শেখ হাসিনার একনায়কতান্ত্রিক সরকারের পতনের ছয় সপ্তাহ পর, গত ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের শীর্ষ কূটনীতিক প্রণয় ভার্মা। দিল্লি এতদিন ‘এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখা’ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ার পর এই সাক্ষাতকে নীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর, ভারতীয় হাইকমিশনারের এ পদক্ষেপের আগেই যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, চীন, পাকিস্তান ও রাশিয়ার শীর্ষ কূটনীতিকেরা বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।
আওয়ামী লীগকে ভারতের সকল মৌসুমের মিত্র হিসেবে মনে করা হয়। সে হিসেবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায়, নয়াদিল্লি নতুন কৌশল নিতে কিছুটা সময় নিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানান, তাদের সরকার বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।
তবে আওয়ামী লীগের বাইরে অন্য দলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যোগাযোগ ভারতের কৌশলে পরিবর্তনেরই স্পষ্ট ইঙ্গিত। অনেকেই বলছেন, শুধু আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর নির্ভর না করে, আগে থেকেই দিল্লির উচিত ছিল বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিসরে এই সম্পর্ককে বিস্তৃত করা।
বৈঠক শেষে স্থানীয় গণমাধ্যম বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে উদ্ধৃত করে জানায়, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক কীভাবে গভীর ও মজবুত করা যায়, সে বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেছি।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরও বলেন, ‘তাদের (ভারতীয় হাইকমিশনের) প্রধান বার্তা হলো, তারা বাংলাদেশ সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে চায়। বিশেষ করে এই পরিবর্তনের পর তারা ইতিমধ্যে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সঙ্গেও তারা সম্পর্ক দৃঢ় করতে আগ্রহী।’
এদিকে, গত ২৬ সেপ্টেম্বর ভারতের পত্রিকা দ্য হিন্দু-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে আশাবাদ’ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, অতীতেও, বিশেষ করে ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের আগে, বিএনপি একাধিকবার ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে সেই উদ্যোগগুলো সফল হয়নি। দ্য হিন্দু তাঁকে উদ্ধৃত করে জানায়, ‘ভারত সব ফল একটি ঝুড়িতেই রেখেছিল, তাই তখন আমাদের উদ্যোগ সফল হয়নি। এখন দ্রুত গতিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় শুরু করতে হবে। আমরা সবসময় ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক চেয়েছি।’
তবে, আদানির সাথে ‘অসম’ বিদ্যুৎ-ক্রয় চুক্তি এবং মোদি-হাসিনা উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গের গেদে ক্রসিং থেকে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি হয়ে ভুটান সীমান্তের কাছে হাসিমারা-দলগাঁও পর্যন্ত রেলসংযোগ পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি, মির্জা ফখরুল দ্য হিন্দু-কে বলেন, ‘সীমান্ত হত্যা এবং পানিবণ্টনের মতো ইস্যুগুলোকে কার্যকরভাবে সমাধান করার মাধ্যমেই সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।’
গত পনেরো বছরের বেশি সময় ধরে ভারতীয় প্রশাসন নিরবচ্ছিন্নভাবে শেখ হাসিনার পাশে থেকেছে, যদিও ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ব্যাপকভাবে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনার প্রতি জনসমর্থন ও ভোটারদের আস্থা ক্রমশ কমতে থাকে। জনতার অসন্তোষ বাড়লেও, বিস্ময়করভাবে ভারত অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর পরিবর্তে কেবল শেখ হাসিনা বা তাঁর দলের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক ও নির্লজ্জ কারচুপি জবাবদিহিকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। দুর্নীতি, অর্থপাচার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ছিল সর্বগ্রাসী। হাসিনার শাসনামলে শুরু হয় নতুন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন। সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে গুমের ঘটনা–বহু মানুষকে বছরের পর বছর গোপন কারাগারে বন্দী করে রাখার বিষয়টি পুরো জাতিকে হতবাক করে দেয়।
উল্লেখযোগ্য ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আজমি এবং ব্যারিস্টার আহমাদ বিন কাসেম আরমান। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত কুখ্যাত গোপন বন্দিশালা থেকে মুক্তি পান তাঁরা ।এই দুজন দীর্ঘ আট বছর গোপন বন্দিশালায় আটক ছিলেন। এ সময় তাঁদের পরিবার-পরিজন জানতেন না, তাঁরা আসলে বেঁচে ছিলেন, না মারা গেছেন।
এসব কারণ এক হয়ে এক সময়ের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাধর শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগকে ঘিরে মানুষের হতাশা তীব্র হতে থাকে। কর্তৃত্ববাদী শাসন ও অনিয়মের কারণে এই হতাশা তীব্র ক্ষোভে পরিণত হতে থাকে, যা শেষ পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
শুধু শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বেশির ভাগ বাংলাদেশি পছন্দ করেনি। তাঁর সরকার অশুল্ক বাধা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন সমস্যা এবং সীমান্তে হত্যা বন্ধের মতো বিষয়গুলো কার্যকরভাবে সমাধানে ব্যর্থ হওয়ায় জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। তা সত্ত্বেও, হাসিনা তাঁর সরকারের ভারতের প্রতি অবদানের কথা বারবার উল্লেখ করেছেন। একবার তিনি বলেছিলেন, ভারত ‘চিরকাল মনে রাখবে’ তাঁর সরকার কী কী করেছে প্রতিবেশীর জন্য। যদিও তিনি নিজে বিনিময়ে কিছু চান না বলেও জানিয়েছিলেন।
নয়াদিল্লির উচিত বাংলাদেশে অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং প্রতিবেশী দেশের সরকার ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া। নেপাল ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলো সাম্প্রতিক সরকার পরিবর্তনের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে। এ ছাড়া পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও এখন উত্তেজনাপূর্ণ।
বিশ্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রতিটি দেশই অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া কোনো দেশই এগিয়ে যেতে পারে না। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক-এর পুনরুজ্জীবন এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে নির্ধারিত সম্মেলন বাতিল হওয়ার পর থেকে সার্ক কার্যত অচল হয়ে আছে। তবে আঞ্চলিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় এটি আবারও কার্যকর হতে পারে।
২০১৬ সালে ভারতের উরি সন্ত্রাসী হামলার পর আঞ্চলিক কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণে সার্ক সম্মেলন বাতিল করা হয়। ভারতের সম্মেলন বর্জনের পর বাংলাদেশ, ভুটান ও আফগানিস্তানসহ আরও কয়েকটি দেশ এতে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। সর্বশেষ সার্ক সম্মেলন ২০১৪ সালে কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারপর থেকে আর কোনো সম্মেলন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। সার্কের অগ্রগতির প্রধান অন্তরায় হচ্ছে ভারত-পাকিস্তানের স্থায়ী বৈরিতা।
এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের কিছু রাজনৈতিক দল বিভাজনমূলক রাজনীতির চর্চা করে, যার প্রধান উদ্দেশ্য নিজেদের দেশে মেরুকৃত ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করা। এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি, যা দক্ষিণ এশিয়ায় ‘জনগণের সঙ্গে জনগণের’ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যদি ইউরোপ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা সামরিক সংঘাত এবং সামাজিক বিভাজন পেছনে ফেলে একত্রিত হয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়া কেন একই পথে এগিয়ে যেতে পারবে না? দক্ষিণ এশিয়ায় তো এমন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ইতিহাসও নেই। পারস্পরিক সুযোগ ও সুবিধার জন্য অর্থনীতি, সমাজ এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়া কি সম্ভব নয়?
২৭টি দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন একক মুদ্রা, অভিন্ন পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি, এবং সাধারণ নাগরিক অধিকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংহতি অর্জন করেছে। তারা অভিবাসন ও বিচারিক বিষয়েও একসাথে কাজ করে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার জন্য শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে?
(এই নিবন্ধটি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনূদিত।)
লেখক: সহযোগী সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]