বুয়েটের ‘ভালো’ শিক্ষার্থীরা কি রাজনীতি করলেই ‘নষ্ট’ হয়ে যাবে

দেশের উচ্চশিক্ষায়তন নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। দেশের পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা বা গবেষণা নয়, অন্য কিছুর জন্য বারবার সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। কোনোটিতে ঢি ঢি পড়ে যাচ্ছে, তো কোনোটিতে চলছে তুমুল তর্ক। সর্বশেষ তর্কের কেন্দ্রে ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। বিষয়–রাজনীতি। কিন্তু আসলেই কি রাজনীতি নিয়ে আলোচনা চলছে, নাকি রাজনীতি শব্দটির আড়ালে ক্ষমতা ও আধিপত্য নিয়ে বিতর্ক চলছে?

প্রসঙ্গটিতে যাওয়ার আগে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে গত কয়েক মাসে চলা আলোচনার দিকে তাকানো যাক। দেশের স্বনামধন্য চারটি বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনার কারণে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে এই চার বিশ্ববিদ্যালয়ই আলোচনায় এসেছে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন নিপীড়নের ঘটনার কারণে। অভিযোগের তালিকায় কে? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। অথচ এসব বিশ্ববিদ্যালয় আলোচনায় আসার কথা ছিল গবেষণা বা লেখাপড়া-বিষয়ক কোনো কারণে। সেটা যে একেবারে হয় না, তা নয়। তবে ইতিবাচক সেসব বিষয় নিয়ে সেভাবে আলোচনা হয় না। কেন হয় না, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে এ অঞ্চলের মানুষের প্রবণতা নিয়ে আলাপ পাড়তে হবে। ওটা এখন থাক।

এরই ধারাবাহিকতায় আলোচনায় এসেছে বুয়েট। বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। আন্দোলনের বিষয়–বুয়েট ক্যাম্পাসকে রাজনীতিমুক্ত রাখা। এর বিপরীতে সভা-সমাবেশ করছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। তাদের ভাষ্য, রাজনীতি থাকতে হবে। বিষয়টি আদালত, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তর্কে যোগ দিয়েছেন বুয়েটের বর্তমান তো বটেই, সাবেক শিক্ষার্থীরাও। পাল্টা হিসেবে দেশের বিদ্বৎমহলও একের পর এক মত-দ্বিমত হাজির করছেন। সংবাদমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম–সবখানে এ সম্পর্কিত আলোচনায় একটা দ্বিধাবিভক্তি দেখা যাচ্ছে। কেউ বলছেন, রাজনীতি করার অধিকার সবার আছে। তো কেউ বলছেন, যে রাজনীতি সংঘাতের শিক্ষা দেয়, শিক্ষার্থীদের কাউকে হত্যাযোগ্য, আবার কাউকে হন্তারকে পরিণত করে, সে রাজনীতি থাকার কোনো দরকার নেই।

রাজনীতি কী
পুরো আলোচনাতেই ‘রাজনীতি’ শব্দটির প্রয়োগ হলেও রাজনীতি বিষয়টিকেই এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। কেন, কীভাবে-সে আলোচনায় ঢোকার আগে আরও কিছু বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া যাক।

প্রথমেই আসা যাক ‘রাজনীতি’ শব্দটির কাছে। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষে রাজনীতি শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হচ্ছে রাজ্যশাসনবিধি। অর্থাৎ, একটি রাজ্য বা রাষ্ট্র কী নীতিতে চলবে, তা নিয়েই কাজ করে রাজনীতি। আগে রাজাশাসিত দেশে রাজা আরোপিত বা রাজপ্রাসাদ গৃহীত এবং সেখান থেকে প্রচারিত নীতিই রাজনীতি নামে পরিচিত ছিল। রাজশাসন এখন নেই। সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নের মধ্য দিয়ে সেই ধারায় বদল হয়েছে। কিন্তু রাজনীতি শব্দটি রয়ে গেছে। যদিও বর্তমান বাস্তবতায় এই শব্দের বিকল্প হিসেবে ‘জননীতি’ বা ‘গণনীতি’ শব্দ গ্রহণের বিষয়ে অনেকে প্রস্তাব করেছেন। কিন্তু তা হয়নি। সে যাক, সে বিতর্ক আলাদা। আপাতত ‘রাজনীতি’ শব্দ নিয়েই থাকা যাক।

হরিচরণের ব্যাখ্যা জানা গেল। মোটাদাগে রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতি হলো দলীয় বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ক্ষমতা সম্পর্কের বণ্টন, সম্পদ ও অর্থনৈতিক বণ্টন সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্মকাণ্ড। এর মধ্য দিয়ে সমাজের বিভিন্ন অংশ পরস্পরের মধ্যকার স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্কের একটি কাঠামো নির্ধারণ করে, অধিকার সম্পর্কিত নানা প্রশ্ন উত্থাপন ও তার জবাব খোঁজার চেষ্টা করে।

এ তো গেল বাংলা ‘রাজনীতি’ শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিষয়। এর ইংরেজি যে ‘পলিটিক্স’–তার ক্ষেত্রে বিষয়টি কেমন? অক্সফোর্ড ডিকশনারি বলছে, পলিটিক্স হলো সরকার সম্পর্কিত কলা বা বিজ্ঞান। একইসঙ্গে তারা বলছে, সরকারি নীতিকে দিকনির্দেশনা দেওয়া বা তাকে প্রভাবিত করার কলা বা বিজ্ঞানই হলো পলিটিক্স। ফলে শব্দগত দিক থেকেই ইংরেজি এই পলিটিক্স আদতে বাংলায় রাজনীতির ভাবের সাথে মেলে। এটি হলো সেই বিজ্ঞান বা কলা বা কৌশল বা পথ, যার মাধ্যমে ক্ষমতা কাঠামোর ওপর থেকে নিচের মধ্যে একটি সংযোগ রচিত হয়।

বুয়েট শিক্ষার্থীরা তবে কী করছেন
সাধারণ শিক্ষার্থী নামে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাঁরা তাঁদের ক্যাম্পাসে কোনো রাজনীতি চান না। বিষয়টি কীভাবে সামনে এল? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যেতে হবে আবরার ফাহাদের কাছে। সামাজিক মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে দেওয়া পোস্টের কারণে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করেছিল বুয়েট ছাত্রলীগের কিছু নেতা-কর্মীরা। সে ঘটনায় উত্তাল হয়ে ওঠে বুয়েট। শুধু বুয়েট কেন, দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, বুদ্ধিজীবীরা এর প্রতিবাদ করেন। এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের বিচারও হয়েছে দ্রুততম সময়ে। সে সময়ই বুয়েট কর্তৃপক্ষ তাদের ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধের ঘোষণা দেয়, যা ছিল বাংলাদেশ সংবিধানে স্বীকৃত নাগরিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক। ফলে আদালতে এ সম্পর্কিত যেকোনো আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই এটি বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। হয়েছেও তাই।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা ও বুয়েট শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ হোসেনের সাথে বুয়েটে গেছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতিসহ আরও কয়েকজন নেতা। এ প্রেক্ষাপটে আন্দোলন শুরু করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাঁদের আন্দোলনের মুখে ইমতিয়াজের হলের সিট বাতিল করা হয়। তাঁর স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে এবং বুয়েটে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন চলতে না পারে, সে দাবিতে আন্দোলন করছেন এখন তাঁরা। কারণ এরই মধ্যে এক রিটের বিপরীতে উচ্চ আদালত বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ বিষয়ক আদেশে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। আগেই বলা হয়েছে, বুয়েটের আগের সিদ্ধান্তটিই এমন ছিল যে, এ ধরনের যেকোনো পদক্ষেপে তা বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা।

মেধাবীরা কি রাজনীতি করবেন
বলা হচ্ছে দেশসেরা শিক্ষার্থীরা বুয়েটে ভর্তি হন। তাঁদের পড়াশোনা ও গবেষণা করা উচিত। অবশ্যই এটাই উচিত। ছোট থেকেই আমরা শিখে এসেছি, ছাত্রনং অধ্যয়নং তপঃ। ছাত্রমাত্রই তপস্যা তো করতেই হবে। সেটা জ্ঞানের তপস্যা। তাহলে প্রশ্ন হলো–কারা রাজনীতি করবেন? যাদের জ্ঞান নেই তাঁরা?

শেষের প্রশ্নটির উত্তর দিতে গেলেই কিন্তু থমকে যেতে হচ্ছে। কারণ, জ্ঞানগম্যিতে পিছিয়ে থাকা একদল লোক দেশ চালাবে, যেখানে জ্ঞানীরা সব ঘুরে বেড়াবে। জ্ঞানীদের নিয়ন্ত্রণ করবে একদল জ্ঞানহীন মানুষ–বিষয়টি কেমন হয়ে গেল না?

সামাজিক মাধ্যমে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি থাকা–না থাকা নিয়ে বেশ বিতর্ক হচ্ছে। এটা কোনো কোনো সময় উত্তপ্ত বিতর্কে রূপ নিচ্ছে। কখনো কখনো অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আক্রমণের ঘটনাও ঘটছে। দেশের শীর্ষ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা এক অভাবনীয় কদর্য বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। অনেকেই একচেটিয়া কথা বলছেন। বুয়েটের কারও কারও পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঢাকাসহ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, যারা কথা বলছেন, তাঁদের বুয়েট নিয়ে কথা বলারই যোগ্যতা নেই। কারণ মেধার অভাব!

বাংলাদেশের বিশেষত পুরোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কারও ভর্তি হওয়াটা যে কত কঠিন, তা প্রতি বছর হওয়া ভর্তি পরীক্ষাগুলোর পরই বোঝা যায়। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরাই এ নিয়ে তর্ক জুড়েছেন।

দুঃখের বিষয় হলো, শিক্ষা ও গবেষণা কোনো ক্ষেত্রেই কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান খুব একটা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের নয়। এমনকি বুয়েটের অবস্থাও একই বলা চলে। সেটা কেমন?

টাইমস হায়ার অ্যাডুকেশনের চলতি বছর প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। বিশ্বের মোট ২৬৭১টি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থান দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৮০১–১০০০তম অবস্থানে। বুয়েট আছে ১০০১–১২০০তম অবস্থানে। এশিয়াতে ২০২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের অবস্থান যথাক্রমে ১৮৬তম ও ৪০১–৬০০ এর মধ্যে। এশিয়ায় জাহাঙ্গীরনগরের অবস্থান জানা যায়নি।

বিজ্ঞান গবেষণা নিয়ে র‍্যাংকিং প্রকাশ করে এডি সায়েন্টিফিক ইনডেক্স। সেখানে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে তুলনামূলক ওপরের দিকে থাকা চারটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো–ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে সবার ওপরে আছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, যার বৈশ্বিক অবস্থান ২৭৩৮, আঞ্চলিক অবস্থান ৭৪৮। এ ক্ষেত্রে বুয়েটের অবস্থান যথাক্রমে ২৯৪৫ ও ৮৩৭; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯৪৭ ও ৮৩৯ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯৬১ ও ৮৪৬। এ ক্ষেত্রে আবার বিজ্ঞানী সংখ্যার দিক থেকে এগিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটিতে বিজ্ঞানী রয়েছেন ৬৫৮ জন। বুয়েট, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগরে এ সংখ্যা যথাক্রমে ৪৯৪, ২৩৯ ও ১৭১ জন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকা বিজ্ঞানীদের মধ্যে র‍্যাংকিংয়ে এগিয়ে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী মতিন আহমেদ। তাঁর র‍্যাংক ৩৮৯০৭। তারপরই আছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এ মামুন, যার র‍্যাংক ৫০৬০২। বুয়েটের সৈয়দ মিথুন আলী আছেন তৃতীয় অবস্থানে, তাঁর র‍্যাংক ৯০১৫৭। তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে আছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এম আলী আকবর, যার অবস্থান ৯১৪৫৪।

ফলে বোঝাই যাচ্ছে, বুয়েট হোক বা অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই হোক–মেধাবীদের অবস্থা আসলে ভালো নয়। বিজ্ঞান গবেষণায় দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই ঠিক কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। এই সংকটের সাথে গবেষণা তহবিল থেকে শুরু করে আরও অনেক অবকাঠামো ও অন্যান্য গবেষণাবান্ধব নীতি জড়িত। আর এ পুরো বিষয়টিই জড়িত রাষ্ট্রের সম্পদ, অর্থ ও কর্মনীতি এবং তার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে, যার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি রাজনীতিকদের হাতে। এই রাজনীতিকদের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত মেধাবী এবং জ্ঞানপিপাসুদের হিস্যা না থাকলে, তাঁরা তাঁদের দাবি, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার তীব্র আকাঙ্ক্ষা মেটানোর রসদ পাবেন না। এই রসদ তখন চেয়ে-চিন্তে এবং অনেকটাই অন্যের বদান্যতায় পেতে হবে। বরাবরই প্রত্যাশা করতে হবে যে, নীতিপ্রণেতাদের মধ্যে বিজ্ঞান, কলা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বোঝেন এবং এ নিয়ে কাজ করতে আন্তরিক কেউ থাকবেন এবং অতি অবশ্যই তিনি সৎ হবেন, যাতে তিনি এই রাজনীতিবর্জিত জ্ঞানপিপাসুদের মধ্যে থাকা জ্ঞানের তীব্র ক্ষুধাটি অনুধাবন করতে পারেন। তেমনটি না পেলে হা-হতোশ্মি। দ্বিতীয়টি আমরা প্রত্যক্ষ করছি জন্ম থেকেই।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে কী হচ্ছে
প্রথমেই একটি বইয়ের কথা দিয়ে শুরু করা যাক। ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত বইটির নাম ‘স্টুডেন্ট পলিটিক্স’। লেখক দোনাতেল্লা ডেলা পোর্টা, লরেঞ্জো সিনি ও সিজার গুজম্যান। বইটিতে তাঁরা সুষ্পটভাবে যে কথা বলছেন, ছাত্ররাজনীতি আছে এবং নেই–এ দুইয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়। দেশে দেশে ছাত্ররাজনীতির নানা রকমফের তুলে ধরে তাঁরা বলছেন, মোটাদাগে ছাত্ররাজনীতি থাকলে তা কখনো কখনো সহিংস হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে কিছু দেশে। তা যদি হয় ছাত্রসংসদকেন্দ্রিক তবে, সে আশঙ্কা অনেকখানি কমে আসে। আর ছাত্ররাজনীতি না থাকার অর্থ হচ্ছে দীর্ঘসূত্রিতায় ছাত্রদের অধিকার, দাবি ইত্যাদি নিয়ে নিজ বিশ্ববিদ্যালয় বা রাষ্ট্র বা সমাজের সাথে আলোচনার কোনো মাধ্যমই না থাকা। ফলে শিক্ষার্থীরা এক রকম ফাঁদে পড়া প্রাণীতে পরিণত হয়।

নয়া উদারবাদী বিশ্বব্যবস্থায় উচ্চশিক্ষা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো কখনো কখনো ছাত্ররাজনীতি বন্ধের ব্যবস্থাপত্র দিয়েছে। তারা এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে জ্ঞান নয় চাকরি ক্ষেত্রকে বিবেচনা করেছে। এই প্রবণতা থেকে পশ্চিমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। শুধু পশ্চিম কেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলেই ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে তা চর্চার দরজা খুলে যাচ্ছে। ভয়েস অব আমেরিকার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নীতিপ্রণেতাদের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে।

সম্প্রতি পিউ রিসার্চ সেন্টার সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের মানের অবনমন কেন হচ্ছে এবং করণীয় কী–তা নিয়ে জরিপভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিশ্বের ২৪টি দেশের ৩০ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে চালানো এই জরিপে দেখা গেছে অংশগ্রহণকারীদের ৭৪ শতাংশই জানাচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে না। আর ৪২ শতাংশই বলছে, কোনো রাজনৈতিক দলই তাদের মতের সাথে মেলে না।

এই প্রেক্ষাপটেই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে নামকরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনৈতিক চর্চা বাড়ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার জানাচ্ছে, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে গণতন্ত্রের মানোন্নয়নে আসা পরামর্শগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, রাজনীতির সাথে নাগরিকদের, বিশেষত তরুণদের আরও বেশি করে সম্পৃক্ত হওয়া। অর্থাৎ, তরুণ ও নতুন চিন্তার মেধাবীদের সংযোগের মাধ্যমেই বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ ঘটতে পারে গণতন্ত্রের।

তাহলে উপায়?
ছাত্রদের তো বটেই দেশের প্রতিটি নাগরিকের রাজনীতি করবার অধিকার আছে। কোনো উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা তার শিক্ষার্থীরা যদি দেশের প্রচলিত এবং অনেকের ভাষায় ‘দুর্গন্ধযুক্ত’ রাজনীতি চলতে দিতে না চান, তবে তাদের অবশ্যই এমন কোনো প্রস্তাব উপস্থাপন করা উচিত, যেখানে শিক্ষার্থীদের সংগঠন করার এবং রাজনৈতিক মত-দ্বিমত প্রকাশের পথটি খোলা থাকবে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রসংসদ নির্বাচন চালু হয়ে আবার বন্ধ এখন। অথচ ছাত্রসংসদ না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একচেটিয়া কোনো সিদ্ধান্তের বিপরীতে কথা বলবার জায়গাটি হারিয়ে ফেলবে তারা।

বুয়েটের শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলন করছেন, তাঁদের আবেগকে আমলে নিয়েই একে প্রশ্ন করা যায়। প্রশ্ন ওঠে–আবরার ফাহাদের হত্যার জন্য বুয়েট প্রশাসন কেন এবং কী কারণে দায়ী নয়? ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ বা ভ্রাতৃ সংগঠন হলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন যখন তাদের ছাড়পত্র দিয়ে বসে, তখন এ ধরনের হত্যকাণ্ডে প্রশাসনকে কেন কাঠগড়ায় তোলা হবে না? যে দল ক্ষমতায়, সে দলের ছাত্র সংগঠন কী প্রক্রিয়ায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ কর্তৃত্ব নিতে পারে? আবরার ফাহাদের মৃত্যুর আগে বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের নিপীড়ন ও আধিপত্যমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিরোধে কেন কিছু করেনি? সাধারণ নামের শিক্ষার্থীরা কেন বরাবর এ ধরনের আধিপত্যকামী সংগঠনের সামনে নতজানু হয়ে থাকে? প্রতিটিরই উত্তর সম্ভবত খুঁজে পাওয়া যাবে, এই সাধারণদের অসংগঠিত চরিত্রের মধ্যে। এই অসংগঠিত থাকাই হলো সেই ফাঁদ, যা সাধারণ নামের রাজনৈতিক একটি সত্তাকে বরাবর ভুক্তভোগী এমনকি হত্যা পর্যন্ত করে বসে।

বুয়েটে ‘নিয়মতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতি’ করতে চায় জানিয়ে সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ছবি: ইনডিপেনডেন্টবুয়েটে কি এখন রাজনীতি আছে
প্রশ্নটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হতে পারে। ছাত্রলীগের দেওয়া গোপন সংগঠনের কার্যক্রম বা এ ধরনের বয়ানের সাথে গুলিয়ে না ফেলে একটু সতর্ক হয়ে খেয়াল করার অনুরোধ। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা একটি আন্দোলন করছেন। আন্দোলনের বিষয়বস্তু–রাজনীতি চাই না। তাঁরা ক্ষুব্ধ ছাত্রলীগের ওপর। যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ আছে। এই ক্ষোভ শুধু বুয়েট কেন, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেই কম-বেশি আছে। হত্যা-নিপীড়ন কত সহ্য করা যায়! এই ক্ষোভ থেকেই বুয়েটের শিক্ষার্থীরা রাজনীতিকে ঝাড়ে বংশে নির্বংশ করতে চাইছেন। উদ্দেশ্য এই স্রোতে তবে ছাত্রলীগও বিদায় নেবে।

খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, এটা নিজেই একটি রাজনীতি। কারণ, এটি বুয়েট নামক একটি উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সমাজের মধ্যে একটি বিধি বা নীতি আরোপ সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছে, যা পুরোটিই একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, রাজনীতি অপ-অর্থটিকে গ্রহণ করে তার চর্চায় বাধা দেওয়া বা সে সম্পর্কিত যেকোনো নীতি নিজেই একটি রাজনীতি। বিরাজনীতির মাধ্যমে আদতে একটি সীমা টেনে দেওয়া হয়। নাগরিক পরিসরের যেকোনো ক্ষেত্রেই এ সীমা টেনে দেওয়াটা সেই রাজনীতি, যা আদতে বাংলাদেশের তথাকথিত শাসক দলগুলো করে আসছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো এ কাজ করে ত্রাস তৈরি করে, লুট করে, সংঘাত, হত্যা, পীড়ন ইত্যাদির মধ্য দিয়ে। সে ক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য থাকে বিপরীত গোষ্ঠী ও সাধারণেরা। যেন কেউ কোনো রা না করে। আবরার ফাহাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে, সনির ক্ষেত্রে তা হয়েছে, আবু বকর কিংবা বিশ্বজিতের ক্ষেত্রেও তা হয়েছে। 

রাজনীতিবিমুখতার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা কাঠামোর সেই চাওয়াকেই তো পূরণ করা হচ্ছে। ফলে ক্ষমতাসীন দলের লেজুড়বৃত্তি বা পেশি ও অস্ত্রের খেলার সাথে রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেলে বিরাজনীতির মতো রাজনৈতিক চক্করে পড়ে যাচ্ছে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। তারা নিজেরাই বুঝতে পারছে না যে, এই বিরাজনীতিকীকরণের খেলায় তারাও একটি রাজনৈতিক বোড়ের মতো আচরণ করছে। যে বোড়ে লড়াই শেষে নিজের অধিকার আদায়ের পথ ও অস্ত্র দুইই হারিয়ে ফেলবে।

ফলে ছাত্ররাজনীতির বিলোপের বদলে অপছাত্ররাজনীতি এবং আধিপত্যবাদী ছাত্ররাজনীতির সাথে বিরোধ হোক। রাজনীতি নামের শব্দটি নিজের সত্যিকারের অর্থ ফিরে পাক এবং জন বা গণনীতিতে রূপান্তরিত হোক। আর এই রূপান্তরের দায়টি মেধাবীদেরই কাঁধে নিতে হবে। তাঁদেরই ঠিক করতে হবে যে, তাঁরা অমেধাবীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবেন, নাকি নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিজেরা নেবেন। দ্বিতীয়টি হলে রাজনীতিকে ব্রাত্য বা অস্পৃশ্য জ্ঞান করার কোনো সুযোগ নেই।

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন