প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামীকাল শনিবার থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ বা আলোচনায় বসতে চলেছেন। এই আলোচনার মূল বিষয় হলো সংস্কার। ধারণা করা যায়, আলোচনার লক্ষ্য, সংস্কারের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের ভাবনা তুলে ধরা এবং এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মত ও দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা। প্রথম দিন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ পেয়েছে। অন্যরাও পাবে বলে ধরে নেওয়া যায়। যেহেতু স্বেচ্ছাচারী আওয়ামী লীগ সরকার ও তার শরিকদের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে উৎখাত করে এই সরকার গঠিত হয়েছে, ফলে তারা কেউ এই আলোচনার অংশীজন হবে না–এটাই স্বাভাবিক। ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের মাশুল তাদের কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দিতে হবে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস শপথ নেওয়ার পর থেকে একটা প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে–নির্বাচন আসলে কবে হবে? নির্বাচন বলতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেই বোঝাচ্ছেন সবাই। ড. ইউনূসের সরকার শপথ নিয়েছে প্রায় দু মাস হতে চলল। এরই মধ্যে আইন-শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা, পুলিশ সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তা, ফেনি-নোয়াখালী-কুমিল্লায় ভয়াবহ বন্যার ধকলের পর উত্তরবঙ্গে ফের বন্যা, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামসহ অনেক ঝড়ঝাপটা সামলাতে হয়েছে ও হচ্ছে। তারপরও নির্বাচনের প্রশ্নটি চাপা পড়েনি।
চাপা পড়বে না, এটাই দস্তুর। ২০১৪ সালের পর থেকে দেশে কোনো স্বাভাবিক নির্বাচন হয়নি। কোনো নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ছিল না। ২০১৪-পরবর্তী যে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে, তার দুটিতে বিএনপি অংশ নেয়নি। ২০১৮ সালে অংশ নিয়ে রাতের ভোট দেখে নিজেকে প্রতারিত মনে করেছে। ২০২৪ সালে তো বিএনপি ও সমমনা দলগুলো অংশ নেয়নি। বাম ও অন্যান্য ইসলামী দলও অংশ নেওয়া থেকে বিরত ছিল। উপরন্তু ২০১৮ সালের পর থেকে কোনো ধরনের নির্বাচনে বিএনপির নেতা-কর্মীরা অংশ নেননি। দলীয় নির্দেশই ছিল এমন। একই অবস্থার মুখোমুখি ছিল জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলো। এর সাথে উপরি হিসেবে জুটেছিল জেল-জুলুম-মামলা-হয়রানি-হত্যা-গুম, দল ভাঙার খেলা। সব মিলিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে–এমন কোনো রাজনৈতিক দলই স্বস্তিতে ছিল না আওয়ামী লীগ আমলে।
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশ স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশার জায়গায় প্রথম স্থান পেয়েছে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিষয়টি। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশনের সব কমিশনার পদত্যাগ করেছেন। নির্বাচন কমিশন সংস্কারের জন্য নতুন কমিশন গঠিত হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশার পারদ বাড়ছে। আগের তিনটি কমিশনের মতো আর কোনো নির্বাচন কমিশন আসবে না, যারা রাতে-দিনে সব সময় ভোট করতে অভ্যস্ত, যারা ভোটারহীন নির্বাচনকেও বিরাট সাফল্য দাবি করে গালগপ্প ফেঁদে বসতে পারে এবং সব সময় নিজেদের ফেরেশতাতূল্য দাবি করে–এই আশায় বুক বেঁধেছে দেশবাসী। গণতান্ত্রিক অধিকার হারানোর অপমানের তীব্র জ্বালা ভোলাতে হলে এই অধিকার যথাযথভাবে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। দেশের মানুষ তার অধিকার ফিরে পেতে চায়। এ জন্যই তো এত প্রাণহানি, অঙ্গহানি, বেঁচেও মরে থাকার কাহিনি।
কিন্তু ঘর পোড়া গরুদের তো সমস্যা থাকেই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আজিজের নেতৃত্বে এক সদস্যের কমিশনের কর্মকাণ্ড দেখে পরিবর্তিত ব্যবস্থা হিসেবে ২০০৭-০৮ এর ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন সরকার তিন সদস্যের কমিশন গঠন করে। ওই কমিশন ভোটার তালিকা, জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির মতো বড় কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেছিল। পরবর্তী সময়ে তিনটি কমিশনের আকার বেড়ে তিন থেকে পাঁচ হয়ে গেল। কিন্তু আকারের সাথে বিকারও বাড়ল। অসম্মান শব্দটি একেবারে তাদের শরীরে সিলগালা হয়ে লেগে গেল। সুতরাং এটা স্পষ্ট এক-তিন-পাঁচ সদস্যের কমিশন কোনো সমাধানও না, সমস্যাও না। প্রয়োজন সদিচ্ছার। সেই সদিচ্ছার শতভাগের কাছাকাছি আসতে হবে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের কাছ থেকে। আর যেটুকু বাকি থাকে, সেটা আসবে চর্চার মাধ্যমে। গণতন্ত্রের চর্চায় ছেদ টেনে কোনোভাবে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ বা রাষ্ট্রকাঠামো গঠন করা সম্ভব না।
নির্বাচন কমিশন নিয়ে এত কথা বলার কারণ, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার জন্য তারা অতীব জরুরি একটি প্রতিষ্ঠান। অনেকের হয়তো মনে আছে, ২০০৯-পরবর্তী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে কমিশনের দায়িত্বে ছিলেন ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বে আরও দুই কমিশনার। তাঁদের আমলে (২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর) নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে শামীম ওসমান ও সেলিনা হায়াৎ আইভির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা নিশ্চয় অনেকের মনে আছে। শামীম ওসমানের মতো আওয়ামী লীগের দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইভি ছিলেন সামান্য বিদ্রোহী। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার পরও শুধু নির্বাচন কমিশনের কঠোর ভূমিকার কারণে আইভির জিততে কোনো সমস্যা হয়নি। এক লাখেরও বেশি ভোটে তিনি শামীম ওসমানকে হারিয়েছিলেন। কমিশনের এই ক্ষমতা দেখাতে এর উত্তরসূরিরা লজ্জাজনকভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফলে এটা পরিষ্কার যে, ক্ষমতা কাঠামোর যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে ব্যক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন কমিশনকে সংস্কার করার জন্য ড. বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বে কমিশন তৈরি হয়েছে। এই কমিশন আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের সুপারিশ বা প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেবে। এই সময়ে নির্বাচন কমিশন কমিশনার‑শূন্যই থাকবে বলে ধারণা করা যায়।
এদিকে ভোটের জন্য বা ভোটের একটা সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমে অধৈর্য হয়ে উঠছে। তাদের কথাবার্তায় সেটা পরিষ্কার। বিএনপির নেতা তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান থেকে শুরু করে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর–সবার কথার মূল সুর কিন্তু অভিন্ন। এমনটা হওয়াই খুব স্বাভাবিক। ২০১৪ সালের পর থেকে দেশে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। এখন আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাতের পরও যদি নির্বাচনের প্রদীপ বহু দূরে জ্বলতে থাকে, তাহলে সিঁদুরে মেঘ দেখার আশঙ্কা তাঁরা করতেই পারেন। এতে দোষের কিছু নেই।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহে এক জনসভায় দেওয়া ভিডিও ভাষণে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘দেশ পরিচালনার জন্য নির্বাচিত সরকারের বিকল্প নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এমন দায়িত্বও কাঁধে নেওয়া সংগত হবে না, যেটা তাঁরা বহন করতে সক্ষম হবেন না।’ (ইনডিপেনডেন্ট) একই দিনে গাজীপুরের কোনাবাড়ি ডিগ্রি কলেজ মাঠে আয়োজিত শ্রমিক সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, মানুষ ভোট দিয়ে তাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে চায়। এ জন্য দ্রুত সংস্কার সম্পন্ন করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানান তিনি। (ইনডিপেনডেন্ট)
এর ঠিক একদিন আগে; অর্থাৎ, ২৭ সেপ্টেম্বর খুলনায় এক জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক দলসহ সব পর্যায়ের স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সংস্কার ও নির্বাচনের রোডম্যাপ তৈরি করে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়ে সম্মানের সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিদায় নিতে হবে। কেননা বছরের পর বছর দেরি করলে আগাছা জন্ম নিতে পারে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, তৃতীয় শক্তির উদ্ভব হতে পারে। (প্রথম আলো)
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের বক্তব্য, ‘যত দ্রুত নির্বাচনের দিকে যাওয়া যাবে, তত দ্রুত দেশের জন্য মঙ্গল হবে। যত দ্রুত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন করা যাবে, ততই দেশের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে, অর্থনৈতিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে যাবে। আমরা প্রত্যাশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে একটা নির্বাচন দেবে।’ (যুগান্তর)
দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অংশীজন রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা না করাটা অযথার্থ। মনে রাখতে হবে, যত সংস্কারই করা হোক না কেন, শেষমেষ নির্বাচন দিতে হবে। আর নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কেউ/ কেউ কেউ জিতে সরকার গঠন করবে। ফলে সংস্কার ফলবতী ও দীর্ঘস্থায়ী হবে কিনা, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। সংসদে ব্রুট মেজরিটি বা নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পেলে রাজনৈতিক দলগুলো কত কিছু করে বা করতে পারে, তার ভূরি ভূরি নজির আমাদের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে আছে।
সবচেয়ে বড় কথা, ছাত্র-জনতার দুর্মর আন্দোলনে মুখ্য উপজীব্য ছিল হারানো গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকার দেশের মানুষকে ফেরত দেওয়া। এই অধিকার আদায়ে তারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। এটা বুঝতে হবে বর্তমান অন্তর্বর্তী ‘অরাজনৈতিক’ সরকারকে। আর এই অধিকারের বড় অংশ হলো ভোট। সে ভোট হতে হবে জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকারের সংস্থাগুলো থেকে শুরু করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ পর্যন্ত। গণতান্ত্রিক ধারা কোনো ম্যাজিক না যে একজন জাদুকর এসে দেখালেন আর দেশের মানুষ বুঝে গেল বা মেনে নিল। এটা নিজের জীবন থেকে সমাজের প্রতিটি স্তরে চর্চার বিষয়। এই চর্চা অব্যাহত রাখলে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছাবে, শহীদের আত্মদান সার্থক হবে। আর উল্টোটা হলে আমরা আবার তমশাচ্ছন্ন গন্তব্যে চলতে শুরু করব।
সে দিক দিয়ে কাল শনিবার থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে প্রধান উপদেষ্টার সংলাপ বা আলোচনা দেশটাকে একটা কার্যকর অভিমুখে নিয়ে যাবে, এ প্রত্যাশা সবার। পাশাপাশি নির্বাচন নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, তা-ও কেটে যাবে। মোদ্দা কথা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশ চালাবেন রাজনৈতিক নেতারা। সেজন্য, দ্রুত সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম করে গঠিত সংসদের হাতে দেশের শাসনভার তুলে দেওয়াটাই মঙ্গল।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


সংস্কার ভাবনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা
ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচনী রোডম্যাপ চায় বিএনপি
প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যে কোনো রোডম্যাপ পাইনি: মির্জা ফখরুল
