বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মান নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরেই গভীরভাবে অসন্তুষ্ট। কারণ একটি শিশুর শিক্ষা ও ব্যক্তিত্বের প্রকৃত ভিত গড়ে ওঠে এই সময়টাতেই। জীবনের এই পর্যায়ে সে শুধু বইয়ের জ্ঞানই অর্জন করে না—বরং তার চিন্তাভাবনা, নৈতিকতা, ভাষা দক্ষতা এবং সামাজিক বোধ তৈরি হতে শুরু করে। অথচ বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই স্তরটিই দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যার মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে।
স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত কত সরকার এসেছে, কত জ্ঞানী মন্ত্রী ও আমলা দায়িত্ব পালন করেছেন শিক্ষাকে শিক্ষণীয় করতে। কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় দূরদর্শী ও টেকসই উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়েনি। নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় প্রায়ই দেখা যায় নানা প্রশাসনিক বা পদ্ধতিগত পরিবর্তনের বিষয়, কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত মান উন্নয়নের প্রশ্নটি সব সময়ই আড়ালে থেকে যায়।
বর্তমান সরকারের কাছেও মানুষের প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বড় একটি আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে—কোমলমতি শিশুদের স্কুলে ভর্তি হবে পরীক্ষার মাধ্যমে, নাকি লটারির মাধ্যমে। প্রশ্ন হচ্ছে, ভর্তি পদ্ধতির এই পরিবর্তন কি শিক্ষার মান বাড়াতে পারে? একটি শিশুর প্রকৃত শিক্ষা নির্ভর করে তার শিক্ষক, শিক্ষার পরিবেশ, পাঠ্যক্রম এবং শেখার পদ্ধতির উপর। ভর্তি পদ্ধতি পরিবর্তন করে শিক্ষার মৌলিক সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়।
একইভাবে কোচিং সেন্টার বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েও বেশ আলোচনা চলছে। কিন্তু কোচিং সেন্টার কেন তৈরি হয়েছে—সেই মূল প্রশ্নটি কি আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছি? যখন বিদ্যালয়ের পাঠদান শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না, তখনই অভিভাবকরা বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হন। তাই কোচিং সেন্টার বন্ধ করাই যদি লক্ষ্য হয়, তবে কি সমস্যার মূল সমাধান হয়ে যাবে?
আমরা যদি সত্যিই একটি দক্ষ, সৃজনশীল এবং নৈতিক জাতি গড়ে তুলতে চাই, তাহলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ এই স্তরেই ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি হয়।
প্রথমত, সব শিশুর জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই। শিক্ষা এমন একটি মৌলিক অধিকার, যেখানে ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য থাকা উচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষকতা পেশাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় করার দায়িত্বও সরকারের। এজন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, সম্মানজনক বেতন এবং উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে দেশের সেরা মেধাবীরাও শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী হবে। একজন দক্ষ শিক্ষকই একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে পারেন।
তৃতীয়ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বেসরকারি স্কুল বা কিন্ডারগার্টেনের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
পাঠ্যক্রমেও প্রয়োজন যুগোপযোগী পরিবর্তন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিশুদের নীতিনৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ শেখানোর পাশাপাশি মাতৃভাষা বাংলার দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। এর সঙ্গে একটি বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি এবং একটি ঐচ্ছিক বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ রাখা যেতে পারে। এই ভাষা শিক্ষাই এক সময় তাকে অনেক এগিয়ে রাখবে। পাশাপাশি বাস্তবমুখী ও জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, বাস্তব জীবনে চলার জন্যও প্রস্তুত হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষা কখনোই পণ্য হতে পারে না। শিক্ষাকে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার বাজারে ছেড়ে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়। বরং মানসম্মত, সমান ও মানবিক শিক্ষা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। একটি সুস্থ, সচেতন ও উন্নত জাতি গড়ে তুলতে হলে শিক্ষার ভিতকে শক্ত করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
আমাদের দেশের অনেক ক্ষেত্রই ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছেছে। তাহলে শিক্ষাকে সেই মানে উন্নীত করতে কি সত্যিই আমাদের দেউলিয়া হয়ে যেতে হবে? আমি মনে করি, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে একন একটা বড় সুযোগ। তাই ইতিহাসের পাতায় সম্মানের সঙ্গে স্থান করে নেওয়ার সেই সুযোগটা কি নীতিনির্ধারকরা নেবেন? না কি প্রজন্ম ঘুরে নতুন নতুন প্রশ্নের মধ্যেই থাকবেন?
লেখক: কান্ট্রি এডিটর, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



