নারীর বিরুদ্ধে ধর্মকে ব্যবহারের ঘটনা আমাদের দেশে নতুন নয়। নারীর সঙ্গে ‘না’ শব্দটির মিত্রতা যেন শেষ হওয়ার নয়। নারীকে সম্পত্তিতে সমানাধিকার দেওয়া যাবে না, নারীকে খেলতে দেওয়া যাবে না, নারীকে অভিনয় করতে দেওয়া যাবে না, নারীকে গাইতে-নাচতে দেওয়া যাবে না, নারীকে আয়-রোজগার করতে দেওয়া যাবে না, রাজনীতি করতে দেওয়া যাবে না–আরও কত না না না।
২০২৩ সালের আগস্ট মাসে কেবল ফুটবল খেলা ও খেলার প্রয়োজনেই ছোট প্যান্ট পরার অপরাধে ধর্মের কথা বলে বঙ্গমাতা ফুটবল অনূর্ধ্ব ১৭, খুলনা জেলা চ্যাম্পিয়ন দলের নারী ফুটবলার মঙ্গলী বাগচীকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল স্থানীয় কিছু ব্যক্তি। এই ঘটনায় আরও তিনজন খেলোয়াড় আহত হয়েছিলেন। কয়েকজন অধিকারকর্মী বিষয়টি তদন্ত করে আইনি সহায়তার উদ্যোগ নিলে তৎকালীন খুলনা সদরের এমপির নির্দেশে প্রশাসন ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে তৎপর হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে ভয়ে খেলোয়াড় মেয়েরা ও তাদের পরিবার মুখ খুলতে রাজি হননি এবং এখন তারা খেলাধুলার সঙ্গে নেই। দেশে তখন এই ঘটনার প্রতিবাদ করার মতো পরিস্থিতি ছিল না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঢাকাসহ গ্রামেগঞ্জে বিভিন্ন মাজারে, ওরসে হামলা, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু হামলা, ডাকাতি, দখল, লুটপাট, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের ঘটনা ঘটেছে। যে কোনো গণঅভ্যুত্থানের পর সুযোগ সন্ধানী দুর্বৃত্তরা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের ছয়মাস পরে যখন অন্তর্বর্তী সরকার কিছুটা স্থিতিশীল, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক, তখন ধর্মকে ব্যবহার করে নারীদের লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক।
চলতি সপ্তাহে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে নারীদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল। এই খেলা বন্ধ করতে আগের দিন স্থানীয় কয়েকটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ এলাকার 'বিক্ষুব্ধ মুসল্লিরা’ সেখানে জড়ো হন। উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে ম্যাচের জন্য মাঠ ঘিরে দেওয়া টিনের বেড়া ভাঙচুর করেন। এরপর খেলাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুধু এই ঘটনাই নয়, এ সময়কালে চট্টগ্রামে অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী, টাঙ্গাইলে পরীমনি এবং ঢাকাতে ‘মুসল্লি’দের তোপের মুখে বাতিল করতে হয়েছে অপু বিশ্বাসের অনুষ্ঠান। এসব কীসের ইঙ্গিত বহন করে?
ভিডিও দেখুন:দুই সময়ের তফাতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস উইং এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। বাফুফে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
আমাদের দেশের আইন আদালত নাগরিকদের সমানাধিকারের কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে দেশের প্রশাসন থেকে রাষ্ট্রীয় নীতি, পরিবার থেকে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কোনোকিছুই নারীর স্বাধীনতা ও পূর্ণ বিকাশের পক্ষে নয়। আজ পর্যন্ত আমাদের পরিবার ও সমাজ পুরুষের অনুগত এবং নারীর স্বাধীনতা, সম্মান ও অধিকারের প্রশ্নে নেতিবাচক। সমাজ ও পরিবারে ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরোপিত হয় কেবল নারীর ক্ষেত্রে। পুরুষতন্ত্র ধর্ম রক্ষার নামে নারীকে ছোট করা, আঘাত করা, অসম্মান করা, তার চালচলন, শিক্ষা, পোশাক, কর্মজীবন, ব্যক্তিজীবন সবকিছুকেই গণ্ডিবদ্ধ করে ফেলার চেষ্টা করে। অথচ বছরের পর বছর এদেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ান হয়েছে। সরকারি এমন কোনো সেবা সংস্থা পাওয়া যাবে না যেখানে ঘুষ ছাড়া কার্যসিদ্ধি হয়।
চর দখল, নদী-পাহাড়-বন দখলকারীর অভাব নেই। সরকারি বিভিন্ন পদে থেকে সাধারণ মানুষের গচ্ছিত টাকা থেকে ঋণ নিয়ে ব্যাংক ফাঁকা করে পাচার করে দিয়েছে ক্ষমতাসীনেরা। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের দাপটে ও কারসাজিতে দ্রব্যমূল্য লাগামহীন, নাভিশ্বাস উঠেছে দেশের খেটে খাওয়া কোটি কোটি মানুষের। কৃষক নিজের পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান না। কোনো ধর্মই এই অবস্থাকে অনুমোদন দেয় না। কিন্তু ধর্মকে যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন, তাদের টু শব্দটি নেই।
এখনও পর্যন্ত হাসিনা সরকারের দুর্নীতি-দুঃশাসনের ফিরিস্তি জেনেও অধিকাংশ নাগরিক ও এসব গোষ্ঠী মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। তারা পুরুষত্ব দেখাচ্ছেন কেবল নারীর ওপরে। মেয়েদের খেলাধুলা বিশেষ করে ফুটবল খেলা নিয়ে ধর্মীয় বা সামাজিক বাধা ও আপত্তি নতুন নয়। সে সব প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করেই তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা মেয়েরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলছে। বড় বড় টুর্নামেন্ট জিতে দেশের মুখ উজ্জ্বল করছে। এরপরও ফুটবলে নারীদের সাফল্য সমাজের কিছু পুরুষতান্ত্রিক ধর্মান্ধ গোষ্ঠী মেনে নিতে চায় না। কেবল খেলা নয় তারা নারীদের সকল সৃষ্টিশীল কাজেরও বিরোধিতা করে। তারা এটা বুঝতে চায় না দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর সকল ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ ছাড়া রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
ভিডিও দেখুন:দেশের যে কোনো ক্রান্তিকালে নারীরা তাদের সর্বোচ্চ শক্তি সাহস ও প্রজ্ঞা নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেয়। ২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। এতো বড় গণঅভ্যুত্থানের পরে নারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা বহুমাত্রিক সামাজিক বন্দোবস্তের। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার স্বার্থে ওই সকল গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে নারীদের বারবার লক্ষ্যবস্তু করতে সাহায্য করেছে। কিন্তু সে সময় আমরা পেছনে ফেলে এসেছি। এখন একটি বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ গঠনের আলোচনা জোরেসোরে উচ্চারিত হচ্ছে। কোনো গোষ্ঠী চাইলেই তাদের মতামত চাপিয়ে দেবে এটা হতে পারে না। জুলাই অভ্যুত্থান স্পষ্টভাবেই সে বার্তা দিয়েছে। স্বৈরশাসন বিদায়ের পর কেউ যদি ভাবেন তারা স্বাধীন অর্থাৎ বাধাহীনভাবে যে কোনো স্বেচ্ছাচারী কাজ করবেন তাহলে সেটা খুব ভুল হবে।
ভিডিও দেখুন:স্বেচ্ছাচারিতা এ সমাজ কখনও মেনে নেয়নি। সরকারের উচিত হবে এ ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমাজে নারীর পক্ষে সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া।
আমাদের মনে রাখা দরকার, যারা নারীদের সবকাজেই ‘না’ জুড়ে দেন তারাও এ সমাজের মানুষ। একুশ শতকে এসে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে প্রচার মাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতার সময়ে কেন তারা এ আচরণ করছেন। এটা কী কেবলই দৃষ্টিভঙ্গিগত, নাকি রাজনৈতিক, নাকি অন্য কোন কারণ লুকিয়ে আছে তা অনুসন্ধান করা দরকার। এর সঙ্গে যারা ভাঙচুরের মাধ্যমে ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত করেছেন, তাদের বিচারের আওতায় আনা সরকারের জরুরি কর্তব্য।
লেখক: লেখক ও অধিকার কর্মী
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
আরও পড়ুন:


নারীদের ফুটবল খেলা বন্ধ করতে ভাঙচুরের ঘটনায় মহিলা পরিষদের ক্ষোভ
