ঢাকায় কি মির্জাপুর সিজন ফোর চলছে?

একটি অফিস। মোটামুটি সাজানো। এর মধ্যেই হুট করে লাঠিসোঁটা আর ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঢুকে গেল একদল মানুষ। ঢুকেই ভাঙচুর শুরু হলো। আরও ভয়ংকরভাবে শুরু হলো কোপাকুপি। যা সামনে পাচ্ছে, তাতেই তারা নিঃশঙ্ক চিত্তে কোপ বসিয়ে দিচ্ছে! কে, কী–কিচ্ছু দেখার সময় নেই। কোপ দেওয়াই সেখানে একমাত্র লক্ষ্য!

এই হামলার সিসিটিভি ফুটেজ এরই মধ্যে ইউটিউবে সয়লাব। একটু খুঁজলেই যে কেউ পেয়ে যাবেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এটি প্রকাশও করেছে। এই ফুটেজ বেশ খানিকক্ষণ দেখলে আপনার মনে হবে যেন কোনো ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাওয়া সিরিজের সহিংস দৃশ্য চলছে! ঠিক যেন, সহিংস দৃশ্যের জন্য খ্যাতি পাওয়া ওয়েবসিরিজ ‘মির্জাপুর’ চলছে ঢাকায়। এই সিরিজের সিজন থ্রি এ বছরই কিছুদিন আগে মুক্তি পেয়েছিল। তাতে দেখা যায়, মির্জাপুর নামের একটি শহরের গ্যাংস্টাররা নিজেদের স্বার্থে আজ একে কোপাচ্ছে, তো কাল অন্যকে দিনে-দুপুরে গুলি করছে। কারও মাথা কেটে ফেলছে, তো কারও চোখ গেলে দিচ্ছে আঙুল দিয়ে। ওপরে বর্ণিত ধুন্ধুমার কোপানোর ফুটেজ দেখলে কিন্তু তেমনটিই মনে হতে বাধ্য।

সমস্যা হলো, ওই দৃশ্য বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের বেশ জমজমাট একটি এলাকার এবং সাম্প্রতিককালেরই। এমন ঘটনা কি একটাই ঘটেছে? নাহ্। সংবাদমাধ্যমে এখন এ ধরনের অজস্র খবর পাওয়া যায়। সারা দেশে হুট করেই অপরাধ সংগঠনের মাত্রা বেড়ে গেছে। ঢাকা শহরে যেন তার চিত্রটা আরেকটু ভয়াবহ বোধ হচ্ছে। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের এক খবরে প্রকাশ, গত দুই সপ্তাহে শুধু ঢাকাতেই খুন হয়েছেন অন্তত ১১ জন। আর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে প্রতিদিন গড়ে খুন হয়েছেন একজন করে। সংখ্যার হিসেবে ৬৮ জন। অন্তর্বর্তী সরকারের ১০০ দিনে সারা দেশে খুন হয়েছেন পাঁচ শরও বেশি মানুষ, বেড়েছে নৃশংসতাও। নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থতার কারণেই এসব অপরাধ ঘটছে বলে মত দিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

অন্তর্বর্তী সরকারের ১০০ দিনে সারা দেশে খুন হয়েছেন পাঁচ শরও বেশি মানুষ, বেড়েছে নৃশংসতাও। প্রতীকী ছবি:ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

আশা করি, এতক্ষণে ঢাকা শহরের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা সম্পর্কে একটা চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। বৃহত্তর ঢাকা শহরে দুই কোটির ওপরে মানুষের বাস। মানুষকে যদি আমরা কেবলই সংখ্যা হিসেবে ভেবে নিতে চাই, তবে প্রতিদিন গড়ে একজনের খুন হওয়াকে মেনে নেওয়ার নিদান দিতেই পারেন কেউ কেউ। কিন্তু একটা মানুষ কেবলই একটা সংখ্যা নয়। তার পরিবার আছে, পরিজন আছে, আছে বন্ধুবান্ধব। সব মিলিয়ে, একজনের খুন হওয়া মানে আরও অনেক মানুষের ওপর তৈরি হওয়া এক প্রবল শোকের ও ক্ষোভের বোঝা। কেবলই ‘আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি’ বা ‘পরিস্থিতি এখন উন্নতির দিকে’ কিংবা ‘এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ ঘরানার নিয়মিত কপচানো ও দায় এড়ানোর বাক্যগুচ্ছ দিয়ে সেই বোঝার ভার কমানো যায় না।

তাই বলে, পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে’ বা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলার ট্রেন্ড থামছে না। এই যেমন একটি দেশের রাজধানী শহরে গত দুই মাসে প্রতিদিন গড়ে ১ জনের খুন হওয়ার পরিসংখ্যান শঙ্কাজনক হলেও পুলিশ বলছে, বেশির ভাগ ঘটনাই বিচ্ছিন্ন। আর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বা ডিএমপির দাবি, পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

বাংলায় ‘পরিস্থিতি’ একটি বিশেষ্য পদ। আভিধানিকভাবে এর অর্থ হলো, কোনো ঘটনা, কাজ, জীব ইত্যাদির আশপাশে বা চারদিকের বাস্তবিক বা যুক্তিসঙ্গত অবস্থা। বর্তমানে ঢাকার যে অবস্থা, তাতে এই শহরের পরিস্থিতিতে স্থিতির পরিমাণ বেশ কমই। অন্তত একজন সাধারণ করদাতা ও নাগরিক হিসেবে নিজের উদাহরণ দিয়েই বলা যায় যে, রাত ১০টার পর শহরের রাস্তাঘাটে খুব একটা নিরাপদ বোধ করা যায় না। এই তো কিছুদিন আগের কথা। স্রেফ আধা ঘণ্টা আগে যে রাস্তা পায়ে হেঁটে পার হয়ে আসা হয়েছে, সেখানেই পরে ঘটতে শোনা গেছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। শুধু তাই নয়, সেখানে এই রাহাজানি করতে গিয়ে খুনও হয়েছে। হ্যাঁ, পরদিন সকালে ওই রাস্তায় কারও রক্ত পড়ে ছিল না বটে। মানুষের পায়ে পায়ে মুছে গেছে হয়তো। কিন্তু তাই বলে কি আর আতঙ্ক মোছে?

আরও পড়ুন:

এই আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকে ঢাকা শহরের অধিবাসীদের, আরও বৃহৎ অর্থে বললে পুরো দেশের মানুষকে মুক্তি দেওয়াটাই এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তিন মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও তা থেকে মুক্তি পুরোপুরি মিলছে না। মনে রাখতে হবে, কেবলই ডায়াসে দাঁড়িয়ে কোনো কিছু ঘোষণা করে দিলেই তা বাস্তবায়ন হয়ে যায় না। এমনকি ‘উন্নতি হচ্ছে’, ‘নিয়ন্ত্রণে আছে’–এগুলো বারবার বললেই তা ভূতের রাজার বর দেওয়ার মতো করে সত্যি হয়ে যায় না। জনগণকে এটি অনুভব করাতে হবে। আর তার জন্য মাঠের সক্রিয়তাই বেশি প্রয়োজন, গলার জোর নয়।

আর তা নিশ্চিত করতে আরও বেশি দেরি হলে, মানুষ কিন্তু ঢাকা শহরকে সত্যি সত্যিই পর্দার মির্জাপুর ভাবতে শুরু করে দেবে। কেউ কেউ হয়তো তখন হয়ে যাবে ‘কালীন ভাইয়া’, কেউ হবে ‘গুড্ডু ভাইয়া’। সাধারণদের অবস্থা অবশ্য বেশির ভাগ সময় তথৈবচই থাকে। তখন আরেকটু খারাপ হবে, এই যা। ফাটা কপাল আরও বেশি ফাটলে কার কী আর এসে যায়!

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]