একচেটিয়া শাসন হচ্ছে সেই শাসনব্যবস্থা, যা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিতে থাকা এক বা একাধিক উপাদানকে বা তার সবগুলোকেই খারিজ করে দেয়। এর প্রধানতম লক্ষণ হচ্ছে–ক্ষমতা সম্পর্কিত যেকোনো প্রশ্নকে খারিজ করা এবং প্রশ্নকারীকে পীড়নের মুখে ফেলা। বিচার, সংবাদমাধ্যম, নির্বাচনসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ভিতকে ধসিয়ে দেওয়া হয় এ ব্যবস্থায়। শুধু তাই নয়, এ নিয়ে জনমনে অসন্তোষ বা হাজারটা প্রশ্ন থাকলেও তার উচ্চারণের সব পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। মোটাদাগে এই হলো গণতন্ত্রের মোড়কে একচেটিয়া শাসন। এই শাসনব্যবস্থা পত্তনের পথে রাষ্ট্রীয় সম্পদের এক ধরনের ভাগ‑বাটোয়ারা করা হয়। প্রশ্ন হলো–কারা এই ভাগীদার?
যেকোনো শাসন ব্যবস্থাতেই ক্ষমতা ও সম্পদের এক ধরনের বণ্টন হয়। মূলত সম্পদের বণ্টনের তাগিদেই ক্ষমতার পিরামিডটি তৈরি করা। আর এই পিরামিডের শীর্ষে কে বা করা থাকবে–তা নির্ধারণের জন্যই আসে নানা ব্যবস্থা। এর মধ্যে গণতন্ত্র নিশ্চিতভাবেই একটি ব্যবস্থা। ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও এক ধরনের সম্পদের বণ্টন হয়। সমাজে বিদ্যমান বৈষম্যকে বুঝতে গেলে তাই এই বণ্টন ব্যবস্থাকে বোঝাটা ভীষণভাবে জরুরি।
রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনের তাগিদেই ক্ষমতার পিরামিডটি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু হায়, যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ। ফলে এই ক্ষমতার যাওয়ার পথটি যেমনই হোক না কেন, সম্পদের বণ্টনে একটা অসাম্য আসবেই। এটা অনেকটা চাণক্যের শ্লোকে বলা সেই কথার মতো–মাছ যেমন পানি না খেয়ে থাকতে পারে না, তেমনি রাজস্ব কর্মকর্তার পক্ষে তহবিল তসরুপ করা ছাড়া উপায় নেই। অর্থাৎ, ক্ষমতায় যে যাবে, তার অপব্যবহার সে করবেই। এই অপব্যবহার রোধের জন্যই নানা ব্যবস্থা হাজির হয়েছে নানা সময়ে। এর মধ্যে তুলনামূলক কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে গণতন্ত্র। গোটা বিশ্বে এই গণতন্ত্রই নাকি এখন আবার মৃত্যুশয্যায়।
সে যাক। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও নিশ্ছিদ্র নয়। এর নানা ছিদ্রপথে বৈষম্য ঢুকে পড়ে, যার গোড়াটি রয়েছে অতি অবশ্যই পুঁজিতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে। কিন্তু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে পুরোনো তর্কে না গিয়ে এই পুঁজিবাদকেই বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা করে তার রক্ষী হিসেবে গণতন্ত্রকে বিবেচনা করা যাক।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা নির্ধারিত হয় ভোটের মাধ্যমে। মোটাদাগে ‘উইনারস টেক অল’ নীতিতেই বিভিন্ন দেশে এই ব্যবস্থা চলে আসছে। ফলে কোনো একটি নির্বাচনে জয় পেয়ে যারা ক্ষমতায় এল–তাদের সামনে থাকে এমন একটি পরিসংখ্যান, যেখানে তারা সহজেই জানতে পারে কোন অঞ্চলগুলো তাদের এই ক্ষমতায় আরোহণের রসদ জুগিয়েছে। আর এই পরিসংখ্যানই পরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন নীতি গ্রহণে, এমনকি বার্ষিক বাজেট ঘোষণার সময়ও প্রভাব বিস্তার করে। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতার শিখরে থাকা গোষ্ঠী পরের মেয়াদেও ক্ষমতায় আসার জন্য নিজেদের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত অঞ্চলগুলোকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করে। পোক্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকলে এই চেষ্টা সবসময় সফল হয় না। কারণ, ক্ষমতাকে তখন প্রতিনিয়ত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।
এই চ্যালেঞ্জের মাত্রাই আসলে শাসন কতটা ভালো বা মন্দ হবে, তা নির্ধারণ করে দেয়। যেকোনো শাসন ব্যবস্থাতেই এমন চ্যালেঞ্জ থাকে। পার্থক্য যেখানে হয়, সেটা হলো এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পন্থায়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই মোকাবিলা করা হয় আলোচনার টেবিলে বা জনমত জরিপ বা গণশুনানির মাধ্যমে। কিন্তু একচেটিয়া শাসনে এর কোনোটিই আর ধর্তব্যে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
একচেটিয়া শাসন ব্যবস্থায় নির্বাচন যেহেতু আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়, সেহেতু আর বিশেষ অঞ্চল ধরে সম্পদ বণ্টনের তেমন প্রয়োজন পড়ে না। যতটা প্রয়োজন পড়ে, তাও নির্বাচনী একচেটিয়া শাসন জারি রাখতে প্রয়োজনীয় অবাধ‑সুষ্ঠু ভোট প্রদর্শনের তাগিদে। কারণ, সরাসরি একনায়ক শাসন এই বিশ্বগ্রামে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়ে। ফলে একটি ‘নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদ’ বা একচেটিয়া শাসন জারি রাখতে হলে একটা অন্তত ভোটের পরিবেশ এবং ভোট গ্রহণের হার প্রদর্শন জরুরি হয়ে পড়ে। এই তাগিদে হলেও নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল বাড়তি সুবিধা পায়।
এই নির্বাচনের তরণী শাসকগোষ্ঠী সাধারণত সরকারি নানা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি জনবলকে কাজে লাগিয়ে পার হয়। ফলে স্বাভাবিক বিচারেই রাষ্ট্রের এই অংশটি পরিণত হয় ক্ষমতার ভাগীদার অংশে। এদের জন্য বাড়তি ব্যয় করা হয়। এমনকি অর্থনৈতিক সংকটকালেও এই বাড়তি ব্যয়ের বৃত্ত থেকে সংশ্লিষ্ট শাসকগোষ্ঠী বেরিয়ে আসতে পারে না। কারণ, সে ক্ষেত্রে হয়তো তাদের ক্ষমতার পিরামিডটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের জোনাথন কে হ্যানসন ২০১৩ সালে ‘লয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকুইসেন্স: অথোরিটারিয়ান রেজিমস অ্যান্ড ইনইকুয়ালিটি আউটকামস’ শীর্ষক গবেষণায় একচেটিয়া শাসন ব্যবস্থায় ক্ষমতার ভাগীদার কারা, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। তিনি বলছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার ভাগীদার গোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে মোটাদাগে একটা ধারণা থাকে। কিন্তু মুশকিল হয় একচেটিয়া শাসন কাঠামোর ক্ষেত্রে। কারণ, সে ক্ষেত্রে এই বণ্টন নতুনভাবে হয়।
এ ক্ষেত্রে দুটি হাতিয়ারের কথা উল্লেখ করেছেন হ্যানসন তাঁর গবেষণায়–এক. সরকারি‑বেসরকারি সম্পদ ও আর্থিক প্রবাহের ভাগ এবং দুই. রাজনৈতিক বিরুদ্ধাচরণের শাস্তি হিসেবে নিপীড়ন।
এই ধরনের শাসকেরা সাধারণত, দুই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়–এক. প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সংগঠনের দিক থেকে এবং দুই. গণবিদ্রোহ। প্রথমটিকে হ্যানসন বর্ণনা করছেন আনুভূমিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে এবং দ্বিতীয়টিকে বলছেন উলম্ব চ্যালেঞ্জ।
আনুভূমিক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, সেই সব ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর তরফ থেকে চ্যালেঞ্জ, যাদের ক্ষমতা ও সম্পদের ভাগ দিয়ে নিরস্ত করা যায়। এরা মূলত ক্ষমতা কাঠামোরই অংশ। ঘুরেফিরে এই গোষ্ঠীগুলোই ক্ষমতায় আসে‑যায়। কিন্তু একচেটিয়া শাসকেরা নিজেদের বদলে অন্য গোষ্ঠীর ক্ষমতায় আরোহণের পথ বন্ধ করতে সহায়ক তো বটেই, বিপরীত গোষ্ঠীগুলোকেও নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নেয় নানা সুবিধা দিয়ে।
মুলোটা‑কলাটা দিয়ে এবং ক্ষমতার ছিটেফোঁটা বিতরণের মধ্য দিয়ে শাসকগোষ্ঠী সমমনা এবং বিপরীতমনা প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে বশ্যতা কিনে নেয়। এই তালিকায় কারা থাকে? হ্যানসন তাঁর গবেষণা নিবন্ধে বলছেন–প্রথমেই থাকে ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা। কারণ তাদের হাতেই থাকে অস্ত্র, যা শাসকের ক্ষমতাকে বাস্তবিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। এর পরের ধাপেই থাকে বড় ভূসম্পত্তির মালিক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এর পরের অবস্থানে থাকে ধর্মীয় নেতারা এবং ধার্মিক জনগোষ্ঠী। একইসঙ্গে সমাজের অভিজাত পরিবার, বুদ্ধিজীবী মহল ইত্যাদি এই তালিকার বেশ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এরা নানা প্রকল্প, উদ্যোগ ইত্যাদির মাধ্যমে টাকার ভাগীদার হয়। অর্থের সাথে সাথে সমাজে এদের প্রতিপত্তিও বাড়ে। আর এর কীয়দংশ চুঁইয়ে চুঁইয়ে নেমে যায় সমাজের একেবারে তলা পর্যন্ত। হ্যাঁ প্রান্তবাসীদের কেউ কেউ যৎসামান্য হলেও ভাগ পায়। এই ভাগ তাদের দিতে হয় বিদ্যমান ক্ষমতার পক্ষে সম্মতি উৎপাদনের জন্যই।
ফলে এই ধরনের শাসনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আরও প্রান্তে সরে যেতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি সমাজের সবচেয়ে নিপীড়িত, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত অংশ আরও পিছিয়ে পড়তে থাকে। এই নিচুতলার লোকেরাই আসলে সেই গোষ্ঠী, যাদের দিক থেকে আসতে পারে উলম্ব চ্যালেঞ্জ। কারণ, সরকারি‑বেসরকারি সম্পত্তি, অর্থ ও সম্পদের ভাগাভাগিতে কাটা পড়ে এরাই নিঃস্ব হয়। ফলে এই গোষ্ঠীর হাতে গণবিস্ফোরণ ছাড়া আর কিছু থাকে না। আর এই গণবিস্ফোরণ মোকাবিলায় আগেই ক্ষমতার ভাগীদার বানিয়ে রাখা সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিচার বিভাগসহ প্রশাসনের প্রতিটি স্তরকে কাজে লাগানো হয়। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার সম্মতি উৎপাদনে কাজে লাগানো হয় এত দিন ধরে সমাজে স্বীকৃত বুদ্ধিজীবীদের, যাদের বড় অংশ তত দিনে ক্ষমতার ভাগীদারে পরিণত হয়েছে।
বিপরীতে থাকে শুধুই রাজদণ্ড, যা নানামাত্রিক দণ্ড হয়ে বিরোধীদের নাকে‑মুখে ঘাড়ে নেমে আসে। কখনো বিচিত্র সব আইনের মারপ্যাঁচে, কখনো পেটোয়া বাহিনীর মাধ্যমে, কখনো বিনা বিচারে কয়েদ করে, কখনো কর কর্মকর্তার বেশে এই দণ্ড নেমে আসে। দণ্ডের বাহক যে বা যেমনই হোক না কেন, কারণ একটিই। আর তা হলো–বিদ্যমান শাসকের সমালোচনা বা তার কোনো পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন বা কটাক্ষ।
ফলে একচেটিয়া শাসনকে চিনতে হলে একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক উপাদানের কী কী নাই হলো–সেদিকে তাকাতে হবে, তেমনি তাকাতে হবে কে বা কারা স্বর্গের সিঁড়ির নাগাল পেল, আর কারা হলো ভূপাতিত। দেশে দেশে আজকে যে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে একচেটিয়া শাসনের বজ্র আঁটুনি তৈরি হয়েছে, তার ফসকা গেরোটিও অবশ্য এই বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই আছে। কারণ, আনুভূমিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অত্যধিক সুবিধা দিতে দিতে একসময় হাঙরের জন্ম হয়, যা সবটাই গিলে খেতে চায়। আর সেই সময়টাতেই আর উলম্ব চ্যালেঞ্জ, অর্থাৎ, জনতার দিক থেকে আসা চ্যালেঞ্জকে আর শুধু নিষ্পেশন দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। ইতিহাসে একচেটিয়া শাসনের পতন বরাবরই এসেছে ব্যাপকভাবে বিস্তার পাওয়া আয় ও সম্পদ বৈষম্য এবং সেই সূত্রে সৃষ্ট গণবিস্ফোরণের পথ ধরে। বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলন ও গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের মধ্য দিয়ে উলম্ব চ্যালেঞ্জটিই দৃশ্যমান ও বিজয়ী হয়েছে। এর আগে আনুভূমিক চ্যালেঞ্জগুলো নানাভাবে একই কায়দায় ম্যানেজ করতে দেখা গেছে বিগত সরকারকে। দেখা গেছে উলম্ব চ্যালেঞ্জটি হাজির হওয়ার পর প্রশাসনিকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বাহিনী একেবারে ভেতর থেকে হয় ভেঙে গেছে, নয়তো ময়দান থেকে সরে গেছে।
ফজলুল কবির: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
আগের পর্ব পড়ুন: