এই ব্যাটিং নিয়ে সুপার এইটে বাংলাদেশ কী করবে?

ইনিংসের প্রথম বল। ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম ছিলেন ক্রিজে। নেপালের পেস বোলার সোমপাল গোলা ছুড়লেন। আচ্ছা, গোলা বলা কি ঠিক? গতি ছিল ১৩০ কিমির আশপাশে। আজকের ক্রিকেটে ১৪০ পার না হলে গোলা আসলে বলা উচিত না!

তাও ধরে নিলাম, ওটা গোলাই। ইনিংসের প্রথম বলে সাধারণত ব্যাটাররা একটু রয়েসয়েই ব্যাট চালান। সেই ডন ব্র্যাডম্যানের আমল থেকে এখনকার ধুন্ধুমার টি‑টোয়েন্টির সময়েও এই রীতি সব ব্যাটাররা মেনে চলেন কম‑বেশি। সেট হওয়ার সময়টা অন্তত নেয় সবাই। কিন্তু আমাদের তানজিদ হাসান তামিম সেটাও মানলেন না। বেরিয়ে এলেন ক্রিজ ছেড়ে, প্রথম বলেই গেলেন ডাউন দ্য উইকেটে। কিন্তু এগিয়ে গিয়ে টাইমিংয়ে গড়বড় হয়েই গেল। বোলারের হাতেই ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন তামিম। নামের পাশে তখন ১ বলে শূন্য রান জ্বলজ্বল করছে!

এরপর আরও উইকেট পড়েছে। অনেকটা টপ টপ করেই। অধিনায়ক শান্ত যেন আউট হওয়ার ধরনেই বুঝিয়ে দিতে চাইলেন যে, ফর্ম তাঁর নেই। লিটন ক্যাচ তুলে দিলেন আকাশে, যেন বল বাতাসে ভাসলেই ছক্কা হয়! ২১ রানে ৩ উইকেট পড়ে যাওয়ার পরও হৃদয় একটু ধৈর্য্য ধরতে চাইলেন না। ক্যাচ তুলে নিজে আউট হয়ে ৩০ রানে ৪ উইকেট বানিয়ে দিলেন!

এই হচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের আউট হওয়ার ধরন। তাও আবার টি‑টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে। এভাবে আউট হওয়াটা একটা ম্যাচে হলেও মানা যেত। সেই শ্রীলঙ্কার সঙ্গে প্রথম ম্যাচ থেকেই, আরও পেছনে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খেলা সিরিজ থেকেই এমনটা হয়ে আসছে ধারাবাহিকভাবে। আর তার বিপরীতে যেন দলের বোলাররা লজ্জা ঠেকানোর মিশন নিয়েছেন। ব্যাটাররা টার্গেট ১৬০ রানের দিক বা ১০৬, তাঁরা বুক চিতিয়ে দাঁড়াচ্ছেনই। আর এভাবেই টি‑টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার এইটে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ।

হ্যাঁ, প্রত্যেক বিশ্বকাপে বাংলাদেশের লক্ষ্য কম‑বেশি সেকেন্ড রাউন্ড পর্যন্তই থাকে। বিশেষ করে ২০০৭ সালের বিশ্বকাপের পর থেকে এমনটাই দেখা হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের সেরা বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সের তকমা হয়তো ওটিই পাবে। অবশ্যই তর্কসাপেক্ষে। তবে দলের ও খেলোয়াড়দের অবস্থা বিবেচনায় নিলে না মানাটা কঠিনই। এবং তার পর থেকে আমরা সেকেন্ড রাউন্ড বা সুপার এইটের লক্ষ্য নিয়েই বিভিন্ন বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে যাই। মুখে অবশ্য বলি যে, শিরোপা জিততে যাচ্ছি, শিরোপা জিততে চাই ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু দলের খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় তা ফুটে ওঠে না। ওই আশার ফুল ফোটে না দর্শকদের স্বপ্নেও। এ দেশের দর্শকেরাও কিছু ক্ষেত্রে বেশ বাস্তববাদী। তারা জয়ের চেয়েও বেশি করে চান লড়াই। আর আমাদের ঘাটতিটা হয় ঠিক ওই জায়গাতেই।

নেপালের ম্যাচ, বা শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা নেদারল্যান্ডস—সব দলের বিপক্ষেই বাংলাদেশের জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যান্স একই। কতটা খারাপ, সেটি বোঝাতে একটি পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। টি‑টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার এইটে ওঠা দলগুলোর মধ্যে শীর্ষ সাত ব্যাটারের সম্মিলিত রানের গড় হিসাব করলে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বশেষে। গড় হলো ১৬.৯৬। এর চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও আফগানিস্তানের শীর্ষ সাত ব্যাটসম্যানও এগিয়ে আছেন। অথচ টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া ও বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের ঢের এগিয়ে থাকা উচিত ছিল।

এটি ঠিক যে, প্রতিদিনই তো আর ব্যাটসম্যানরা খেলা জেতাবে না। কখনো বোলাররা জেতাবে, কখনো ব্যাটাররা। আবার কখনো বোলার, ব্যাটার, উইকেটকিপার, ফিল্ডার—সবাই মিলে দল হিসেবে খেলে জেতা হয়। বাংলাদেশ দলের ক্ষেত্রে এই দলবদ্ধতার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে কেবলই বোলিং ও ফিল্ডিংয়ের সময়। আর ব্যাটিংয়ের সময় বাংলাদেশের পারফরম্যান্স দেখলে মূলত একটি শব্দই মনে গেঁথে যাচ্ছে, সেটি হলো—দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। এতদিন তাও হৃদয় ও রিয়াদে কিছুটা পার পাওয়া যাচ্ছিল। নেপালের সঙ্গে ম্যাচে তাতেও ছন্দপতন হয়েছে।

আমাদের ব্যাটারদের সমস্যা আসলে কী? কেউ স্কিলের কথা বলবেন, কেউ তুলবেন পাওয়ার শট খেলার প্রসঙ্গ। তবে আসল সমস্যা মূলত ইনটেন্টে। টিকে থাকার জন্য বা রান তোলার জন্য আমাদের জোরালো আকাঙ্ক্ষাটাই নেই। নইলে এভাবে গণহারে আত্মহত্যা কেউ করতে পারে না, তাও ম্যাচের পর ম্যাচে! স্টিভ ওয়াহর কথা মনে আছে তো। অস্ট্রেলিয়ার এই কিংবদন্তি অধিনায়কের ব্যাটিং‑তূণে অনেক শট ছিল না। শচীন টেন্ডুলকার বা ব্রায়ান লারার মতো সহজাত প্রতিভাবান ব্যাটার ছিলেন না স্টিভ। কিন্তু দলের প্রয়োজনে খুব কম সময়ই ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। উল্টো সংকটে দাঁড়িয়েছেন দেওয়াল হয়ে, রানও করেছেন—তবে ওই সীমাবদ্ধতা মেনেই। সেটি স্টিভ করতে পেরেছিলেন কেবলই সলিড ইনটেন্টের কারণে। আর কিছু না।

সবশেষ কথা হলো, বাংলাদেশ টি‑টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চার ম্যাচের মধ্যে তিনটিতে জিতেছে, টুর্নামেন্টের সুপার এইটেও উঠেছে। সেখানে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও আফগানিস্তানের মুখোমুখি হতে হবে। নির্দ্বিধায় একটি সূত্র ভেবে নেওয়া যায় যে, ভারত‑অস্ট্রেলিয়া অন্তত কম রানের টার্গেট পেয়েও নেদারল্যান্ডস বা নেপালের মতো কুঁচকে যাবে না। আশঙ্কা আছে যে, আফগানিস্তানও যাবে না। ফলে লো স্কোরিং ম্যাচকে থ্রিলার বানিয়ে জেতা কঠিনই হবে, অসম্ভবও হয়তো। আর সেসব ম্যাচে একই ব্যাটিং পারফরম্যান্স বজায় থাকলে তো কথাই নেই। আমাদের তখন হয়তো পরের বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিতে দেশেই ফিরতে হবে দ্রুত।

হার‑জিত আসলে বড় কথা নয়। খেলায় হার‑জিত থাকেই। কিছু উগ্র সমর্থক এ নিয়ে চটাং চটাং কথা বলে ঠিকই, তবে বিশ্বাস করুন, এ দেশের বেশির ভাগ ক্রিকেটানুরাগী মাঠে টাইগারদের লড়াইটাই দেখতে চায়। সেটা ব্যাটিং হোক বা বোলিং বা ফিল্ডিংয়ে। মাথাটা উঁচু রাখতে চায় ওই লড়াইয়ের পুঁজিতেই। যত যা‑ই হোক, আমরা ‘হারতে হারতে জিতে যাব’ শুনতে শুনতেই ক্রিকেটকে ভালোবাসতে শিখেছি। হারে আমাদের ভয় নেই। শুধু চাওয়া ‘একটু’ লড়াই। তাই অসহায় আত্মসমর্পণ বা অহেতুক আত্মহত্যা থেকে সরে এলেই হলো!

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]