পেশাদার পরিচালনাই দিতে পারে টেকসই কাঠামো

ক্রীড়াঙ্গনে অগ্রাধিকার শব্দটি একবারেই অনুপস্থিত। এখানে সেই গাধা ও তার মনিবের মতো সবাইকে খুশি করা ট্র্যাডিশন অব্যাহত রয়েছে। ফলে নতুন নতুন সংস্থা গজানোর সুযোগ যেমন থাকছে, তেমনি তুষ্ট করা হচ্ছে সবাইকে।

ক্রীড়া বাজেটপূর্ব আলোচনা

খেলা আমাদের কাছে বিনোদন বা বিলাসিতা। ফলে গুরুত্বও কম। আর অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গেই তো সব সময় আমাদের বাস। ফলে বাজেটে ক্রীড়ায় বরাদ্দ কম হবে, সেটা অনুমান করা কঠিন না। অনেক ছোট দেশের তুলনায় আমাদের ক্রীড়া বাজেট কম। কর্মকর্তাদের অদূরদর্শিতা ও গাফিলতির কারণে এই বাজেটে তারমত্য ঘটে না। অবাক করা বিষয় হলো, প্রতি বছর জানুয়ারি মাস থেকেই শুরু হয় বিভিন্ন খাতের বাজেট নিয়ে আলোচনা। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে অন্তত দুই শতাধিক মিটিং হয়। অথচ ৫৩ বছরেও বাংলাদেশের ক্রীড়াসংগঠকেরা বাজেট সংক্রান্ত কোনো মিটিং ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে করেনি। তাঁদের দাবি-দাওয়ার কথা বলেনি। কারণ, তাঁদের কোনো তাগিদই ছিল না। বছর পাঁচেক আগে এ নিয়ে একটি রিপোর্ট করার সময় এক কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি জানতে চেয়েছিলাম। তাঁর উত্তর ছিল, এমন প্রশ্নের মুখোমুখি তিনি এই প্রথম হচ্ছেন।

এ তো গেল সরকারি বরাদ্দের বিষয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সংগ্রহেও তারা পড়ে আছে মান্ধাতার আমলে। কোনো ফেডারেশনেই একটা কমার্শিয়াল কমিটি নেই। এমনকি বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনেও (বিওএ) না। কোনো ফেডারেশন নিজেদের ব্র্যান্ডিং করে না, করতে সক্ষমও নয়। প্রয়োজনও বোধ করে না। এমনকি কারও কোনো স্থায়ী স্পনসর বা পৃষ্ঠপোষক নেই, যেটা পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই আছে। ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটির স্থায়ী পৃষ্ঠপোষক থাকে। এ নিয়ে বাংলাদেশ অলিম্পিক কমিটিকে বিভিন্ন সময় বলে কোনো লাভ হয়নি। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে হলে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনার মডেল অনুসরণের বিকল্প নেই। পক্ষান্তরে অর্থ কেবল পেলেই হবে না। এর কার্যকর ও পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

বরাদ্দ বাজেটের ব্যয়

জাতীয় বাজেটে যে কয়টি খাতে বরাদ্দ সবচেয়ে কম, ক্রীড়া এর একটি। সেখানেও যে বাজেট বরাদ্দ হয় এর সিংহভাগ চলে যায় অবঠাকমো উন্নয়নে। এরপর আছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য বিষয়াদি। এসব ব্যয় মিটিয়ে যা থাকে, সেটাতেই হয় খেলাধুলার উন্নয়ন। এই অবশিষ্ট অর্থ আবার ভাগ হয় ৫৫টি ফেডারেশনের মধ্যে।

খেলাধুলায় অগ্রাধিকার প্রশ্নে বিভিন্ন সময় ক্রীড়ামন্ত্রীরা সব খেলার চর্চা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেন। ‘অগ্রাধিকার’ শব্দটি তাঁদের কাছে অপরিচিত। তাঁদের কাছে বিজ্ঞান ও যুক্তিসঙ্গত ভাবনার স্থান কোনোদিন ছিল না। তাঁরা সবাইকে খুশি করার রাজনীতিই করেছেন। অথচ এই ইনক্লুসিভিটির ভাবনা একবারেই সঠিক নয় বলেই খেসারত দিচ্ছে ক্রীড়াঙ্গন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শারীরিক গঠন, খাদ্যাভ্যাস, আবহাওয়া ইত্যাদি বিবেচনায় ব্যক্তিগত ক্রীড়ায় আমাদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দলগত ক্রীড়া সেই তুলনায় কম। এ জন্য দলগত ও ব্যক্তিগত কোন খেলাগুলোকে আমরা অগ্রাধিকার দেব, সেটা খুবই বিচক্ষণতার সঙ্গে, বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাছাই করতে হবে। এখানে আবেগের কোনো স্থান নেই। এমনকি কে ব্যাজার হলো আর কে খুশি–সেটা ভাবারও অবকাশ নেই। কারণ এ অর্থ জনগণের।

এ জন্য কিছু ফেডারেশনকে একেবারেই বাদ দিতে হবে। বাকি ফেডারেশনগুলোকে বিগত ৫ বছরের সাফল্য, শৃঙ্খলা, সুশাসন, উন্নয়ন ও সু-উদ্যোগের ভিত্তিতে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। বার্ষিক সাফল্যের নিরীখে প্রতি বছর প্রতিটি পর্যায় থেকে দুটি করে ফেডারেশনের উন্নয়ন ও অবনয়ন হবে। এক নম্বর পর্যায়ে থাকা ফেডারেশনগুলো সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ পাবে। এরপর দুই নম্বরেরগুলো। তবে তৃতীয় ধাপেরগুলো কোনো বরাদ্দ পাবে না। নিজেদের উপার্জিত অর্থেই চলতে হবে।

ফেডারেশন, বোর্ড, অ্যাসোসিয়েশন ক্লাব

আমাদের জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশন, বোর্ড, অ্যাসোসিয়েশন, ক্লাব ও সংস্থাগুলো রাজনীতিবিদ, আমলা ও তাদের আত্মীয়-পরিজনদের অভয়ারণ্য। বস্তুত তাদের কাছে জিম্মি। জাতীয় স্বার্থ নয়, এই স্বার্থান্বেষী মহলের কাছে সবসময়ই প্রাধান্য পায় নিজেদের স্বার্থ। কোনো জবাবদিহি না থাকায় তারা বল্গাহীন। এরা আবার রাজনৈতিক দল ও মতাদর্শ নির্বিশেষে যুথবদ্ধ। এদের কাছে সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্রীড়াবিদেরা। তারা চরম বঞ্চনা ও উপেক্ষার শিকার। প্রতিটি ফেডারেশনের দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যাবে বঞ্চনার করুণ কাহিনি।

ক্রীড়াঙ্গনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। ১৯৯৬‑পরবর্তী সময়ে সেটা বাস্তবায়িত হলেও বস্তুত বিষয়টি হয়ে যায় বুমেরাং। গণতন্ত্রের মোড়কে স্বেচ্ছাচারিতা প্রকট হতে থাকে। এতে পরীক্ষিত সংগঠকেরা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে সরে যেতে বাধ্য হন। ক্রীড়াঙ্গন হয়ে পড়ে দক্ষ সংগঠক শূন্য। এই সুযোগে এক শ্রেণির কর্মকর্তারা হয়ে ওঠেন লাগামহীন। 

দশকের পর দশক ধরে গদি আঁকড়ে থাকায় ক্রীড়াঙ্গন পিছিয়েছে বহু যোজন। এদের কারণেই ক্রীড়াঙ্গনকে নানা প্রতিকূলতা, ঔদাসীন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। এখানে অব্যবস্থা আর অনিয়মই রীতি। আমাদের ক্রীড়াবিদদের লড়াইও অতএব চলতেই থাকে। তাদের প্রতিপক্ষ কেবল অন্য দল বা দেশ নয়, ফেডারেশনের পরিচালন ব্যবস্থাও। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন যেন এক সুদুরপরাহত স্বপ্ন।

আগাছা, পরগাছাহীন পরিচ্ছন্ন ক্রীড়াঙ্গনের জন্য চাই আমূল সংস্কার। সব ফেডারেশন, বোর্ড, ক্লাব ও সংস্থাকে জরুরিভিত্তিতে পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ গ্রহণই এর একমাত্র উপায়। এ জন্য চাই নতুন নীতিমালা। যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে, এখন থেকে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হবে একজন যথাযোগ্য প্রধান নির্বাহীর নেতৃত্বে এবং পেশাদার ব্যবস্থাপকদের দ্বারা। অবৈতনিক কাঠামোর দিন শেষ। বেতনভূক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই প্রতিদিনের বিষয়গুলো পরিচালনা করবেন। একটি ছোট নির্বাহী পরিষদ থাকলেও তাঁরা সব ব্যাপারে নাক গলাতে পারবেন না। এই নির্বাহী কমিটি হবেন দলমত নির্বিশেষে পরীক্ষিত দূরদর্শী সংগঠকদের সমন্বয়ে গঠিত, যেখানে সিংহভাগ থাকবে পেশাদার ক্রীড়াবিদ। প্রতিটি স্তরে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ দ্বারা স্বচ্ছ পদ্ধতিতে পরিচালন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা বস্তুত সময়ের দাবি। 

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব ও সময়োপযোগী গঠনতন্ত্র থাকতে হবে, যা কোনোভাবেই জাতীয় ক্রীড়ানীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না। সম্প্রতি ক্রীড়া উপদেষ্টা সব ফেডারেশনের গঠনতন্ত্র পরিমার্জনের কথা বলেছেন। ক্রীড়ানীতি করে তবেই এই পরিমার্জন হবে যথার্থ।

উল্লেখ্য, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাবে না। কিংবা বদলানোর কিংবা জবরদখলের সাহস কেউ দেখাতে পারবে না। কোনো সংস্থা মনোনীত কোনো ব্যক্তিকে সরকার বদলের সঙ্গে পদত্যাগে বাধ্য করা যাবে না। ঠিক যেটা ঘটেছে ক্রিকেট বোর্ডের ক্ষেত্রে। দুজন পরীক্ষিত ও সম্মানিত সংগঠককে বাদ দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। যেটা কোনোমতেই কাম্য ছিল না। এমনকি এতটা তাড়াহুড়ার প্রয়োজন ছিল না। কারণ, মাত্র দিন কয়েকের মধ্যেই অনেক পদ শূন্য হয়েছে। আর ক্রীড়া পরিষদ এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কী প্রমাণ করতে কিংবা কাকে খুশি করতে চাইল? বরং তারা ক্রিকেটের ক্ষতিই করল। এই প্রশ্ন এখন উঠতেই পারে, পরিবর্তে যাঁরা এসেছেন তাঁরা কি ওই দুজনের চেয়ে যোগ্য?

অন্যদিকে যারা স্থলাভিষিক্ত হলেন, তাদেরই‑বা এত তাড়া কিসের ছিল? আদতেই যাঁরা স্থলাভিষক্ত হলেন, তাঁরা নিজেদের কতুটুকু সম্মানিত করতে সক্ষম হলেন? এই পরিস্থিতিতে তাঁদের কাছে প্রতিবাদ কি প্রত্যাশিত ছিল না? কিন্তু সেই ঔদার্য তাঁরা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। যা হোক, ভবিষ্যতে এই উদাহরণ সৃষ্টি যাতে না হয়, কোনো যোগ্য সংগঠককে কেউ অসম্মানিত করার দুঃসাহস দেখাতে না পারে, সেই ব্যবস্থা সুনিশ্চিত ও সুসংহত করাটাই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত।

ক্রীড়াঙ্গনে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প কোনদিন ছিল না, আজও নেই। অথচ সেটা সম্ভব হয়নি রাজনীতিক ও আমলাদের কারণে। তাঁদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধনেই অনেক অনিষ্ট হয়েছে। ঘটেছে অনৈতিক কর্মকাণ্ড। পরিবারতন্ত্র আমাদের ক্রীড়াঙ্গনকে পিছিয়ে দিয়েছে। সংস্কারে এটা প্রাধান্য পাবে। কারণ, ইতিমধ্যে কোথাও কোথাও পরিবারতন্ত্রের অশুভ ছায়া বিস্তার করতে শুরু করেছে। এই বিষয়কে হাল্কা করে দেখার উপায় নেই।

এ ছাড়া কর্মকর্তাদের মনোভাবেরও রূপান্তর ঘটাতে হবে। ভুলে যেতে হবে ক্লাব, ফেডারেশন বা বোর্ড তার ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়। প্রতিদিন আসার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। যে কেউ যখন-তখন সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হতে পারবেন না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই থাকবেন একজন মুখপাত্র। প্রয়োজনে তিনিই কথা বলবেন। সভাপতি কালেভদ্রে কথা বলতে পারেন। অথচ ক্রিকেটের নতুন সভাপতিও পেশাদার মানসিকতা দেখাতে ব্যর্থ। প্রতিদিনই বলতে গেলে তিনি কথা বলছেন। সব সমস্যার সমাধান তিনিই করছেন। সব সিদ্ধান্তই বোধকরি তিনিই নিচ্ছেন। তাহলে প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপকদের কাজ কী? এত টাকা দিয়ে কেনই‑বা তাঁদের রাখা হয়েছে?

এই চর্চা থেকে নিজেদের সংযত করতে হবে। সামলাতে হবে মিডিয়া কভারেজের লোভ। সার্বিকভাবে এই রাহু থেকে ক্রীড়াঙ্গনকে মুক্ত করতে পারলে মিলবে প্রত্যাশিত সাফল্য। এর সূচনা করতে হবে একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে। ক্রীড়াঙ্গনে পেশাদার পরিচালন ব্যবস্থাতেই ত্বরাণ্বিত হবে টেকসই উন্নয়ন।

সম্প্রতি ৪২ ফেডারেশনের সভাপতিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পেশাদার কাঠামো বাস্তবায়ন হলে প্রতিবার সরকার বদলের সঙ্গে এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটবে না।

(চলবে)

লেখক: সাংবাদিক

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]