টাইম ম্যাগাজিনের নিবন্ধ

বাংলাদেশে যেভাবে সত্যিকারের গণতন্ত্র ফিরতে পারে

বাংলাদেশে সম্প্রতি জেন-জি প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের হাত ধরে এক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। নজিরবিহীন বিক্ষোভের মুখে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। শেখ হাসিনা হচ্ছেন সেই শাসক, যিনি ২০০৯ সালে ক্ষমতায় বসার পর থেকে অত্যন্ত কঠোরভাবে দেশ শাসন করেছিলেন। তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গিয়ে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে কয়েক হাজার মানুষ।

শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার পতন হয়েছে এবং এরপর এ ঘটনাকে অনেকেই বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

শেখ হাসিনার পতনের পর চলতি মাসের শুরুতে (৮ আগস্ট) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রক্তক্ষয়ী এক গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষের বহু প্রত্যাশা এখন ইউনূস সরকারের ওপর। 

ছাত্র-জনতার এই গণঅভ্যুত্থান, যাকে বলা হচ্ছে ‘বাংলাদেশ টু পয়েন্ট জিরো’—সেটিকে সফল করতে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের জন্য খুব বেশি অপেক্ষা করা উচিত হবে না। পুরনো ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের মতোই রাখার ব্যাপারে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো স্বার্থ নেই। তারা চাইলে প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার করতে পারে। আবার ভবিষ্যতে নবনির্বাচিত সরকারও তাদের সুবিধার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার করার চেষ্টা করতে পারে। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যদি প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যেতে পারে, সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যত সরকারকে গণতন্ত্রের পথ থেকে সরে যেতে দেবে না। ফলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কার প্রয়োজন—যেমন নিরাপত্তা বাহিনী, সংবিধান ও বিচার বিভাগ।

‘ডিপ স্টেট’-এর লাগাম টেনে ধরা
বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাত একটি গুরুতর বৈধতা সংকটের মধ্যে পড়েছে। এর কারণ হচ্ছে, ছাত্র আন্দোলনের সময় ও এর আগে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল। শেখ হাসিনার পুরো শাসনামলে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক হয়ে উঠেছিল। দেশের বেশির ভাগ মানুষেরই তাদের ওপর কোনো আস্থা ছিল না। ফলে তাদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা হতে পারে এমন আশঙ্কায় শেখ হাসিনার পতনের পর পরই অনেক পুলিশ কর্মকর্তা পালিয়ে গেছেন অথবা গা ঢাকা দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে দেশে বিশাল এক নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। 

এখন মানুষের আস্থা অর্জন ও বৈধতা পাওয়ার প্রথম পদক্ষেপটি হতে হবে সহিংসতার সঙ্গে জড়িত নিরাপত্তাবাহিনীর ইউনিট বিলুপ্ত করা এবং যাঁদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাঁদেরকে সরিয়ে দেওয়া। তাঁদের জায়গায় দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া উচিত এবং নিয়োগের সময় নারী, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত। এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের আমলে যেসব যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হয়নি, তাঁদের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার।

নিরাপত্তা বাহিনীতে এরই মধ্যে রদবদল করা হয়েছে। যারা বিক্ষোভের সময় নৃসংশতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের বদলি করা হয়েছে অথবা চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে সহিংস ঘটনাগুলোর তদন্ত হওয়া উচিত এবং এসবের সঙ্গে যেসব কর্মী জড়িত, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং গোপন বন্দিশালা পরিচালনা করত, তাদের অবশ্যই সংস্কার করা দরকার। নিরাপত্তা বাহিনীকে অবশ্যই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। সকল নাগরিকের নিরাপত্তার স্বার্থেই নিরাপত্তা বাহিনীকে সকল ব্যবসায়িক স্বার্থ পরিত্যাগ করে অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দেওয়া উচিত।

বলার অপেক্ষা রাখে না, একটি স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে নিরাপত্তা বাহিনীকে তত্ত্বাবধান করা দরকার। এমনকি তাদের দিক নির্দেশনা দেওয়ার ও তত্ত্বাবধানের জন্য জাতিসংঘকেও আহ্বান জানানো যেতে পারে।

সাংবিধানিক সংস্কার
বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর হাতে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। দেশে নামমাত্র স্বাধীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একটি সম্পূর্ণ নির্দলীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘রাষ্ট্রপতি’ পদের পুর্নগঠন দরকার এবং এটিই হওয়া উচিত সংবিধান সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্রপতি নিয়োগের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর একতরফা চর্চা বাতিল হওয়া উচিত। বর্তমান ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করতে বাধ্য হন। সেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য নেই। এই বিধানগুলো অবশ্যই বাতিল হওয়া উচিত। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে নির্দলীয় বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ নিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রধানদের নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন। এটি করা হলে নির্বাহী প্রভাব রোধ হবে এবং এই প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক চাপমুক্ত থেকে কাজ করতে পারবে।

সরকারের ওপর আরও আইনি তদারকির বিষয়টি সংবিধানে যুক্ত করা উচিত। আর সবার আগে যেটি করা প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে, সংসদ সদস্যদের তাদের দলের পক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ বাতিল করা।

বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিমুক্ত করা

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এরই মধ্যে বিচার বিভাগীয় সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে সরকারের পছন্দ-অপছন্দ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশনসহ সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব থেকে রক্ষা করতে হবে। নির্বাচনের আয়োজন করার আগে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা জরুরি।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ অবশ্যই রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী একটি স্বাধীন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে করা উচিত। আর কোনো একক দল যাতে প্রক্রিয়াটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সে জন্য সংসদীয় অনুমোদনের বিধান রাখা দরকার।

অতীতে বাংলাদেশ যেসব ভুল করেছে, সেসব ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার একটি অমিত সুযোগ এনে দিয়েছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এখনই সময় জনগণের নেতৃত্বে, জনগণের জন্য একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার।

লেখকদ্বয়:
সাবরিনা করিম কর্নেল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক। তিনি বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিয়ে গবেষণা করেছেন। 
মুহিব রহমান কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি বিভাগে পোস্ট-ডক্টরাল সহযোগী।

(নিবন্ধটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী ‘টাইম’ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত এবং ঈষৎ সংক্ষেপিত)

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]