স্বাধীনতায় কি শর্ত চলে?

স্বাধীনতা। এই শব্দটি আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বেই বহুল চর্চিত। এই শব্দের ব্যবহারিক চর্চা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই দেশে দেশে আন্দোলন হয়, বিদ্রোহ হয় অঞ্চলে অঞ্চলে। একদল মানুষ নিজেদের স্বাধীনতা অর্জনের জন্যই অন্যের সাথে লড়াই করে। সেই লড়াইয়ে জিততে পারলে বলা হয়, স্বাধীনতা মিলেছে। কিন্তু আদৌ কি পূর্ণ স্বাধীনতা মেলে?

স্বাধীনতা শব্দের ব্যবচ্ছেদ আগে করে ফেলা যাক। বাংলায় এই শব্দের সমার্থক হিসেবে পাওয়া যায় ‘স্বাধীনের ভাব’, ‘অপরাধীনতা’ ও ‘স্বাতন্ত্র’। ইংরেজিতে Independence শব্দের অর্থ হিসেবে ব্রিটানিকা ডিকশনারি বলে, ‘freedom from outside control or support: the state of being independent’। কলিন্স ডিকশনারি বলে, কারও স্বাধীনতা বলতে বোঝায়, ওই ব্যক্তি অন্য কারও ওপর নির্ভরশীল নয়। সুতরাং, স্বাধীনতা মানেই হলো কারও সমর্থন ছাড়া মাথা উঁচু করে চলা। একইসঙ্গে স্বাধীন থাকার অর্থ হলো, বাইরের কারও নিয়ন্ত্রণে না থাকা। আড়ালে কেউ কলকাঠি নাড়লে এবং আপনি তাতে নড়েচড়ে গেলে বলতেই হবে যে, আপনি আসলে স্বাধীন নন!

এবার এ দেশের প্রসঙ্গে আসা যাক। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় বাংলাদেশের। পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ৫৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই দেশ সার্বভৌম, এখানকার সরকারও স্বাধীন। কিন্তু কখনোই কি আসলে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পেরেছে মানুষ? অন্তত এ দেশের সংঘাতময় রাজনৈতিক ইতিহাস দেখলে তা মনে হওয়ার জো নেই। কারণ, এই রাজনৈতিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক পট পরিবর্তনের পেছনে আমরা জনতার বিক্ষোভ কোনো না কোনোভাবে দেখেছি। প্রশ্ন তোলাই যায় যে, সেই জনগণের সংখ্যা নিয়ে। কিন্তু সেখানে গণ যে ন্যূনতম মাত্রায় হলেও উপস্থিত ছিলই, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই।

অর্থাৎ, এক কথায় বলাই যায় যে, পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের মানুষেরা এর পরবর্তী সময়েও স্বাধীনতার অভাববোধ করেছেন কোনো না কোনো মাত্রায়। ফলে বারংবার বিভিন্ন দলের বা ব্যক্তির শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিক্ষোভ হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে। কখনো সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে হয়েছে, কখনো দলীয় একচেটিয়া শাসনের বিরুদ্ধে হয়েছে। এরপর দেশের সেই আন্দোলনরত মানুষেরা স্বাভাবিকভাবেই হাফ ছেড়ে হয়তো ভেবেছেন, ‘স্বাধীনতা এবার অবশেষে এল!’ তবে তা যে সত্যিকার অর্থে আসেনি, তা তো এই দেশের দ্বন্দ্ব ও সংঘাতমুখর রাজনৈতিক ইতিহাসই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

এর কারণ কী আসলে? ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রায় প্রত্যেকবারই ওই আন্দোলনের সুফল হিসেবে পাওয়া ‘স্বাধীনতা’র সঙ্গে ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ও ‘তবে’ যুক্ত হয়েছে। পদে আসীন ব্যক্তিরা ক্ষমতায় গিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই বলে ওঠে এমনতর কথা–‘আমরা স্বাধীনতা নিশ্চিত করতেই চাই। তবে…।’ আর এই ‘তবে’ দিয়ে যখনই স্বাধীনতাকে শর্তাধীন করা হয়, বলা হয়–অমুক স্বাধীনতা পেতে পারে ‘কিন্তু’ তমুকের পাওয়া উচিত নয়, ঠিক তখনই স্বাধীনতা হয়ে যায় পরাধীনতা। যখনই চাপিয়ে দেওয়া নিয়ন্ত্রণে আপনাকে বেঁধে ফেলার চেষ্টা হয়, তখনই আসলে আপনার স্বাধীনতার পতন হয়।

প্রতীকী ছবিতো, এই ঘরানার কর্মকাণ্ড কি এ দেশে নতুন? না, কখনোই নয়। বরং এতটাই নিয়মিত যে, কখনোই এ দেশের জনগণের প্রকৃত স্বাধীনতার আস্বাদ আর পাওয়া হয় না। যেমন ধরুন, নিজের অভিজ্ঞতার কথাই বলি। শিক্ষাজীবন শেষ করার মধ্যেই এ দেশের স্বাধীনতা লাভের ইতিহাসের আমরা এত এত ‘সরকারি’ ভার্সন দেখেছি ও পড়েছি যে, বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের একটি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিই হয়তো রচনা করা সম্ভব হবে না। একেক দল বা পথের মানুষেরা যে যখন ক্ষমতায় গেছেন, তারা ঠিক নিজেদের পছন্দমতো ইতিহাসের প্রচার চালিয়ে গেছেন। ফলে বারবার সাধারণ জনগণের সংগ্রাম রয়ে গেছে সাধারণই। বরং প্রত্যেক বিক্ষোভেরই স্টেকহোল্ডার তৈরি হয়েছে, যারা কিনা সেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কাজটিই করে গেছেন। সেই সাথে কুক্ষিগত হয়েছে জনতার পূর্ণ স্বাধীনতা লাভের আকাঙ্ক্ষাও।

ফলে পরিবর্তনের কথা বললেও আদৌ পূর্ণ পরিবর্তন কখনোই আসেনি। আর যখন স্বাধীনতাই শর্তাধীন হয়ে পড়ে, তখন আসলে মানবাধিকারও হয়ে পড়ে ‘কন্ডিশনাল’। এই অবস্থায় সবাই শুধু গোত্র খোঁজে। নিজের গোত্রের হলেই ওঠে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, আবার বিরোধী পক্ষের হলেই মন্তব্য আসে–‘ওদের জন্য আবার কীসের মানবাধিকার?’ আর এভাবেই দিন যায়, রাত যায়, আলোর দেখা আর মেলে না। সত্যিকারের ইনক্লুসিভিটির টিকিটিও দেখা যায় না। এ নিয়ে দিয়ে যেতে হয় কেবল নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তিই।

তাহলে এই দেশের মানুষ কোন অবস্থায় আছে?

এ ক্ষেত্রে চলুন গণিতের দিকে চোখ মেলা যাক। গণিতের একটি অংশে সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। যারা এ বিষয়ে একটু খোঁজখবর রাখেন, তারা হয়তো ‘কন্ডিশনাল ইনডিপেনডেন্স’–এর নাম শুনে থাকবেন। একে ‘কন্ডিশনাল প্রবাবিলিটি’ নামেও ডাকা হয়ে থাকে। সম্ভাব্যতার এই বিশেষ গাণিতিক সূত্র অনুযায়ী, এই অবস্থায় একটি ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা মানেই হলো অন্য আরেকটি ঘটনা ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে। অর্থাৎ, ওই ঘটনাটি ঘটে গেছে দেখেই একটি ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে কেবল।

বাংলাদেশের মানুষেরা সম্ভবত ওই চক্রেই আটকে গেছেন চরমভাবে। যা ঘটছে, সবই কোনো না কোনো কিছুর প্রতিক্রিয়া কেবল। সেই প্রতিক্রিয়া আবার হাজারো প্রতিক্রিয়ারই জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই এক প্রতিক্রিয়াতে খারিজ হচ্ছে আরেক প্রতিক্রিয়া। আবার প্রতিক্রিয়া গৃহীতও হচ্ছে ঠিক সেভাবেই। কিন্তু কোনো সঠিক ও মৌলিক ‘ক্রিয়া’র সন্ধান যেন ঠিক মিলছে না।

তারপরও, চাষারা তো আশায় ভেলা ভাসিয়েই বাঁচে। আমাদের মতো চাষাদের তো ওটিই একমাত্র সম্বল!

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]