ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে তাঁর সরকারের দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে।
হাসিনার পতন তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও সুবিধাভোগী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের জন্যও একটি বড় ধাক্কা। অনেকে মনে করেন, রাজনৈতিকভাবে এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে ভারতের (পড়ুন মোদির) সমর্থন ছাড়া শেখ হাসিনা এতদিন টিকে থাকতে পারতেন না। বিনিময়ে, হাসিনার কাছ থেকে সীমান্তবিষয়ক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়েছিল ভারত। হাসিনার নিজের স্বীকারোক্তি অনুসারে, ‘আমি যা দিয়েছি, ভারত তা সারা জীবন মনে রাখবে।’ বাংলাদেশের অনেকের দাবি, ‘ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে’ হাসিনা ও তাঁর দল ক্ষমতা দখল করে ছিল।
এখন সেসবের দিন শেষ। হাসিনার পতন হয়েছে এবং ৮৪ বছর বয়সী নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের পছন্দে হাসিনার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ইউনূস, বিষয়টি বড় পরিসরে সাধুবাদ পেয়েছে।
হাসিনার পতনের বিষয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে মিশ্র। তবে কিছু ক্ষেত্রে, প্রতিক্রিয়া অনেকটা সিজোফ্রেনিয়ার মতো উন্মত্ততার পর্যায়ে। ভারতে সংশয়বাদীরা, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠরা বাংলাদেশের জন্য হাসিনা-পরবর্তী একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন দৃশ্যকল্প এঁকেছেন। এ জন্য তিনটি বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে– ১. হাসিনার পতন বাংলাদেশে ‘ইসলামী উগ্রবাদের’ উত্থান; ২. বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুরা আক্রমণের শিকার এবং ৩. সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বাংলাদেশের ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির’ মোড় ঘুরিয়ে ‘অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির’ সূচনা করেছিলেন। এসব দাবি কতটা সত্য? চলুন এক এক করে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক–
ইসলামী উগ্রবাদের উত্থান
শেখ হাসিনার পতনের পরপরই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর বেশ কিছু হামলা হয়। সাম্প্রতিক এসব হামলাকে মুসলমান উগ্রবাদীদের কাজ বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ভারতীয় গণমাধ্যম। পরে মুসলিমদের ওপরও হামলা হয়েছে, বিশেষ করে সুফিপন্থী মাজারগুলোকে লক্ষ্য করে।
হাসিনা-পরবর্তী এসব হামলা এমন সময়ে ঘটছে, যখন অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনের ওপর ক্ষমতা সুসংহত করতে পারেনি। এটি পুষে রাখা নানা ক্ষোভের বিরুদ্ধে জনতাকে বিচারের সুযোগ করে দিয়েছে। এর মধ্যে কিছু ছিল উত্তেজনার বশে ভাংচুর এবং কিছু ছিল ধর্মীয় কারণে।
যেকোনো সমাজে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, তা ধর্মীয় হতে পারে বা অন্য কিছু। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এ ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের নিরাপদে থাকা ও নিরাপত্তার বিষয়ে ভারতের মুসলমানদের কথা বলা যেতে পারে। যেকোনো অঞ্চলের যে বিষয়টি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিরাপদ রাখে, তা হলো মানবাধিকার সংক্রান্ত আইন এবং এই আইন কঠোরভাবে মেনে চলা।
দুঃখজনক বিষয় হলো, মানবাধিকার ও আইনের শাসন কখনোই বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী দিক ছিল না। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলে মানবাধিকার পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে পড়ে যে, ক্ষমতাসীন দলের অনুগতরা ছাড়া কেউ নিরাপদ ছিল না। তবে এটিও সত্য, হাসিনার শাসনামলে হিন্দুরা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বোধ করতেন। তবে এর কারণ এই নয় যে, হাসিনা ‘চ্যাম্পিয়ন অব সেক্যুলারিজম’। বরং তিনি হিন্দুদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। পরামর্শদাতা ভারতকে খুশি রাখতে হাসিনা হিন্দুদের চাকরি এবং অন্যান্য ব্যাপারে সুযোগ-সুবিধা দিতেন। আবার বাংলাদেশে নিজ স্বার্থ চরিতার্থের জন্য হিন্দুদেরকে দিয়ে খারাপ কাজ করাতেন।
আফসোসের বিষয়, হিন্দুদের প্রতি হাসিনার নেক নজর ও একপেষে আচরণ সংখ্যাগরিষ্ঠদের কাছে ইতিবাচক ছিল না। হিন্দুদের নিয়ে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সুবিধাবাদী আচরণ মুসলিমদেরকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল। যার ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের হিন্দুরা আরও বেশি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের মুসলমানরা আরও যে কারণে ক্ষুব্ধ তা হলো, দেশের হিন্দুরা বিশেষ করে হিন্দু সংগঠনগুলো কখনোই হাসিনা সরকারের কয়েক দশক ধরে চলা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কথা বলেনি। এমনকি বিরোধী দলের কর্মীদের সঙ্গে হওয়া নিপীড়নের প্রতিবাদ কিংবা সহানুভূতি দেখায়নি। যেমনটা ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের সঙ্গে হয়ে থাকে। ভারতে গরুর মাংস খাওয়া অথবা বহন করার সন্দেহে নিয়মিত প্রকাশ্যে মারধর করা হয় মুসলিমদের। এ ছাড়া মুসলিমদের মসজিদ ও সম্পত্তিতে হামলার ঘটনা নতুন নয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা দেখে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে এই হিন্দু-মুসলিমদের সম্পর্কের বিষয়টি তাদের নজর এড়িয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করার জন্য একটি অংশ দাবি তোলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কবিতা থেকে নেওয়া এই গান বদলানো উচিত বলে মনে করেন কেউ কেউ। কারণ, রবীন্দ্রনাথ একজন হিন্দু (মূলত ব্রাহ্ম) এবং ভারতীয় যিনি বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে ১৯০৫ সালে কবিতাটি লিখেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের নির্বাসিত সরকার এটিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত করে। জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি, হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে ‘ইসলামী উগ্রবাদের’ উত্থানের বিষয়ে ভারতের শঙ্কা বাড়িয়েছে।
তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার অবস্থান পরিষ্কার করে জানিয়েছে, জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করা তাদের এজেন্ডায় নেই। যদিও বিশ্বে জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করেছে এমন অন্তত পাঁচটি দেশ রয়েছে। এ ছাড়া ডেনমার্ক ও নিউজিল্যান্ডের দুটি জাতীয় সংগীত রয়েছে।
এত কিছুর পরও বাংলাদেশে কোনো মুসলিম মৌলবাদী নেই, তা বলাটা অন্যায় হবে। বেশির ভাগ দেশের মতো বাংলাদেশেও ধর্মীয় উগ্রবাদীরা রয়েছে। তবে তাদের সংখ্যা কম এবং রাজনৈতিক ভিত্তি খুবই সামান্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৯০-২০০৭ সালে পর্যন্ত যখন বাংলাদেশে এক ধরনের গণতন্ত্র কার্যকর ছিল, তখন ইসলামী দলগুলো ৩৫০ আসনের সংসদে ৭-১০টির বেশি আসন পায়নি। এই সংখ্যা প্রমাণ করে, অধিকাংশ বাংলাদেশি মুসলমান ধর্মপরায়ণ হলেও ধর্মান্ধ না এবং ইসলামী রাজনীতির খুব একটা ভক্ত নন।
অর্থনীতি
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে হাসিনা সরকারের অবদান স্বীকার না করার জন্য ভারতীয় বিশ্লেষকরাও বাংলাদেশিদের তিরস্কার করছেন। তাঁদের ভাষ্য, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিলেন।
এটি বলতে হয়, হাসিনার শাসনামলে (২০০৯ সাল থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত) বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ২০১৪ সালে ৬.১ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৭.৯ শতাংশ এবং তারপর ২০২৩ সালে তা নেমে আসে ৫.৮ শতাংশে। তবে হাসিনা ভঙ্গুর অর্থনীতিকে ঊর্ধ্বগতি সম্পন্ন অর্থনীতিতে বদলে দিয়েছিলেন, এটি বলা ভুল। আসল বিষয়টি হলো, হাসিনার আমলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল পূর্বের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতার অংশ, যা বাংলাদেশ ২০০৫ সাল থেকে অর্জন করে আসছিল। তখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হার ছিল ৫.১ শতাংশ।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দুটি মূল চালিকাশক্তি– তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স। আর এর সূচনা হয়েছিল সত্তরের দশকের শেষ দিকে, ২০০৯ সাল থেকে নয়।
তবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে হাসিনার ২০০৯-২০২৪ শাসনামলে ‘অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি’ একেবারে উপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আবার এটিও বলতে হবে, হাসিনার আমলে তাঁর ঘনিষ্ঠদের বড় মাপের দুর্নীতি ও অতিরিক্ত ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্পে বিদেশি ঋণ নিয়ে লাগামহীন অর্থায়ন করা হয়। হাসিনার ঘনিষ্ঠদের বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না। সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে বিশাল ঋণে জর্জরিত করেছে হাসিনা সরকার এবং এটি অর্থনীতিকে একটি মারাত্মক সংকটে ফেলেছে।
হাসিনা সরকার বিগত দশকে জনমতের প্রতি নিষ্ঠুর দমন, শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, ব্যাপক দুর্নীতি ও বেপরোয়া ঋণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে সংকটে ফেলা, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্ব সাধারণ বাংলাদেশিদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে চরমভাবে চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ের গণবিক্ষোভ তাঁর পতন ঘটেছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থ "বাংলাদেশ’স সেভেন গভার্নিং পিরিয়ডস, ১৯৭২-২০২২: অ্যাকমপ্লিশমেন্টস, ‘কনস্ট্যান্ট অব ব্যাড গভার্নন্যান্স’ অ্যান্ড মাচ–নিডেড রিসেটস" পড়লে বুঝতে পারবেন, বাংলাদেশিরা অনন্য অনেক কিছু গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে। একটি সময় আসে যখন তারা উঠে দাঁড়ায় ও শোষকদের মোকাবিলা করে এবং ভুল শুধরাতে নিজেরা দায়িত্ব নেয়। এভাবে একটি নতুন যাত্রার সূচনা করে। এখন সেই সময় এসেছে... প্রকৃতপক্ষে সেই সময়টি এসেছিল গত ৫ আগস্টে।
সারকথা
বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক–মুসলিম মৌলবাদীরা হাসিনার পতন ঘটায়নি, তিনি নিজেই তাঁর পতনের কারণ। হাসিনার অহংকার, লোভ, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের দুর্নীতি এবং যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকার অতৃপ্ত ইচ্ছা এবং ভারতের সঙ্গে অসৎ মৈত্রী–পতনের জন্য যথেষ্ট ছিল।
হাসিনার পতন ভূ-রাজনীতির জন্য একটি শিক্ষা। তাঁর পতন থেকে প্রমাণ হয়, ‘মহল্লার মাস্তানি’ প্রতিবেশীদের মধ্যে স্থায়ী এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে উন্নীত করার ভালো উপায় নয়। যা প্রয়োজন তা হলো, বিনিয়োগ এবং মানুষের সঙ্গে বন্ধন।
শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের ভুল, পরিণতি ও উত্থান-পতন থেকে সবার শিক্ষা নেওয়া উচিত।
লেখক: একাডেমিক ও জাতিসংঘের সাবেক সিনিয়র পলিসি ম্যানেজার।
লেখাটি কাউন্টার কারেন্টস ডট অর্গে প্রকাশিত এবং ইংরেজি থেকে অনূদিত। অনুবাদ: তামান্না-ই-জাহান।
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


শেখ হাসিনার ভারত থেকে আসা ও যাওয়া
ভারতের ‘শেখ হাসিনা সমস্যা’ সহজেই দূর হচ্ছে না
বাংলাদেশ কি মিশর হতে যাচ্ছে?
একচেটিয়া শাসনে সংবাদমাধ্যম যেভাবে ধসে যায়
