অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ কে?

শান্তিতে নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ তিন মাস পেরিয়ে গেছে। এক শ দিন এল বলে। ক্ষমতার রাজনীতিতে সাধারণত প্রথম এক শ দিনকে মধুচন্দ্রিমা কাল বা হানিমুন পিরিয়ড হিসেবেই ধরা হয়ে থাকে। সে হিসাবে ড. ইউনূস সরকার এখনো মধুচন্দ্রিমায় আছে। তাই এখুনি এই সরকারকে নিয়ে পক্ষে/ বিপক্ষে কিছু বলাটা অনেকের কাছেই অসময়োপযোগী বলে মনে হতে পারে। আবার এটাও মনে রাখতে হবে, একটা স্বৈরশাসনকে ক্ষমতাচ্যুত করে হাজারো প্রাণের বিনিময়ে এই সরকার অধিষ্ঠিত হওয়ায় জনপ্রত্যাশা বিপুল থেকে বিপুলতর হয়েছে। গত ১৫ বছরে বা তারও বেশি সময় ধরে যা কিছু থেকে সাধারণ মানুষ নিজেকে বঞ্চিত মনে করেছে, তার সবকিছুই এখন সুদে-আসলে পেতে চায়। এই পেতে চাওয়াই মধুচন্দ্রিমার মধুর মুহূর্তগুলো ততটা আনন্দময় করতে দিচ্ছে না অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য।

পাশাপাশি ড. ইউনূসের সরকারও অনেক দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে ফেলেছে। ঠিক-বেঠিকের তর্কে না গিয়েও বলা যায়, দায়িত্বের বোঝাটা বিশাল। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বলে প্রতীয়মান হয়, ‘আমরা দেশটাকে আর আগের জায়গায় ফেরত নিয়ে যেতে দেব না’। অর্থাৎ, দেশের মানুষের ৫ আগস্ট-পূর্ববর্তী রাজনীতি বা শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে যে অভিযোগের পাহাড় জমে উঠেছিল, তা সুশাসনের ডিনামাইট দিয়ে চিরকালের জন্য ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হবে। এসব শুনতে এবং আশা করতে বেশ ভালোই লাগে। সরকার ইতিমধ্যে গুম, বিচার-বর্হিভূত হত্যাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে সই করেছে। দেশের যেসব আইন‑শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠত, তাদের প্রধানরাই জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, আয়নাঘর বা এমন কিছু আর থাকবে না। মানুষ আশান্বিত। সরকার গঠিত এ সম্পর্কিত কমিশন কাজ শুরু করেছে। তাদের দেওয়া তথ্যও বেশ চমকপ্রদ, যার অনেক কিছুই মানুষ জানত, কিন্তু এই বঙ্গভূমে ভাশুরের নাম মুখে আনতে মানা থাকায় বলতে পারত না কেউই। এই কমিশন মানুষকে সেই সাহস জোগাচ্ছে। 

সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য ইতিমধ্যে ১০টি কমিশন গঠন করেছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রত্যেকটি কমিশন তাদের প্রতিবেদন পেশ করবে সরকারের কাছে। তখনই হয়তো অনেক অস্পষ্টতা, ধোঁয়াশা কেটে যাবে। এই সময় আসতে এখনো মাস দেড়েকের কিছু বেশি সময় বাকি। মানুষ কী এই সময়কালে শুধু জল্পনাতেই থাকবে; না, তার কল্পিত শান্তিধামের কোনো আভাস পাবে? 

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে নিয়ে কথা বলতে গেলে দুটি মত শোনা যায়, যা একেবারেই পরস্পর বিরোধী। কেউ বলেন, গত ১৫ বছরের জঞ্জাল দূর করতে এই সরকারকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হতে হবে। অন্যপক্ষের বক্তব্য, এই সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে আর কখনোই পারবে না। তাই যা করার, এখুনি করতে হবে, এবার তা স্বৈরাচারের বিচার হোক, আইন‑শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হোক বা বাজারের লাগামটানা। দু পক্ষের কথায় নিশ্চয় যুক্তি আছে। কিন্তু যাদের আয়ুষ্কালে শুধুই বিয়োগ, সেখানে পরস্পরের সাথে যোগ আর যোগ মিলে সংযোগটা আর কোনো কিছুতেই হয়ে ওঠে না।

এখানেই সরকারের প্রথম এক শ দিনের প্রসঙ্গ আসে। সরকারের প্রথম এক শ দিনকে হানিমুন পিরিয়ড বা মধুচন্দ্রিমার সময়কাল হিসেবে প্রথম অভিহিত করা হয়েছিল ১৯৩২ সালে, আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের সময়। তখন আমেরিকাজুড়ে মহামন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেশন চলছে। ফলে সবাই সরকারকে সময় দিয়ে দেখতে চেয়েছিল। আর এটা ছিল কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার মোক্ষম সময়, যা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছিলেন। আমেরিকা থেকে মহামন্দা গেছে, পরপর চারবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার রেকর্ড গড়ে রুজভেল্ট চলে গেছেন–কিন্তু হানিমুন পিরিয়ড আর যায়নি। যেকোনো নতুন সরকারের এলেই তার পেছনে ছিনেজোঁকের মতো আসে এই হানিমুন পিরিয়ড।

ইতিহাসের সূত্র ধরে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও তা পেয়েছে। কিন্তু রুজভেল্ট যে কাজগুলো করেছিলেন, এই সরকার কি তা অনুসরণ করতে পেরেছে? বিতর্ক থাকতে পারে। তবে মোটা দাগে ফলাফল না-এর দিকেই যাবে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকার–যেই হোক না কেন সাফল্যের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি শত্রু-মিত্র চেনাটা খুবই জরুরি। জরুরি কঠোর থেকে কঠোরতর সিদ্ধান্তের, যাতে প্রাথমিকভাবে অনেকেই অখুশি হবে; কিন্তু আদপে দেশের মানুষই লাভবান হবে। যেমনটা হয়েছিল আমেরিকার মানুষ।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাত হয়। তারই ফল বর্তমান সরকার। ৫ আগস্ট-পূর্ববর্তী ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলগুলোর অনেক নেতা-কর্মী কারাগারে। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। অনেক নেতা এখনো পলাতক। শেখ হাসিনাসহ বেশ কিছু নেতা দেশত্যাগ করেছেন। নির্বাহী আদেশে ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে আওয়ামী লীগ ও এর মিত্ররা বর্তমান সরকারকে প্রতিপক্ষ ভাববে, সেটাই দস্তুর। এই বিরোধিতাকে এখন আমলে না নিয়েও খুব সহজে চলতে পারছে/ পারবে বর্তমান সরকার। কারণ, ৫ আগস্টের পর তারা আর মাঠের বড় শক্তি হিসেবে নেই।

কিন্তু এই বিজয়ের পর যারা রাজনীতির মাঠে সক্রিয়, তাদের অবস্থান কী? গুগলে ‘দ্রুত নির্বাচন দিন’ লিখে সার্চ করলেই দেখবেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের নেতারা প্রতিদিন সরকারের কাছে দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছেন। এই সরকার শপথ নেওয়ার আগের দিন (৭ আগস্ট) রাজধানীর নয়াপল্টনে এক জনাকীর্ণ সমাবেশে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাজ্য থেকে ভার্চুয়ালি দেওয়া বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর অতি দ্রুত জাতীয় নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, বিপ্লবের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। একই সঙ্গে দেশে চলমান নৈরাজ্য ও হামলা বন্ধে সবাইকে ঢাল হিসেবে দাঁড়ানোরও আহ্বান জানান তিনি। (সূত্র: কালের কণ্ঠ)

গত ৯ নভেম্বর (শনিবার) তারেক রহমানের বক্তব্য ধরে একটি পত্রিকার শিরোনাম, ‘ভোটের ব্যবস্থা করতে হবে যেকোনো মূল্যে’। রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ-এ শনিবার জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে দলীয় নেতা-কর্মীদের তিনি বলেছেন, ‘প্রত্যেককে একটি বার্তা দিতে হবে, ভাই তুমি যে রাজনীতিতেই বিশ্বাস করো না কেন, যাকে ইচ্ছা তুমি ভোট দাও; কিন্তু ভোট যাতে হয়, সে ব্যবস্থাটা করতে হবে যেকোনো মূল্যে। তোমার যাকে ইচ্ছা, তুমি ভোট দাও। আমাকেও ভোট দেওয়ার দরকার নাই। তোমার বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে ভোট দেবে; কিন্তু ভোট হতে হবে।’ (সূত্র: আজকের পত্রিকা) অর্থাৎ, গত দু মাসের ব্যবধানে দেশের দুটি বড় দলের একটি বিএনপি, তার শীর্ষ নেতার বক্তব্যে কিন্তু কোনো পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করি না।

গত ৭ নভেম্বর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত তিন মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের নানা কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘যৌক্তিক সময়ে নির্বাচন দিলেই বর্তমান সরকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে।’ একই দিনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের জন্য দ্রুত নির্বাচন দেওয়া প্রয়োজন। সব সংস্কার অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়।’ অন্যান্য অনেক দলই কিন্তু এই সুরেই কথা বলছে। অর্থাৎ, যত সংস্কারের কথা এই সরকার বলুক না কেন, নির্বাচনই যে তাদের প্রধানতম দায়িত্ব–এটা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই।

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ও অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন কিন্তু একই সূত্রে গাঁথা। কারণ, সুষ্ঠু নির্বাচন না করতে দেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের সাধারণ নাগরিকের অধিকারহরণের কাজটি শুরু করেছিল আওয়ামী লীগ। আর এর বিরুদ্ধে যারাই রুখে দাঁড়িয়েছে তারাই গুম-খুন-জেল-জুলুম-অত্যাচারের শিকার হয়েছে। ভোটের অধিকার কেড়ে নিতে ধ্বংস করা হয়েছে একের পর এক প্রতিষ্ঠান। ক্ষমতাসীনদের অঙ্গুলি হেলনে চলেছে সবকিছু। এভাবেই তৈরি হয়েছিল ৫ আগস্টের পটভূমি। এটা যদি ভুলে যাই, তাহলে ইতিহাস ও সত্যের প্রতি অবিচার করা হবে। ফলে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের সাফল্যের মনোভূমে সবার ওপরে আছে নির্বাচন। আর শুধু ৫ আগস্ট কেন, একাত্তর বা নব্বই-এর আন্দোলন কী সেই সাক্ষ্য দেয় না?

আর সত্যিই যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, একটি গণতান্ত্রিক সমাজ আমাদের উপজীব্য হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সেটা না করে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিলে কারও জন্য তা ভালো হবে না। খারাপ দেখতে দেখতে দেশের মানুষ আজ বড় ক্লান্ত। তারা দুদণ্ড শান্তি চায়। নির্বাচনের নামে স্বৈরাচারি শক্তিকে পুনর্বাসিত করা হবে বলে যে আখ্যান প্রচার করা হচ্ছে, তা কখনোই গণতান্ত্রিক মানসিকতার ফসল হতে পারে না। দু‑মাস আগে যে দেশের মানুষ এমন অকাতরে প্রাণ দিল, তাদের প্রতি আস্থা রাখতে না পারাটা শুধু কষ্টের না লজ্জারও। ‘দেশের মালিক জনগণ’ বলে মুখ দিয়ে ফেনা না তুলে বাংলাদেশটাকে তার মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিন।

আমাদের মতো যাদের ঢাকার বাইরে যাওয়া সুযোগ আসে কম, তাদের কাছে এই রাজধানীই দেশটির দর্পণ। টিসিবির পণ্য বিক্রির ট্রাকের পিছনে/ চারপাশে সাধারণ মানুষের ভিড় ক্রমে বাড়ছে। একটু অপেক্ষা করলেই দেখতে পাবেন, পণ্য ফুরিয়ে যাওয়ার পর না-পাওয়াদের হতাশা, হাহাকার। রিকশাচালক, সিএনজি চালকসহ যাদের সাথে কথা হয়, সবাই আয় কমার কথা বলেন। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম ক্রমে তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ভাত না পেলে কিন্তু মানুষ মানচিত্রও চিবিয়ে খেতে দ্বিধা করে না। ফলে তাদের দিকে নজর দেওয়া একান্ত জরুরি।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন। কিন্তু তিনি একজন অর্থনীতিবিদ এবং ক্ষুদ্রঋণের প্রবক্তা হিসেবে বিশ্বব্যাপী খ্যাত। তিনি দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানোর কথা বলেন। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়–এটা তাঁর চেয়ে খুব কম লোকই ভালো জানেন ও বোঝেন। তাই নিরন্ন লোকগুলো যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, তা ভেঙে দেবেন না। তাদের ঠেলে দেবেন না প্রতিপক্ষের কাতারে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন 

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]