হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত 'রুবিওলা' নামক আরএনএ (RNA) ভাইরাসের কারণে এই রোগ হয়। বর্তমানে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ দেখা দেওয়ায় অভিভাবকদের সচেতনতা জরুরি হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের এমডি রেসিডেন্ট ডা. জ্ঞানব্রত শুভ্র হামের বিস্তারিত লক্ষণ ও প্রতিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন।
কোন বয়সে ঝুঁকি বেশি?
সাধারণত ৬ মাস থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বিরল, কারণ মায়ের গর্ভ থেকে প্রাপ্ত অ্যান্টিবডি শিশুকে সুরক্ষা দেয়।
হামের লক্ষণসমূহ
আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ৮ থেকে ১২ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়।
- শুরুতে প্রচণ্ড জ্বর, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং শুকনো কাশি থাকে।
- জ্বরের ৩য় বা ৪র্থ দিনে শরীরে লালচে বা বেগুনি রঙের ছোপ ছোপ ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দেয়।
- এই র্যাশ সাধারণত চুলের রেখা (Hairline) বা কানের পেছন থেকে শুরু হয়ে মুখ, ঘাড়, বুক ও পিঠ হয়ে হাত- পায়ে ছড়িয়ে পড়ে।
- মাড়ির গোড়ায় ছোট সাদা স্পট দেখা দিতে পারে।
যেভাবে ছড়ায়
হাম মূলত একটি বায়ুবাহিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত পৃষ্ঠ (যেমন: দরজার হাতল, খেলনা) স্পর্শ করে মুখে বা চোখে হাত দিলেও ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ভাইরাসটি খোলা স্থানে প্রায় ২ ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকে।
জটিলতা ও বিপদচিহ্ন
প্রায় ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে হাম থেকে নিউমোনিয়া, কানের প্রদাহ, মস্তিষ্কের প্রদাহ বা চোখের সমস্যা হতে পারে। যদি শিশুর শ্বাসকষ্ট হয়, বুক দেবে যায়, শিশু নেতিয়ে পড়ে কিংবা খিঁচুনি হয়, তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
প্রতিরোধে টিকা
হাম প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো টিকা। সরকারিভাবে ইপিআই (EPI) কর্মসূচির আওতায় ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ এমআর (MR) ভ্যাকসিন বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
- ২ বছর পার হয়ে গেলেও চিকিৎসকের পরামর্শে ২ ডোজ টিকা দেওয়া সম্ভব।
- যাঁরা আগে টিকা নেননি, তাঁরাও বিশেষ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে টিকা নিতে পারেন।
- তবে গর্ভবতী নারী বা যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত কম (Immunocompromised), তাঁদের এই টিকা দেওয়া যায় না।
হাম হলে করণীয়
হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তবে সঠিক পরিচর্যা জরুরি:
- শিশুকে প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার ও পানি পান করাতে হবে।
- জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল এবং শরীর হালকা গরম পানি দিয়ে মুছিয়ে দিতে হবে।
- হামের কারণে শরীরে ভিটামিন 'এ'-র ঘাটতি হয়, তাই চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন 'এ' ক্যাপসুল ও সমৃদ্ধ খাবার দিতে হবে।
- কাশির জন্য মধু বা তুলসী পাতার রস খাওয়ানো যেতে পারে।
সর্বোপরি, আতঙ্কিত না হয়ে সময়মতো শিশুকে টিকার দুটি ডোজ সম্পন্ন করাই হাম থেকে সুরক্ষার প্রধান উপায়।
লেখক: বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনিস্টিটিউটের একজন চিকিৎসক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



