচলিত সমাজ-কাঠামোর অনেক কিছুই এখানে সেভাবে খাটে না। আমাদের কারও যদি তিশা–মুশতাকের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের সরব উপস্থিতিতে অস্বস্তি অনুভূত হয়, তবে এড়িয়ে যাওয়াই সবচেয়ে উত্তম পন্থা। এ নিয়ে আপনি জ্ঞানচর্চামূলক দুটি কথা বলতেও পারেন। মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে তিশা-মুশতাক যে সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করে থাকেন, সেটি আমি-আপনিও করি। তবে কাউকে পাবলিক প্লেসে বা জনসমক্ষে জোর করে লজ্জা দেওয়ার অধিকার এ দেশের সংবিধান কাউকেই দেয়নি।

যদিও সেই কাজটিই করা হয়েছে গত শুক্রবার। তিশার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক নিযে মুশতাক আহমেদের লেখা বই প্রকাশিত হয়েছে এবারের বইমেলায়। স্ত্রীসহ তিনি মেলাতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের দুয়োধ্বনি দেওয়া হয়েছে, ‘ভুয়া ভুয়া’ ও ‘ছিঃ ছিঃ’ রবে অপমান করার প্রকাশ্য চেষ্টা চলেছে। এমনকি মেলায় আসা কিছু দর্শনার্থী শেষ পর্যন্ত তাঁদের ঘিরে ধরে জোর করে ‘লজ্জা’ অনুভব করানোর চেষ্টা করেছেন। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন ভিডিওচিত্র নানা সংবাদমাধ্যম প্রচার করেছে। তাতে সমাজ রক্ষার্থে সতত নিয়োজিত সেই ‘বীর’ যোদ্ধাদের বলতে শোনা গেছে—‘করছে কি ভাই, লজ্জা! কামডা কি ভাই, লজ্জা। ১৮-৬৫ লজ্জা। কেমনে মিলে? লজ্জা! ভাইরে ভাই, লজ্জা। সারা দেশের লজ্জা। বিশ্ববাসীর লজ্জা…’ ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত তিশা-মুশতাককে মেলা ছেড়ে বের হয়ে যেতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায়। তাঁরা এরই মধ্যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও অভিযোগ করেছেন গণমাধ্যমের কাছে।

বুঝে দেখেন—কী পরিমাণ লজ্জায় ডুবে গিয়েছিলেন এই সমাজের কিছু তরুণ! এ থেকে ভেসে উঠতেই হয়তো তাঁরা লজ্জা উপহার দিতে উঠেপড়ে লাগলেন। সোশ্যাল মব তৈরি করে সবাই মিলে ‘হুলিগান’ সাজলেন! এবং একটি পর্যায়ে সমাজ রক্ষার সেই মহান ব্রত পালনে সফল হলেন। হ্যাঁ, আপনার একটা কিছু অপছন্দ হতেই পারে। অসহ্য বোধও হতে পারে। কিন্তু পাবলিক প্লেসে বা ব্যক্তিগতভাবে বা শারীরিকভাবে আপনি কারও ওপর চড়াও হতে পারেন না। কারও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হয়ে উঠতে পারেন না, কাউকে অপমানও করতে পারেন না। সেই অধিকার এই দেশের কোনো নাগরিককেই দেওয়া হয়নি। সেটিই যদি হয়, তাহলে আর আইন-আদালতের প্রয়োজন কী?

বইমেলায় তিশা-মুশতাক দম্পতি। ছবি: সংগৃহীত সমস্যা হলো, এ দেশের অধিকাংশ নাগরিক ভোটাধিকার পাওয়ার বয়স পার হলেই নিজেদের এসব কাজ করার উপযুক্ত বলে ভাবতে শুরু করেন। অন্যকে নিয়ন্ত্রণের একটি উদগ্র বাসনা ভেতরে জেগে ওঠে। নিজেদের জন্য কেনা জুতোয় অন্যকে পা গলাতে বাধ্য করার প্রবণতা আর-কি। অথচ প্রচলিত সাংবিধানিক অধিকার বিবেচনায় নিলে, এই কার্যক্রমের কোনো বৈধতা নেই। তাই মনে রাখতে হবে, অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই নাগরিক কর্তব্যবোধের চর্চা নয়। আর এই সর্বনাশা পথের প্রতি একবার সমর্থন প্রকাশ করলে, সেই খড়গে আপনার নিজের গলাটিও কাটা পড়তে পারে যেকোনো দিন!

আর এ দেশের সমাজতাত্ত্বিকদের প্রতি একটি আরজি আছে। তাত্ত্বিকভাবে নাগরিক বলতেই সভ্য বলে বিবেচনা করা হয়। যদিও আমাদের দেশে তা বারবারই ভুল প্রমাণ হয়ে চলেছে। এ সমাজে এখন নাগরিকের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিবিভাগ করা অতীব প্রয়োজন। সেটি হলো—সভ্য নাগরিক ও অসভ্য নাগরিক। এ সংক্রান্ত একটি পরিমাপক পদ্ধতি প্রণয়ন করা এখন খুবই দরকার। তা না হলে এই পুরো দেশ ও সমাজই ধন্ধে পড়ে যাবে প্রতিনিয়ত। অন্যকে লজ্জা দিতে গিয়ে নিজেদের নির্লজ্জ হিসেবে প্রমাণ করা হুলিগানরাই হয়ে যাবে এ দেশের নাগরিক সমাজের প্রতিভূ। আমরা কি সেই লজ্জার মালা গলায় পরতে চাই?

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

আইনশৃঙ্খলা কেবল পুলিশ বা সরকারের একক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, কমিউনিটি এবং সাধারণ নাগরিক–সব পক্ষের সমন্বিত দায়িত্ব। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন, ধর্ষণ,...
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের এক সকাল। বন্যপ্রাণী দেখার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম ঢাকার উত্তরা, দিয়াবাড়ি, গোড়ানচটবাড়ী, আফতাবনগর ও খিলখেত এলাকায়। গত এক দশক ধরে ঢাকার প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে আমার পরিচয়। এই শহরের...
ধরুন, আজ হাসপাতালে এক শিশু জন্ম নিলো। সাথে সাথেই হাসপাতাল থেকে তার নামে একটি আইডি খোলা হবে। যা সরাসরি জাতীয় সার্ভারে আবেদন আকারে যুক্ত হয়ে যাবে। সরকার বা অ্যাডমিন কর্তৃপক্ষ সেই আবেদনের সব তথ্য...
ভারতে অধিকাংশ যন্ত্রপাতি ও পণ্য স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়, যেখানে ঢাকার এমআরটি প্রকল্পগুলোতে আন্তর্জাতিক মান পূরণকারী দেশ থেকে এসব উপকরণ আমদানি করা হয়। তাই এই ব্যয়ের তুলনা করলেই বাস্তব চিত্র...
বর্তমানে আবদুল গনি রোডে অবস্থিত সচিবালয়। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। ২০২৯ সালে নতুন জায়গায় অফিস শুরু হবে।...
এবার অমর একুশের বইমেলা শুরু হবে ৭ জানুয়ারি থেকে। মাসব্যাপী এ আয়োজন চলবে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। বাংলা একাডেমির এক বিজ্ঞপ্তিতে বইমেলার এ সময়সূচি জানানো হয়েছে। রোববার বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক...
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে অন্তত ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪৮ জনে। রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
হামের উপসর্গ নিয়ে রোববার ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়াল ১ হাজার ১৯৬ জনে। একদিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৩১৯ জন রোগী। 
লোডিং...
পঠিত নির্বাচিত

এলাকার খবর