ক্লাসে কীভাবে পড়াবেন এই জেন জি’দের?

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠন। সম্প্রতি কোটা আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে এটি গঠিত হয়। এই আন্দোলনে যুক্ত ছাত্রসমাজকে ‘জেন জি’ নামে অভিহিত করা হয়। এই জেন জি’দের ক্লাসে পড়ানোর ক্ষেত্রে যথোপযুক্ত পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এই উপযুক্ত পদ্ধতিটি হচ্ছে ‘সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদ্যা’ বা ক্রিটিক্যাল পেডাগোজি। 

ব্রাজিলিয়ান শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক পাওলো ফ্রেয়ার তার বই ‘পেডাগোজি অফ দ্য অপ্রেসেড’ (১৯৬৮)–এ সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদ্যার প্রতিষ্ঠা করেন, যেটি পরবর্তীতে পুরো দুনিয়াতে সমাদৃত হয়। এটি পোস্টমর্ডানিজম, পোসকলোনিয়ালিজম, পোস্টস্ট্রাকচারালিজম, ফেমিনিজম, মার্ক্সসিজম এর মতো সমসাময়িক তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত।
  
সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদ্যা নিয়ে বলতে গেলে আগে বলতে হয়, সমালোচনামূলক তত্ত্বের (ক্রিটিক্যাল থিওরি) কথা। এটি ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল (১৯২৩ সালে গঠিত মার্ক্সবাদীদের রিসার্চ সেন্টার) থেকে উঠে আসা একটি চিন্তাধারা। এটি বলে, জ্ঞান ও দর্শনের কাজ হচ্ছে সমাজের যে কাঠামোগুলো দ্বারা মানুষ নিপীড়িত ও নিগৃহীত হয় সেগুলো চিনতে, বুঝতে ও ভাঙতে শেখানো। সে হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের কাজ ছাত্রদের শেখানো যে, নিপীড়ন থেকে কীভাবে মুক্তি পেতে হয়।  

একটি শিক্ষাব্যবস্থা ছাত্রের মধ্যে সমাজ, সমাজে তার অবস্থান, সমাজে তার গুরুত্ব সম্পর্কে শেখায়। সমাজে প্রত্যেকের অবস্থান একটি অবকাঠামোর অংশ। ছাত্ররা সমাজে তার অবস্থান যাচাই করতে গিয়ে এই অবকাঠামোগুলো নিয়ে জানতে পারে। শিক্ষার কাজ ছাত্রদের এই অবকাঠামোগুলো নিয়ে সমালোচনা করতে শেখানো। যে কোনো সামাজিক ব্যবস্থা কীভাবে চলছে এবং তা কীভাবে চলা উচিত, এই পর্যালোচনার মাধ্যমে ছাত্রদের মধ্যে সমালোচনার দক্ষতা গড়ে ওঠে।

সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদ্যা বা ক্রিটিক্যাল পেডাগোজি বলে, শিক্ষার কাজ হলো গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। শিক্ষাক্ষেত্রে সমালোচনার মাধ্যমে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সচেতনতা তৈরি করে যে কোনো ধরনের বৈষম্য থেকে সমাজকে মুক্ত করাই এর দায়িত্ব। ছাত্রদের মধ্যে এই সচেতনতা শিক্ষার শুরু থেকে প্রতিটি স্তরেই তৈরি করতে হয়। এই ক্রিটিক্যাল পেডাগোজি বা সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদ্যা ভাষা, অঙ্ক, বিজ্ঞান, মানবিক, প্রযুক্তি ইত্যাদি যেকোনো বিষয়েই প্রয়োগ উপযোগী।

সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদ্যা বা ক্রিটিক্যাল পেডাগোজি শেখার তাত্ত্বিক জ্ঞানকে ব্যবহারিক কাঠামোতে রূপান্তরের পথ দেখায়। এই শিক্ষাব্যবস্থা ছাত্র-শিক্ষক আলোচনা করে সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তনের পক্ষে। এই চর্চা ক্লাসে প্রতিটি বিষয়েই হতে পারে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে ছাত্রদের মধ্যে সমালোচনামূলক চেতনা (ক্রিটিক্যাল কন্সসিয়াসনেস) তৈরি করা যার উৎস হচ্ছে: সংলাপ (ডায়ালগ), সমালোচনামূলক চিন্তা (ক্রিটিক্যাল থিংকিং) ও সমস্যার সমাধান (প্রব্লেম সলভিং)। ছাত্ররা ক্লাসে সংলাপের মাধ্যমে সমালোচনামূলক চিন্তা গঠন করে সমাজের বাস্তব সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের মধ্যে সমালোচনামূলক চেতনা গড়ে উঠে, যা সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রাখে।

সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদ্যা ‘ব্যাংকিং’ পদ্ধতিতে শিক্ষকের কাছ থেকে ছাত্রের শিক্ষা জমা করার পদ্ধতিকে বাতিল করে ছাত্র নিজে নানা সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করাটাকে বেশি প্রাধান্য দেয়। ছাত্ররা ক্লাসে সংলাপ আকারে আলোচনা করে নিজেরা শিক্ষা পদ্ধতি নির্ধারণ থেকে শুরু করে পরীক্ষা মূল্যায়ন পর্যন্ত, প্রতিটি ধাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি ছাত্রকেন্দ্রিক ক্লাসে শিক্ষকের সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকার কথা বলে।

সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদ্যার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হচ্ছে, সংলাপ। ক্লাসে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে খোলাখুলি সংলাপ যোগাযোগের মাধ্যম শেখানোর ক্ষেত্রে সবথেকে ভালো পন্থা হিসেবে গণ্য হয়। এতে ভিন্নধর্মী মতামত প্রকাশ ও গ্রহণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলশ্রুতিতে গণতন্ত্রের চর্চা ছোট একটি ক্লাসরুমের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।

এর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সমালোচনামূলক চিন্তা (ক্রিটিক্যাল থিংকিং) যেটি গড়ে উঠে, যখন ছাত্ররা শুধু নিষ্ক্রিয়ভাবে জ্ঞানকে শিক্ষকের কাছ থেকে গ্রহণ না করে, বরং প্রশ্ন করে জেনে নেওয়া বা তথ্যকে যাচাই বাছাই করে মূল্যায়ন করা শেখে। ছাত্ররা শেখার ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় ছাত্রদের মধ্যে সমালোচনামূলক চেতনা (ক্রিটিক্যাল কন্সসিয়াসনেস) গড়ে ওঠে, যা সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদ্যার একটি মূল লক্ষ্য।

ছাত্রদের ক্ষমতায়ন সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদ্যার আরেকটি জরুরি বৈশিষ্ট্য। এটি দরকার সমাজে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের জন্য।  ছাত্ররা জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে নিজেদের পরিবর্তন করে সমাজ পরিবর্তনে সোচ্চার হয়। পরবর্তী বৈশিষ্ট্য, সামাজিক সুবিচার, সমাজে নিপীড়ন, নির্যাতন, বৈষম্যকে দূর করার কথা বলে। এটি সম্ভব যখন ছাত্ররা স্বপ্রণোদিত হয়ে সমাজ সংস্কারে অংশগ্রহণ করে।

ক্লাসরুমে শিক্ষক এ শিক্ষার্থীরা। ছবি: ফ্রিপিকএখানে সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদ্যা প্রয়োগের ছোট একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।  ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণীতে অঙ্ক ক্লাসে বার গ্রাফের জন্য তথ্য দেয়া যেতে পারে- সুন্দরবনে একটি এলাকা থেকে ২০২১ সালে ৬৬,৩৪২টি, ২০২২ সালে ৮৩,৬৫৯টি ও ২০২৩ সালে ৯৪,৮৩৭টি গাছ কাটা হয়। এভাবে অঙ্ক ক্লাসে গাণিতিক প্রক্রিয়া শেখানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির উপর যে নির্যাতন চলছে, সেটা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। শুধু তাই নয়, বর্তমান যুগে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বিষয়কে আরেকটি বিষয়ের সাথে সমন্বয় করে শেখানো হয় (ইন্টিগ্রেটেড লার্নিং)। যেমন: একই বিষয় নিয়ে অঙ্ক, ভাষা, বিজ্ঞান বা অন্যান্য ক্লাসে আলোচনা হতে পারে। এই গাছ কাটার তথ্য অঙ্ক ক্লাসে দেখিয়ে ইংরেজি ক্লাসে যদি তাদের বক্তৃতা দিতে দেওয়া হয় সুন্দরবনের প্রকৃতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে, তবে তারা তথ্য সংগ্রহ করে যাচাই–বাছাই করে তা নিয়ে কথা বলতে শিখবে। এভাবে প্রকৃতির বিরুদ্ধে কোনো নিপীড়ন চললে তা নিয়ে সমালোচনামূলক সচেতনতা (ক্রিটিক্যাল কন্সসিয়াসনেস) তৈরি হবে ও এর সমাধানের পথ বের হবে সংলাপের মাধ্যমে। এর পরের প্রক্রিয়া হিসেবে ছাত্ররা সমাজে বিভিন্ন মাধ্যমে এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পারে। নিজেরা গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়ে সমাজ সংস্কারে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে। এভাবে জ্ঞানচর্চার মাধ্যম হিসেবে প্রতিটি বিষয়ে সমাজ সংস্কারের জরুরি বিষয় নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কথা বলে সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদ্যা।

শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে সমাজ পরিবর্তনে অংশগ্রহণ এবং সমাজ পরিবর্তনে অংশগ্রহণ থেকে আবার শিক্ষা গ্রহণ। শিক্ষার্থীরা বিষয়ভিত্তিক বাস্তব সমস্যা সমাধানের জন্য এক সক্রিয় সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গিয়ে সমাজে তাদের মালিকানার চেতনা গঠন করে। শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকে নিজস্ব জ্ঞান তৈরির বিবিধ পদ্ধতি ব্যবহার করে স্বনির্দেশিত ও স্বাবলম্বী মানুষ হওয়ার দক্ষতা অর্জন করে। ক্লাসে নির্দিষ্ট কোনো একক পদ্ধতি শিক্ষকের দিক থেকে চাপিয়ে না দিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজেদের আগ্রহের জায়গা থেকে জ্ঞান চর্চায় নিয়োজিত করা হয়। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একধরণের নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে উঠে যা সমাজ বিনির্মাণে সহযোগিতা করে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা দেখে বোঝা যায় যে, তারা অধিকারের ব্যাপারে সচেতন রয়েছে। সর্বক্ষেত্রে সব স্তরে প্রতিটি ছাত্রের এই চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর ক্লাসরুমে সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদ্যার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বহু আগে থেকেই ছিল এবং তারা এর সুফল ভোগ করছে। আজ এই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ছাত্ররা বাংলাদেশে এর যথার্থতা প্রমাণ করে দিল। এখন দরকার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এটাকে গ্রহণ করে নেওয়া। শিক্ষাবিদেরা ও সুধী সমাজ যত তাড়াতাড়ি এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারবে, দেশের জন্য ততই মঙ্গল।    

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]