আমাদের সবার প্রিয় শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার এমন অকালে না ফেরার দেশে চলে যাবেন কখনও ভাবিনি! স্যারের সঙ্গে আমাদের সবার অসংখ্য সুন্দর ও স্মরণীয় স্মৃতি আছে; বিশেষ করে আমার।
আমি একজন মধ্যমমানের ছাত্রী ছিলাম, যার কারণে স্যারকে নিয়ে আমার পড়াশোনা সংক্রান্ত স্মৃতি নেই, বলা যায়। আমি এবং আমার মতো অনেকেই এসএমআই (সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম) স্যারকে পেয়েছি কখনও বাবার মতো, কখনও বড় ভাই বা কখনও বন্ধু হিসেবে।
আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হই, তখন এসএমআই স্যার ছিলেন ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান। ভর্তি পরীক্ষার ইন্টারভিউয়ে স্যার আমাকে ভালোবেসে দুইবার ‘পাগল মেয়ে’ বলতে বাধ্য হয়েছিলেন! কারণ, সাবজেক্ট সিলেকশনে পাঁচটি অপশনের প্রথম তিনটিতে আমি ‘ইংরেজি’ লিখেছিলাম। স্যার মজা পেয়ে হেসে বললেন, ‘পাগল মেয়ে! ইংরেজি না পেলে কি তুমি পড়বে না?’ আমি চুপ করে ছিলাম।
যাই হোক, ইংরেজিতে পড়ার সুযোগ পেলাম। ইন্টারভিউ শেষে আমি খুশিতে লাফাতে লাফাতে রুম থেকে বের হচ্ছিলাম, স্যার ডেকে বললেন, ‘এই মেয়ে যাচ্ছ, ভর্তি হবে কীভাবে? সার্টিফিকেট তো সব ফেলে গেলে!’
আমি এক দৌড়ে এসে ফাইলটি হাতে নিতেই স্যার হেসে উঠে বললেন, ‘এগুলো সামলে রেখো। পাগল মেয়ে!’
প্রথম বর্ষের নৌবিহারে গেলাম। আমার জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা! মনজুর স্যার সস্ত্রীক গেলেও সারাক্ষণ আমাদের দেখাশোনায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি খেয়েছেন কী না, কোনো অসুবিধা হচ্ছে কী না! এমনকি প্রতিটি মেয়ে কীভাবে বাড়ি ফিরবে তা নিশ্চিত করেছেন রাত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে।
একবার কোনো কারণে চেয়ারম্যান স্যারের সিগনেচার লাগল। স্যারের কাছে গেলে সঙ্গে সঙ্গে সিগনেচার করে দিলেন। এরপর আরেকটি জায়গা দেখিয়ে বললেন, ‘এখানে তোমার বাবার সিগনেচার লাগবে।’ আমি চিন্তিত হয়ে বললাম, ‘আমাকে তাহলে এখন মিরপুর যেতে হবে।’ স্যার বললেন, ‘আচ্ছা দাও, আমি করে দিচ্ছি।’ সিগনেচার করার পর স্যারকে ধন্যবাদ জানালে তিনি মজা করে বললেন, ‘দেখো, আমি তোমার বাবার কাজ করলাম!’
আরেকবার এক নৌবিহারে বন্ধুদের উৎসাহে ডেকে যাত্রার ওপর সহজে উঠলাম। খাড়া সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে একটু ভয় পাচ্ছিলাম, যেহেতু আমি শাড়ি পরেছিলাম। প্রথমে জুতা নীচে ছুঁড়ে মারলাম। তারপর নামার চেষ্টা করছিলাম। এমন সময় এক সিনিয়র ভাই সাহায্যের হাত বাড়ালেন।
কোনো ছেলের হাত ধরে নামার মতো উদার ছিলাম না। তার ওপর ওই ভাইয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচয়ও ছিল না। তাই আমি হকচকিয়ে গেলাম। বললাম, ‘লাগবে না, আমি নামতে পারবো।’
আরও কয়েকবার অনুরোধ করে তিনি বিরক্ত হয়ে সরে গেলেন। কারও সাহায্য ছাড়াই আঁচড়ে-পাঁচড়ে নীচে নামার পর দেখি সামনে মনজুর স্যার! আমার জন্য আরও বিস্ময় বাকি ছিল যেন।
স্যার আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘যাক! এভাবে অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়াবে, আমরা কিন্তু সে সুযোগ দেব না!’ আমি প্রমাদ গুণলাম।
ইংরেজি বিভাগের অ্যালামনাই (English Department Alumni Society–EDAS) বা ডিপার্টমেন্টের যে কোনো গেট টুগেদারে স্যারের সঙ্গে দেখা হলেই আমার নাম ধরে কথা বলতেন। ভাবতাম, নেম ট্যাগ দেখে বলছেন।
একবার আমার মা এবং ছেলে-মেয়েসহ ময়মনসিংহ যাচ্ছিলাম। পথে জয়দেবপুরের এক হোটেলে নাশতা করতে নামলাম। কিছুক্ষণ পর এসএমআই স্যারকে কয়েকজন ভদ্রলোকের সঙ্গে ঢুকতে দেখলাম। স্যারের সামনে গিয়ে সালাম দিলাম। স্যার আন্তরিকতার সঙ্গে বললেন, ‘কেমন আছ, ফারজানা? কী খবর তোমার?’
জানালেন, তারা এখানে প্রায়ই নাশতা করতে আসেন। আমি তো অবাক! স্যার আমার নাম মনে রেখেছেন! ছেলে-মেয়ে এবং আমার মায়ের সামনে আমার গর্বের সীমা ছিল না। সেদিন আবারও পেলাম এসএমআই স্যারের উচ্চ মনের পরিচয়। আর শিখলাম বিনয়ে নত হতে।
কোনো এক EDAS গেট টুগেদারে স্যার জানতে পেরেছিলেন আমি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করি। শুনে মর্মাহত হলেন এবং বললেন, ‘মিথ্যার বেসাতি যেখানে, সেখানে কেন?’
আমি লজ্জা পেয়ে বলেছিলাম, ‘স্যার, আমি সোশ্যাল ইস্যুজ নিয়ে কাজ করি, কমার্শিয়াল না।’ ঐ কথাতেই অনুভব করলাম সন্তানতুল্য ছাত্রদের প্রতি তাঁর অধিকার।
ঠিক তেমনি, যখন জেনেছেন আমি পত্রিকায় কাজ করি, তখন কত খুশি হয়েছেন! সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার এমন একজন শিক্ষক ছিলেন, সকাল ৮টাতেও ক্লাসের ছাত্র উপস্থিতি ছিল শতভাগ, এবং ছিল পিনপতন নিস্তব্ধতা। অন্য ডিপার্টমেন্টের ছাত্ররাও তার ক্লাস করতে আসতো। সিট না পেলেও দাঁড়িয়ে লেকচার শুনতো অনেকেই।
ক্ষুরধার লেকচারের মতো তাঁর শাসনেও ছিল দৃঢ়তা। ‘সকাল ৮টায় ১২টা বাজিয়ে দেব।’– এমন রাগপ্রধান বাক্যে সততার শক্তি বোঝাতেন।
একবার ভাইভা বোর্ডে আমাকে প্রশ্ন করা হলো – ‘এটা উপন্যাস না কি নাটক?’
বলেছিলাম, ‘এটা একটি ড্রামা।’
আমি পড়িনি হলেও স্যার বললেন, ‘পড়তে হয় না। দেখলেই বোঝা যায়, তাই না?’
এভাবেই স্যারের রাগ প্রকাশিত হত প্রকটভাবে, যা আমার চিরজীবনের সাবধান বাণী হয়ে রইল।
একদিন স্যার লেকচার শুরু করেছেন। দুপাশের দরজা ভেজানো। এক মেয়ে বন্ধু পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকার সময় অনুমতি চাইলে স্যার তাকে ঢোকার অনুমতি দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিতে বললেন। আমাদের অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী দেখলাম সেই বন্ধুকে ঢুকে ক্লাসে বসতে এবং দরজা বন্ধ করতে।
স্যার বললেন, ‘দরজা ভাজানোও যে কত নান্দনিক কাজ হতে পারে তা আজ আমরা শিখলাম!’
স্যারের বিরক্তিও প্রকাশিত হতো এত নান্দনিকভাবে।
‘সকাল ৮টায় ১২টা বাজিয়ে দেব।’– এমন বাক্য দ্বারা বোঝাতেন সততার ও দৃঢ়তার শক্তি।
আমার তিনজন বান্ধবী স্যারকে এতটাই পছন্দ করতো যে, ক্লাস না থাকলেও শুধু একনজর দেখার জন্য তার রুমের সামনে দিয়ে যেত।
আমার সৌভাগ্য, স্যারের স্ত্রী স্বনামধন্য শ্রদ্ধেয় সানজিদা আপারও স্নেহ পেয়েছি একসাথে কাজ করার সুবাদে। স্বল্পভাষী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সানজিদা আপা যেন স্যারের অনন্য পরিপূরক।
প্রতিবছর EDAS-এ স্যারের সঙ্গে দেখা হলেও গত বছর সম্ভব হয়নি। এই কষ্ট রয়ে যাবে আজীবন।
‘বাবার মতোই ভালো’ অনন্যসাধারণ এসএমআই স্যারকে আমরা আজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবো।
লেখক: কমিউনিকেশন কনসালটেন্ট, চিত্রনাট্যকার ও গীতিকবি
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



