কাজী সালাউদ্দিন, ১৬ বছর অনেক লম্বা সময়

‘টাকা নেই। টাকা দেন, এখনই করে দিচ্ছি।’

‘সরকার টাকা দেয় না।’

‘বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা আসে না। কারণ, আপনারা শুধু নেতিবাচক কথাই লেখেন।’

‘ফিফা-এএফসি যে টাকা দেয়, সেটা খরচ করার খাত ঠিক করে দেয় তারাই, এর বাইরে খরচ করা যায় না। সেটা তো ওসবের বাইরে আমি খরচ করতে পারব না।’

সম্ভবত বাংলাদেশের প্রায় সব ফুটবলবিষয়ক সাংবাদিকেরই কাজী সালাউদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের অনুভূতি এ জায়গায় মিলে যাবে - এই কথাগুলোই তো ঘুরেফিরে গত কয়েক বছরে শোনা গেছে তাঁর কাছ থেকে।

দেখতে দেখতে ১৬ বছর হয়ে গেল তিনি বাফুফে সভাপতির চেয়ারে। যে আশা জাগিয়ে দায়িত্বটা নিয়েছিলেন, তার বিপরীতে সময় যত গড়িয়েছে, হতাশার ভারই বেড়েছে শুধু। দুর্নীতির নানা খবরে ক্ষোভ বেড়েছে, তাঁর নানা অবিশ্বাস্য প্রতিশ্রুতি আর ঠুনকো যুক্তি বিরক্তি জাগিয়েছে ফুটবলপ্রেমীদের। তাঁর পদত্যাগের দাবিরও বয়স কয়েক বছর হয়ে গেছে। বাংলাদেশে চলমান পালাবদলের এই সময়ে দাবিটার আওয়াজ বেড়েছে।  

‘আলট্রাস’ নামের সমর্থকদের একটি গোষ্ঠী কাজী সালাউদ্দিনসহ বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী ও বাফুফের মেয়েদের ফুটবল উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছে কয়েকদিন ধরেই। এর মধ্যে সালাম মুর্শেদী পদত্যাগ করেছেন দিন পাঁচেক আগে। তবে বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না, আগামী ২৬ অক্টোবর হতে যাওয়া নির্বাচনেও লড়বেন।

দেখেশুনে মনে হচ্ছে, ফিফার নিয়মকে এ মুহূর্তে ঢাল মানছেন বাফুফে সভাপতি। নির্বাচনের বাইরে কোনো পদ্ধতিতে কোনো সদস্য দেশের ফুটবল ফেডারেশনে বদল মানে না ফিফা, তেমন কিছুর ক্ষেত্রে ওই সদস্য দেশকে নিষিদ্ধ করার উদাহরণ তো কম নেই। ২০০১ সালে সে সময়ের নতুন সরকার নির্বাচিত হওয়ার পরই তো, অতিউৎসাহী কয়েকজন ক্রীড়া সংগঠক বাফুফের কমিটি বদলে দেন, যে কারণে ফিফা বাংলাদেশকে নিষিদ্ধ করে।

গতকাল ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালের সঙ্গে লম্বা আলাপেও ফিফার এই হুঁশিয়ারি নিয়ে কথা বলেছেন কাজী সালাউদ্দিন। বললেন, ফিফার দিক থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে বলা হয়েছে, কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ হলে সেক্ষেত্রে ফিফা তাঁকে সুইজারল্যান্ডে নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত। তবে সালাউদ্দিন সেটি চান না জানিয়ে বলেছেন, ‘আমি পদত্যাগ করলে বাংলাদেশকে সাসপেন্ড করবে। আমি আমার দেশকে প্রোটেক্ট করে রাখছি।’

যথাযথ নিয়ম মেনে চলছেন তিনি। গতকাল আলাপে আলট্রাসের উদ্দেশে বলেছেন, বদল চাইলে তারাও এসে নির্বাচনে অংশ নিক। নির্বাচনে জিতে সভাপতিত্ব নিয়ে যাক – তিনি শুভকামনা জানাবেন। সেটাও দারুণ কথা।

কিন্তু তাঁর পদত্যাগের দাবি কেন ওঠে, সেটা কাজী সালাউদ্দিন না জানার বা উপলব্ধি করতে না পারার তো কোনো কারণ নেই। যে প্রতিশ্রুতি জাগিয়ে এসেছিলেন, তার কতটা পূরণ করতে পেরেছেন তিনি?

কাজী সালাউদ্দিনের কাছে সেটি জানতে চেয়ে লাভ নেই। ঘুরেফিরে একই উত্তরই আসবে। গতকাল ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালের সঙ্গে আলাপেও ঘেটেছেন পুরোনো কাসুন্দি – তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগে লিগ নিয়মিত হতো না, লিগ আয়োজনের জন্য খেলোয়াড়দের আন্দোলনও করতে হতো, সেখানে তিনি লিগ নিয়মিত মাঠে রেখেছেন। জাতীয় দলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশ-ও দেশে ক্যাম্প আয়োজন করেছেন। নারী ফুটবলে সাফল্য এনে দিয়েছেন…। আর যা পারেননি, সেটা মূলত মাঠ আর অর্থের অভাবেই পারেননি!

কিন্তু যখন তাঁর উত্তরের পিঠে প্রশ্ন গেল, লিগ নিয়মিত মাঠে রাখার দাবি তো ২০০৮ সালের বাস্তবতা, এরপর ১৬ বছরে ধারাবাহিক উন্নতির কী হলো? প্রশ্নের উত্তরে কাজী সালাউদ্দিন কথা ঘোরান। বয়সভিত্তিক লিগ বা মেয়েদের লিগে ক্লাবগুলো আসতে চায় না – এটা তো তাঁর হাতে নেই জানিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে চান।

যা উল্টো প্রশ্নের জন্ম দেয়। লিগ আয়োজন করা একটা দেশের ফুটবল ফেডারেশনের একেবারে নৈমিত্তিক কাজগুলোর একটি। সেটা তাঁর আগের ফেডারেশন করতে পারেনি, সেটা তাদের ব্যর্থতা। সেই ব্যর্থতার কারণেই তাদের বিদায় দিয়ে মানুষ কাজী সালাউদ্দিনকে চেয়েছে। যে কাজী সালাউদ্দিন তখনো মানুষের কাছে কিংবদন্তি খেলোয়াড়, বাংলাদেশের ফুটবলের প্রথম – এখনো একমাত্র – সুপারস্টার! কিন্তু সেই কিংবদন্তি খেলোয়াড় কাজী সালাউদ্দিনই সংগঠক কাজী সালাউদ্দিন হিসেবে লিগ নিয়মিত মাঠে রাখার মতো ‘সাধারণ দায়িত্ব’কে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অর্জন হিসেবে দেখাতে চাইলে হতাশা বাড়ে বৈকি!

বরং প্রশ্ন আসে, লিগ নিয়মিত রেখেছেন, কিন্তু ১৬ বছর তো অনেক লম্বা সময়, এ সময়ে লিগের কাঠামোকে কতটা পেশাদার করতে পেরেছেন? ক্লাবগুলোকে পেশাদার হতে কতটা বাধ্য করতে পেরেছেন? আর লিগ আয়োজন বলতে তো শুধু জাতীয় পর্যায়ের লিগই বোঝায় না, দেশের ৬৪ জেলার কয়টিতেই-বা গত কয়েক বছরের মধ্যেও একবার লিগ হয়েছে? হ্যাঁ, সেখানে জেলাভিত্তিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা আর কাউন্সিলরদের সদিচ্ছার প্রশ্নও বড় হয়ে ওঠে, দুর্নীতির ইচ্ছা যে সেখানেও অনেকের মধ্যেই আছে। বাফুফেও-বা শুধু কাউন্সিলরদের ভোটের সময়ে বিলাসবহুল হোটেলে আদর-আপ্যায়নের বাইরে জেলার ফুটবল উন্নয়নে কী করেছে, সে প্রশ্ন ওঠাও কি যৌক্তিক নয়?  

বাফুফের কমিটিতে যাঁরা আছেন, তাঁদের প্রায় সবাই-ই কোনো না কোনো ক্লাবের সঙ্গে জড়িত। ছবি: বাফুফেমাঠ নেই, টাকা নেই, স্তরে স্তরে দুর্নীতি – সে তো বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে হতাশাজনক বাস্তবতা। সেটা না জেনে তো আর কাজী সালাউদ্দিন দায়িত্বে বসেননি। সেসবকে পাশ কাটিয়েই কতটা কী করতে পারলেন, সেটাই এই বাস্তবতার নিরিখে সংগঠক কাজী সালাউদ্দিনের সাফল্য-ব্যর্থতার মাপকাঠি। সেখানে কি কাজী সালাউদ্দিন পাশ মার্ক পাচ্ছেন?

প্রশ্নের উত্তরে সমালোচনা আসে, বাফুফের প্রশাসনিক কাঠামো এমনভাবে দাঁড় করিয়েছেন যে, বাফুফে ক্লাবগুলোর হাতে বন্দী হয়ে থাকছে। বাফুফের কর্মকর্তাদের প্রায় সবাই-ই কোনো না কোনো ক্লাবের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সদস্য। সে কারণে কাজী সালাউদ্দিন যখন বলেন, ‘ক্লাব খেলতে না চাইলে তো আমি জোর করতে পারি না’ – তাতে তাঁর অসহায়ত্ব সামনে না এসে বরং বাফুফে কর্তাদের স্বার্থের দ্বন্দ্বই বেশি প্রকাশিত হয়। কাজী সালাউদ্দিন কি সেটা জানেন না? ১৬ বছর তো অনেক লম্বা সময়, সংস্কারের পথে এ সময় প্রয়োজনের চেয়েও বেশি। সেখানে কতটা চেষ্টা করেছেন কাজী সালাউদ্দিন, নাকি ভোটের রাজনীতির কারণেই বারবার ক্লাবগুলোকে ছাড় দিয়েছেন – সে প্রশ্ন ওঠা তো অস্বাভাবিক নয়।

আহা, ভোটের জন্য কুৎসিত রাজনীতি! বাংলাদেশের প্রতিটি স্তরে চেপে বসা এক জগদ্দল পাথর যেন! কাগজে-কলমের নিয়ম বলে, এখন যে কোনো সাধারণ নাগরিকও চাইলে বাফুফের যে কোনো পদে নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত ফি দিয়ে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু ভোটের মাঠের বাস্তব চিত্র কি তা বলে?

২০০৮-এর পর আরও যে তিনবার নির্বাচন করেছেন কাজী সালাউদ্দিন, এর মধ্যে ২০১২ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি দুবার তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা তেমন সাড়াই পাননি। সেটা সালাউদ্দিনের দায় নয়। কিন্তু ২০২০ সালে সর্বশেষ ভোটের মাঠের চিত্র বলে, তাঁর বিরুদ্ধে প্রভাবশালী যাঁরা সভাপতি পদে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে বর্তমানে বিলুপ্ত সাইফ স্পোর্টিংয়ের প্রধান কর্তা তরফদার রুহুল আমিন শেষ মুহূর্তে হঠাৎ সরে দাঁড়ান। সংবাদ সম্মেলনে যদিও রুহুল আমিন বলেছিলেন, কাজী সালাউদ্দিন নির্বাচনে দাঁড়াবেন সেটা তিনি জানতেন না। জানার পর সরে দাঁড়াচ্ছেন। কিন্তু ফুটবলপাড়ায় গুঞ্জন – এর বাইরেও কিছু কারণ ছিল। সেবার শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে দাঁড়ালেও বর্তমানে প্রয়াত ফুটবল কিংবদন্তি বাদল রায়কে ঘিরেও তো কী নাটকটাই না হলো! নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণা করেও প্রার্থিতা বাতিলের নির্ধারিত সময়ের পর প্রার্থিতা প্রত্যাহার, তা গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় সংবাদ সম্মেলন করে প্রার্থিতা বাতিলের ঘোষণা, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে নাম থাকলেও ভোটের দিনে ‘শারীরিক অসুস্থতা’র কারণে বাদল রায়ের কেন্দ্রে না যাওয়া…। সিনেমাই বটে!

ওদিকে রুহুল আমিন? সে সময়ে ফুটবলের জন্য মিলেমিশে কাজ করার ইচ্ছা প্রদর্শন করা রুহুল আমিনের সাইফ স্পোর্টিং বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবলে পেশাদারি মনোভাবের ছাপ দেখিয়েছিল। কিন্তু সভাপতি নির্বাচন করতে না পারার বছর দুয়েকের মধ্যে আর্থিক সমস্যাকে কারণ দেখিয়ে সেই সাইফ স্পোর্টিংই হঠাৎ ক্লাবের ফুটবলবিষয়ক সব কর্মকান্ড বন্ধ করে দেয়। আসলেই আর্থিক কারণ, নাকি ইচ্ছা পূরণ না হওয়ায় পিছু হঠা – প্রশ্ন ওঠে তাঁকে ঘিরেও। সরে যাওয়ার আগের মৌসুমে সাইফ স্পোর্টিং অনেকবার বাজে রেফারিংয়ের শিকার হওয়ার অভিযোগও আছে। এখন আলট্রাস-এর এই আন্দোলন নিয়ে কাজী সালাউদ্দিন কাল ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালে বললেন, এই আলট্রাস আসলে সাইফ স্পোর্টিংয়েরই সাবেক কর্মচারী-সমর্থক!

সেটা কাজী সালাউদ্দিনের দাবি, তিনি দায়িত্ব নিয়েই এটা বলছেন কি না প্রশ্নেও তাঁর ইতিবাচক উত্তরই এসেছে গতকালের আলাপে। কিন্তু তাঁর দাবি সত্যি হোক বা মিথ্যা, বাংলাদেশের ফুটবল এই রাজনীতির খেলার কাছেই অসহায়।
কাজী সালাউদ্দিন তাঁর সাফল্যের প্রশ্নে জাতীয় দলকে অনেক ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দেওয়ার কথা বলেন। এটা নিয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। তবে এর পাশাপাশি জাতীয় দলকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ক্যাম্প করানোর কথাও যখন বলেন তিনি, তার উল্টো দিকে প্রশ্ন ওঠে। সেটা এই যে, সৌদি আরব, কাতার বা বাইরাইনের মতো দেশ এশিয়া বা বিশ্বমঞ্চে ছড়ি ঘোরাতে যে ভোটের পেছনে ছোটে, ব্যক্তি কাজী সালাউদ্দিনের হাত ধরে বাফুফের ভোটও সেখানে গুরুত্ব রাখে। সেসব দেশে ক্যাম্প করার সুযোগ কি সেই ভোটেরই পুরস্কার? হলেও অবশ্য অতটুকুকেও কাজী সালাউদ্দিনের কূটনৈতিক দক্ষতারই পুরস্কার মানতে হবে।

কাজী সালাউদ্দিনের ফুটবল কূটনীতির প্রশংসা হতে পারে গত কয়েক বছরে ফিফা বা এএফসির দিক থেকে অর্থছাড়ের বাড়তে থাকা অঙ্ক দেখে। কিন্তু এর বিপরীতে যখন শোনা যায়, ভূটান বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশও কাছাকাছি অঙ্কই পায়, কূটনৈতিক দক্ষতার দাবিটা আর অত জোরাল থাকে না।

বরং ফিফার তহবিল ব্যবহারে দুর্নীতির দায়ে যখন সালাম মুর্শেদী, আবু নাঈম সোহাগসহ বাফুফের কর্মকর্তারা ফিফার কাছ থেকেই নিষেধাজ্ঞা-জরিমানার শাস্তি পান, বাফুফের দুর্নীতির চিত্রটা গুঞ্জন ছড়িয়ে বাস্তব হয়ে সামনে আসে। কাজী সালাউদ্দিনের তাতে দায় নেই, তাঁকে তো আর নিষিদ্ধ করেনি ফিফা। কিন্তু তাঁর অধীন ফেডারেশনই যখন প্রশ্নবিদ্ধ, সালাউদ্দিনের গায়ে তাঁর আঁচ তো লাগবেই!

কাজী সালাউদ্দিনের সময়ে বাংলাদেশ ছেলেদের জাতীয় দল অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। তবে গত বছর দুয়েকে অনেক উন্নতি দেখাচ্ছে। খেলার ধরনে উন্নতিটা চোখে পড়ার মতো, ফলাফলেও উন্নতি আসছে ধীরে। তবে র‍্যাঙ্কিং বলে, বাংলাদেশ সেই ঘুরেফিরে ১৮০-১৯০-এর ঘরেই ঘুরছে। সাদা চোখের বিশ্লেষণ তাই বলে, বাংলাদেশ উন্নতি করছে, তবে অন্যরা বাংলাদেশের চেয়েও দ্রুতগতিতে উন্নতি করছে, সে কারণেই বাংলাদেশ একই আবর্তে ঘুরছে। বাংলাদেশ তাহলে কেন পারছে না? শুধুই অর্থের অভাব, নাকি সদিচ্ছারও?

বাফুফের একাডেমি নিয়ে কত দৃশ্যই তো দেখা গেছে কাজী সালাউদ্দিনের এত বছরে। সিলেটে একটা একাডেমি ঢাক-ঢোল পিটিয়ে উদ্বোধনের পর সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর ২০১৬ নির্বাচনের ইশতেহারে কাজী সালাউদ্দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একাডেমির প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেও সেটি শুধু ঘোষণাই থেকে গেছে। গাজীপুরে নিজস্ব অর্থায়নে একাডেমির ঘোষণারও শেষ পর্যন্ত একই দশা। এখন কমলাপুর স্টেডিয়ামে কয়েকজন খেলোয়াড়কে রেখে ‘একাডেমি’র নাম করে যা চালানো হচ্ছে, সেটিকে বড়জোর দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্পই বলা চলে। একাডেমিতে খেলোয়াড়দের বছরের পর বছর রেখে তাদের পড়ালেখা, অনুশীলন – সবই তো চলার কথা। একাডেমি খেলোয়াড়দের জীবনও গড়ে দেয়, তা তাঁরা শেষ পর্যন্ত ফুটবলার হতে না পারলেও। এখানে ফুটবলের অনুশীলন আর থাকার বাইরে আর কিছু হচ্ছে কই!

যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ফিফা-এএফসির অনুদানের অঙ্ক বিগত বছরগুলোতে বেড়েছে, তবে তার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন আছে। ছবি: বাফুফেএকাডেমির প্রশ্নেও কাজী সালাউদ্দিনের মুখস্ত বুলি, একাডেমি করা ক্লাবের কাজ। কথাটা সত্যি, পুরো বিশ্বে তা-ই হয়। কিন্তু সে তো পেশাদার ফুটবলের সংস্কৃতির হিসাব। বাংলাদেশের ফুটবলে বিলুপ্ত সাইফ স্পোর্টিং আর এখন বসুন্ধরা কিংস আর ফর্টিস ক্লাবের বাইরে কোন ক্লাব পেশাদার ঢংয়ে চলে? এই বাস্তবতা না জানার কোনো কারণ তো কাজী সালাউদ্দিনের নেই। সে ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক সত্যিটাকে সামনে আনা তো তাঁর দায় এড়ানোর মতোই মনে হবে।

মেয়েদের ফুটবলেও অবস্থাটা কি খুব ভিন্ন কিছু? মেয়েদের ফুটবলে সাফল্যের তৃপ্তির ঢেঁকুর আছে বটে, কিন্তু এখন পর্যন্ত তার সবই সাফ পর্যায়ে। তেতো সত্যিটা হচ্ছে, সাফে ভারতের বাইরে অন্য কোনো দেশের মেয়েদের ফুটবলও তেমন শক্তিশালী নয়। আর তৃপ্তিতে ভেসে যেতেও বাধো বাধো ঠেকে যে কারণে, সেটিও ফুটবলের ক্রমোন্নতির ছাপ দেখতে না পাওয়ায়। এখনো যে মেয়েদের ফুটবল লিগই সংগঠিত নয়। অনেক ক্লাব মেয়েদের দল গড়তে চায় না। শেষ মুহূর্তে কোনোরকমে মাস দু-তিনেকের আয়োজনে একটা লিগ হয়। তাতেও আবার নামকাওয়াস্তে দল গড়া ক্লাবগুলোর এমনই অবস্থা থাকে যে, লিগের ম্যাচগুলোর ফলকে বাস্কেটবলের ম্যাচ বলে ভ্রম কারও হলে তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না! 

ঘুরেফিরে বাফুফে ভবনের একাডেমিতে থাকা মেয়েদের দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্প ঘিরেই মেয়েদের বয়সভিত্তিক হোক বা জাতীয় দল - সবই পরিচালিত হয়। অথচ মেয়েদের ফুটবলে ফিফার সরাসরি অনুদান আসে। মেয়েদের ফুটবলের বিস্তার শুরু হয়েছে তাঁর সময়ে, সে কৃতিত্ব কাজী সালাউদ্দিন পাবেন। সাফল্যের কৃতিত্বও। কিন্তু বারেবারে যে ‘ভ্যারিয়েবল’টা সামনে আসে, তা হলো – মাঝে তো এতগুলো বছর কেটে গেছে। এখনও মেয়েদের ফুটবল চালু করা আর সাফ পর্যায়ে কিছু সাফল্যের তৃপ্তিতে ভেসে থাকার উপায় কি আছে?

এটা সত্যি, সব ব্যর্থতার দায় কাজী সালাউদ্দিনের নয়। বাংলাদেশের জেলা পর্যায়ের সংগঠন থেকে শুরু করে শীর্ষস্তরের ক্লাব পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়েই যা ভালোভাবে আছে তা হলো দুর্নীতি, আর অর্থের চেয়েও যেটির অভাব আছে তা হলো সদিচ্ছা। এ এক দুষ্টচক্রের মতো! সালাউদ্দিনের সময়ে উন্নতি একেবারেই হয়নি, এটাও কেউ বলতে পারবেন না। শুধু বোর্ডের শীর্ষস্তরে বদল এলেই বাংলাদেশের ফুটবল তরতর করে এগিয়ে চলবে – এমন ভাবনা নিয়ে কেউ বসে থাকলে ধরে নিতে হবে, কল্পনার রাজ্যেই তাঁর বসবাস। তাহলে কাজী সালাউদ্দিনের এত সমালোচনা কেন চারিদিকে? এতটাই কেন যে, যেকোনো সংবাদমাধ্যমে ফুটবলের নেতিবাচক কোনো খবরে বা কাজী সালাউদ্দিনের যেকোনো খবর নিয়ে ফেসবুক পোস্টে তাঁর পদত্যাগের দাবিরই দেখা মেলে প্রায় সব কমেন্টে?

হয়তো নামটা কাজী সালাউদ্দিন বলেই। হয়তো যে প্রত্যাশা তাঁর নামের কারণে তাঁকে ঘিরে ছিল, সেসবের কারণে। হয়তো সদ্যবিলুপ্ত সরকারপ্রধানের পরিবারের সঙ্গে তাঁর অতীত সম্পর্কের কারণে।

প্রত্যাশার বিপরীতে প্রাপ্তির খাতায় তেমন কিছু না থাকার কারণেও। নিয়মিত লিগ আয়োজন, জাতীয় দলে বিদেশি কোচের ছড়াছড়ি, জাতীয় দলের ম্যাচের সংখ্যায় উন্নতি আর মেয়েদের ফুটবলে কিছু সাফল্য – এই তো। এর বাইরে থাকে কিছু লোকদেখানো আয়োজন বা ‘গিমিক!’ কোটি টাকার সুপার কাপের আয়োজন যেমন অল্প কয়েকবার হয়েই থেমে গেল। ভারতের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ফুটবল টুর্নামেন্ট শুধু গালগল্পেই জায়গা পেল।

কিন্তু গিমিকের ঝামেলাটা হলো, এমন চটকদার আয়োজনের আবেদন এক-দুই বছরই থাকে। লম্বা সময় ধরে দায়িত্বে থাকা কারও শুধু গিমিকে দায় এড়ানোর রাস্তা থাকে না। তাঁর কাছে ফুটবল সংস্কৃতির বদলের দাবি ওঠে, ক্লাবগুলোকে নিয়মের মধ্যে দেখতে চাওয়ার ইচ্ছা জাগে। ফুটবলারের পাইপলাইনে উন্নতি দেখতে চাওয়াও একেবারে প্রাথমিক চাহিদা। নিয়মিত লিগ আয়োজনের বুলি শুধু জাতীয় পর্যায়ে না থেকে জেলায় জেলায় প্রতি বছর লিগের আয়োজন তো ফেডারেশনের সাধারণ দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। ফুটবলকে একটা ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদেরও নিয়ে আসতে না পারার ব্যর্থতাকে কেন সাংগঠনিক ব্যর্থতা বলা হবে না, সে প্রশ্ন ওঠে। এত কিছুর উত্তর শুধু গিমিকে বা বুলি আউড়ে হয়ে যায় না। সে জন্য ধীরে ধীরে সংস্কারের প্রয়োজন পড়ে।

১৬ বছর সে সংস্কার তো বটেই, একটা দেশের ফুটবলের চালচিত্র বদলে দেওয়ার জন্যও যথেষ্ট সময়।

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]