বছর এগার আগে আমরা প্রথম জানতে পারি, আমাদের বড় ছেলে অটিজম আক্রান্ত। লড়াইটা আমাদের শুরু হয় তখনই। সেই সাথে মানুষ চেনা।
যেমন–বক্তৃতা দিয়ে মঞ্চ মাতিয়ে রাখা সংগঠক, পর্যটক, সমাজসেবী, ডাক্তার, স্কুল পরিচালক এবং থেরাপিস্ট–তেমনি আশপাশের আপনজন, প্রতিবেশি–গ্রাম থেকে শহর–সবাইকে আমরা ভিন্ন এক চেহারায় আবিষ্কার করি, যেটিকে এক কথায় বলা যায়–মুখ ও মুখোশ।
যাঁদের সুন্দর মুখের আড়ালে ভয়ঙ্কর অসুন্দর লুকায়িত। আমরা অন্য অনেকের মত থামিনি, লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি, এখনও–প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ।
সমাজের সংস্কৃতিজন, প্রগতিশীল, সুশৃঙ্খল বাহিনী পরিচালিত স্কুল, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের বিশেষায়িত স্কুল; গানের শিক্ষক, খেলার কোচ, জিম ইন্সট্রাক্টর, সুইমিং পুল ব্যবস্থাপক–এমন কোনো মানুষ নাই যাঁদের সহায়তা আমরা চাইনি–হাতের কাছে থাকা, সামর্থ্যে কুলায়–এমন সব ব্যায়াম, থেরাপি, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন এবং দক্ষতা উন্নয়ন সুযোগ আমরা উল্টে পাল্টে দেখেছি, এখনও দেখছি–সময় থেমে থাকে না। সব অভিজ্ঞতা খারাপ বলব না, তবে ভালো অভিজ্ঞতা শতাংশে গুনলে শূন্য দশমিকের পর বহু শূন্য পরে ১/২ শতাংশ।
আমাদের ছেলে নাজিব এখন ১৫ বছরের কিশোর। যাকে আমরা পরম করুণাময়ের কাছ থেকে পেয়েছি অনন্য এক উপহার হিসেবে। মহান প্রতিপালকের দরবারে শুকরিয়া, আমরা তার মাধ্যমে সমাজে নতুন এক জীবন পেয়েছি।
আজ ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস, এই উপলক্ষে আমাদের লড়াইয়ের একটুখানি শেয়ার করলাম। কোনো সহানুভূতি চাইতে নয়–কিছু বিষয় মনে করিয়ে দিয়ে বলছি, অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষদের প্রতি আপনার-আমার আচরণ হোক মানুষের মত। তাচ্ছিল্য, উপহাস, অবহেলা, অযত্ন করলে তারা তা বোঝে, কেবল প্রকাশ করতে পারে না। প্রাপ্য সম্মান, একটু যত্ন-ভালোবাসা দিলে সমাজে তারাও বোঝা নয়, সম্পদে রূপান্তরের লড়াইয়ে শামিল হতে পারবে। তাদেরও দক্ষতা আছে, আছে কাজে ডুবে থাকার ইচ্ছে, সেজন্য তাদের তৈরি করতে আমাদের হাতে হাত রাখতে হবে। তাও যদি সম্ভব না হয়–তবে, অন্তাত তাদের উত্যক্ত করা থেকে বিরত থেকেও সহযোগীত হতে পারেন। আপনি আমি নিজে এটি প্রাকটিস করি, আপনার স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সন্তানকে এটি করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। এতে আমাদের সবারই মঙ্গল।
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু, কিশোর ও ব্যক্তির পরিবার লড়ছে, আপনিও তাদের অধিকারের লড়াইয়ে শামিল হোন। তা করার জন্য খরতাপে পুড়তে হবে না, করতে হবে না রাস্তায় হাঙ্গামা–শুধু আপনার-আমার সংবেদনশীল আচরণ আর একটু ধৈর্য দিয়েই তা সম্ভব। তাহলেই বদলে যাবে, আমাদের শিশুদের জীবন। যেসব বাবা-মা আপনার-আমার সুস্থ সন্তানের অসুস্থ বুলির ভয়ে, সঙ্কোচে তার বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সন্তানকে বাইরের আলো বাতাসে বের করতে ভয় পান; রেস্টুরেন্টে, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যেতে অস্বস্তিবোধ করেন-- খেলার মাঠে, গানের স্কুলের বাইরে জড়োসড়ো হয়ে শিক্ষকের বিরক্তিকর চেহারা দেখার আতঙ্কে সময় কাটান–তাদের স্বস্তি দিন। আমার-আপনার আচরণ যতটা মানবিক হবে, অটিজম আক্রান্ত মানুষেরাও তত সহজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।
লেখক: সাংবাদিক